সিন্ধীরাণী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল–কি ভাবছ? পারবে না আমাকে ঐ শয়তান মহারাজের হাত থেকে উদ্ধার করতে?
তোমাকে উদ্ধার না করে আমি এই সাগরতল থেকে বাইরে যাব না সিন্ধীরাণী।
দস্যুসম্রাট! তুমি কত মহান! দস্যুসম্রাট-তুমি-তুমি আমার। তুমি আমার…
চলো আমাকে সেই কারাকক্ষে রেখে এসো রাণী।
না, তোমাকে আমি আর সেই কারাকক্ষে পাঠাবো না।
তবে?
এই চোরা কুঠরীতে থাকবে।
সিন্ধীরাণীর কথায় বনহুর কোন জবাব দিল না।
.
মনিরার নতুন দেশে নতুন জায়গায় এই নিঃসঙ্গ জীবন একেবারে অসহনীয় হয়ে উঠলো। কি আশা করেছিল সে আর কি হলো, আহার-ন্দ্রিা ত্যাগ করে কান্নাকাটি করে চলেছে মনিরা। কায়েস কিছুতেই তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে পারছে না। নানা উপায়ে মনিরার শোকবিহ্বল মনকে সুস্থ করার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু কৃতকার্য হচ্ছে না।
দিন যতই যাচ্ছে ততই আরও ভেঙে পড়ছে মনিরা। কায়েস কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। মনিরাকে নিয়ে দেশে ফিরে যাবে, না এখানেই থাকবে ভেবে পায় না সে। একদিন মনিরার নিকটে বলে বসলো-কায়েস আপনি দেশে ফিরে যাবেন, না এখানেই থাকবেন?
মনিরা দেশেই ফিরে যাবে মনস্থির করলো। যত বিপদই আসুক, তবু নিজ দেশ, নিজ জন্মভূমি মায়ের সমান। কায়েস মনিরার মনোভাব জানিয়ে রহমানের নিকটে একটি পত্র দিল। কিন্তু রহমান এত শীঘ্র মনিরাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য মত দিল না। কারণ রহমান জানে, এখানে এলে চৌধুরীকন্যাকে কিছুতেই রক্ষা করা যাবে না, তাকে পুনরায় তার বড় চাচা আসগর আলী সাহেব পাকড়াও করে নিয়ে যাবেন!
রহমান গোপনে সব সংবাদই রেখেছে। চৌধুরীবাড়িতে এখনও পুলিশের গুপ্তচর মনিরার অনুসন্ধান চালাচ্ছে, এ সংবাদও রহমান পেয়েছে। কাজেই মনিরার এ মুহূর্তে ফিরে আসা মোটেই উচিত হবে না।
রহমানের চিঠি পেয়ে মনিরা যদিও মন খারাপ করলো, তবু দেশে ফিরে যাবার বাসনা উপস্থিত ত্যাগ করলো। একেই বনহুরের অভাবে প্রাণে তার শান্তি নেই, সদাসর্বদা উদাস ভাব। এ অবস্থায় আবার সেই বড় চাচার উন্দ্রব সহ্য করতে পারবে না। তার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভাল। এখানে বনহুরের কথা ভেবে সে প্রাণ বিসর্জন দেবে।
ঝিন্দ শহরে এসে মনিরা কোন দিন শহরটা ভাল করে চেয়ে দেখেনি। বনহুরের মুখে শুনেছিল অপূর্ব সুন্দর এই ঝিন্দ শহর। মনিরা, তাই তোমার জন্য আমি ঝিন্দ শহরে বাড়ি কিনেছি। সেখানে তুমি আর আমি নতুন জীবন শুরু করবো, কথাগুলো মনে পড়তেই মনিরা মুষড়ে পড়তো, দু’চোখ ভরে উঠত অশ্রুতে, ঝিন্দ শহর আর তার ভাল লাগতো না।
তবু যত ব্যথা-বেদনা হৃদয়ে চেপে ঝিন্দ শহরে বনহুরের দেওয়া বাড়িখানা আঁকড়ে ধরে পড়ে রইলো মনিরা।
কায়েস তার সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে মনিরার নিকট থেকে তার দেখাশোনার ভার গ্রহণ করলো।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ গত হয়ে চললো। মাসের পর মাস হয়ে এলো। মনিরা দিন দিন ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়লো। হঠাৎ মাথা ঘোরা, গা বমি বমি, নানা রকম শারীরিক অসুখ দেখা দিল।
প্রবীণ ঝিন্দ দাসী ময়না মনিরাকে নিজের মেয়ের মত স্নেহ করত। এ বাড়িতে আসার পর মনিরা এই দাসীটিকে নিজের করে পেয়েছিল। সব সময় মনিরার পাশে পাশে থাকত এই দাসী। এক দণ্ডের জন্যও মনিরাকে ছেড়ে সে কোথাও যেত না।
মনিরার এই অসুস্থতায় ময়না দাসী বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো, সে কায়েসকে ডাক্তার ডাকার জন্য বললো।
ডাক্তার এলেন, মনিরাকে পরীক্ষা করে গম্ভীর হয়ে পড়লেন। কায়েসকে আড়ালে ডেকে বললেন– তোমাদের বেগম অন্তঃসত্ত্বা।
কায়েসের মুখমণ্ডল খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বললো ডাক্তার বাবু, সত্যি বলছেন?
ডাক্তার জানেন এ বাড়ির অধিকারিণী যিনি–তিনি বিধবা। কতগুলো দাস-দাসী নিয়ে তিনি বসবাস করেন তাই মনিরাকে পরীক্ষা করে যখন ডাক্তার বুঝতে পারলেন মেয়েটি গর্ভবতী; তখন তার মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে পড়েছিল। তাই গোপনে কায়েসকে ডেকে বলেছিলেন ব্যাপারটা। এক্ষণে কায়েসের খুশিভরা ভাব লক্ষ্য করে ডাক্তার বাবুর মনোভাব প্রসন্ন হয়ে আসে। বললেন– তোমাদের বেগম বিধবা, এ কথাই জানতাম।
আপনি ভুল শুনেছেন।
এরপর ডাক্তার আর কোন কথা বলতে সাহসী হন নি।
ডাক্তার চলে যেতেই কায়েস কথাটা ময়নার কাছে বললো–শোন ময়না, তোমার মা-মনির পেটে বাচ্চা এসেছে।
ময়না শুনে চমকে উঠলো– দু’চোখ কপালে তুলে বললো ওমা সেকি কথা স্বামী নেই তা বাচ্চা পেটে আসবে কি করে! ময়নার মনে একটা অবিশ্বাসের ছোঁয়া দোলা দিয়ে গেল।
কায়েস পুরুষ ছেলে, কি করে কথাটা বুঝিয়ে বলবে ওকে। তাই নিশ্চুপ রইলো।
ময়না যখন মনিরার পাশে গেল, তখন কেমন যেন একটা থমথমে ভাব তার সমস্ত মুখখানাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
কদিন যেতেই মনিরা লক্ষ্য করলো বাড়ির প্রতিটি দাস-দাসী চাকর বাকর সবাই কি যেন কথাবার্তা নিয়ে কানাকানি করছে। সবাই যেন তার দিকে কেমন সন্ধিগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে। সহজে কেউ মনিরার পাশে আসতে চায় না। এমন কি ময়না যে একদণ্ড মনিরাকে ছেড়ে থাকতো না সেও কেমন যেন দূরে দূরে সরে থাকে।
মনিরা ক্রমে হাঁপিয়ে পড়লো, একে স্বামীশোকে মুহ্যমান সে। তারপর শারীরিক অবস্থা ভাল নয়। দাস-দাসীদের এই উপেক্ষা ভাব তাকে বেশ অস্থির করে তুললো। একদিন ময়নাকে ডেকে বললো মনিরাময়না, তোদের কি হয়েছে রে? তোরা আজকাল আমার সঙ্গে অমন ব্যবহার করছিস কেন?
