দস্যু বনহুর দেয়ালের ওপাশ থেকে অধর দংশন করল। দক্ষিণ হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হলো তার।
সিন্ধীরাণীর কণ্ঠ-আপনি এই কথা জানাতেই কি এসেছেন মহারাজ? এই কি আপনার গোপন আলোচনা?
হ্যাঁ রাণীজী, এটাই আমার গোপন কথা। তুমি যদি রাজি হও, আমি তোমাকে সাগরতল থেকে পৃথিবীর আলোয় নিয়ে যাব! সকলের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দে মিশতে পারবে। মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে। নিঃশ্বাস নিতে পারবে। যা চাইবে তাই পাবে। বল রাজি?
না না, এ আপনি কি বলছেন! আপনাকে আমি নিজের পিতার চেয়ে কোন অংশে কম মনে করি না।
হাঃ হাঃ হাঃ-আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো মহারাজ। তারপর হাসি থামিয়ে বললো– তোমার পিতা কে জান?
হ্যাঁ জানি, পিতা নয়। তোমাকে সে সিন্ধের রাজবাড়ী থেকে চুরি করে এনেছিল! তোমার বাবা সিন্ধীরাজ সূর্য সেন।
নাথুরাম আমার বাবা নয়! আমি দস্যুকন্যা নই!
না, তুমি রাজকন্যা। কাজেই আমাকে তুমি বিয়ে করতে পারবে। আর আমার যে রূপ দেখছো বা এতদিন দেখে আসছো এটা আমার আসল রূপ নয়। আমি বৃদ্ধ নই–আমি যুবক।
সিন্ধীরাণীর দু’চোখে বিস্ময় ঝরে পড়তে লাগলো।
দেয়ালের ওপাশে দস্যু বনহুরেরও সেই অবস্থা। কে এই শয়তান, এই মুহূর্তে সে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলে একবার দেখে নিত-কে সে। কিন্তু দেয়ালের এপাশে তো কোন চাবিকাঠি নেই বা এটা খুলে বেরিয়ে আসার কৌশল তার জানা নেই। কাজেই নিশ্চুপ শুনে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।
সিন্ধীরাণী এবার বলল–আপনি তাহলে কে?
আমি মহারাজ! কিন্তু আমি তোমার বাবার বন্ধু নই-দস্যু নাথুর মনিব! আমার কথাতেই সে চলাফেরা করত। আমার কথামতই সে তোমাকে এই সাগরতলে বন্দী করে রেখেছে। এই যে সাগরতলে রাজপ্রাসাদ দেখেছ, এটা তোমার পিতা রাজা সূর্যসেনের গুপ্ত প্রাসাদ। তোমার পিতাকে দস্যু নাথুরাম এই সাগরতলে বন্দী করে তার সব ধনরত্ন আত্মসাৎ করে নিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে এই সাগরতলেই হত্যা করা হয়েছে।
তাকে হত্যা করা হয়েছে!
হ্যাঁ, নিচে যে হাঙ্গর দেখেছ, এ হাঙ্গরের মুখে নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
উঃ এত শয়তান আপনারা।
আমরা নই-নাথুরাম তাকে হত্যা করেছে। কৌশলে তোমার পিতার রাজভাণ্ডারের যত অর্থ সব আত্মসাৎ করেছে। তোমাকেও সে হত্যা করত, শুধু আমার জন্য তুমি আজও বেঁচে আছে। বলো-এবার বলো, আমাকে বিয়ে করতে তুমি রাজি আছো?
সিন্ধীরাণী নিশ্চুপ।
মহারাজ এবার একটানে তার দাড়ি খুলে ফেললো। মাথার পরচুলও খুলে রাখলো।
সিন্ধীরাণী অবাক হয়ে দেখলো মহারাজার রূপ একেবারে পালটে গেছে বলিষ্ঠ জোয়ান একটি লোক তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে তার কুৎসিত লালসাপূর্ণ ভাব।
শিউরে উঠলো সিন্ধীরাণী।
মহারাজ এবার দু’হাত বাড়িয়ে সিন্ধীরাণীকে ধরতে গেল।
সিন্ধীরাণী ভয়ার্ত কণ্ঠে হাত জুড়ে বললো–আর কটা দিন আমাকে সময় দিন মহারাজ, আমি–আমি আপনার কথায় রাজি হব।
ক্ষুধিত শার্দুলের মত মহারাজ দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে যাচ্ছিল, সিন্ধীরাণীর কথায় ধীরে ধীরে হাত গুটিয়ে নিল। কুৎসিত হাসি হেসে বললো–বেশ, তাই হবে। আজ তোমাকে ছেড়ে দিলাম, কিন্তু এরপর তুমি বিয়ে করতে রাজি না হলেও তোমাকে আমি ছাড়বো না। আমার বহু দিনের বাসনা, তোমাকে আমার চাই।
সিন্ধীরাণী ভীত দৃষ্টি নিয়ে মহারাজের আসল চেহারা দেখতে লাগলো। কি অদ্ভুত পরিবর্তন, একটু পূর্বে যে বৃদ্ধ, এখন সে সম্পূর্ণ একটি জোয়ান পুরুষ!
মহারাজ ততক্ষণে নিজের শুভ্র দাড়ি-গোঁফ আর পরচুলা হাতে উঠিয়ে পরতে শুরু করেছে।
নিজেকে সম্পূর্ণ পূর্বের ন্যায় সাজিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো মহারাজ, তারপর হাতে তালি দিল। সঙ্গে সঙ্গে মায়া কয়েকজন সহচরীসহ কক্ষে প্রবেশ করে অভিবাদন করে দাঁড়ালো।
মহারাজ বললো–আমার গোপন আলোচনা শেষ হয়েছে চলো তোমরা।
মহারাজ একবার তীব্র কটাক্ষে সিন্ধীরাণীর দিকে তাকিয়ে মায়া এবং সহচরীগণসহ বেরিয়ে গেল!
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সিন্ধীরাণী।
সিন্ধীরাণী দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে দরজার খিল এঁটে দিল, তারপর দেয়ালে চাপ দিতেই পূর্বের সেই ছোট্ট দরজা বেরিয়ে এলো। সিন্ধীরাণী সেই পথে প্রবেশ করে বনহুরের জামার আস্তিন মুঠোয় চেপে ধরলো–দস্যুসম্রাট, আমি দস্যু নাথুরামের কন্যা নই। আমি দস্যু নাথুরামের কন্যা নই–
বনহুর বললো–আমি সব শুনেছি।
সব শুনেছে, সব শুনেছো, তুমি? আমার বাবা সিন্ধীরাজ সূর্যসেন?
হ্যাঁ, সব শুনেছি রাণী, আমি সব শুনেছি,এতটুকু ফাঁক যদি থাকতো, বা এ পার্শ্ব থেকে বেরিয়ে আসার উপায় যদি জানা থাকতো, তবে আমি মহারাজনামী শয়তানকে সমুচিত শাস্তি দিয়ে ছাড়তাম।
সত্যি তুমি পারতে, পারতে ওকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে? তুমি দস্যুসম্রাট, পারবেই না বা কেন। আমাকে তুমি বাঁচাও, ঐ শয়তান মহারাজের হাত থেকে বাঁচাও-বনহুরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো সিন্ধীরাণী।
দস্যু হলেও বনহুর পুরুষ মানুষ তো, একটা নারীর উষ্ণ স্পর্শ ক্ষণিকের জন্য তাকে বিচলিত করে তুলল, নিজেকে অতি সাবধানে সংযত করে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। ভাবলো, যেমন করে হোক নিজেকে বাঁচাতে হবে, একেও বাঁচাতে হবে। তাছাড়াও মহারাজনামী শয়তানকে তো জানতে হবে এবং তার আসল আস্তানার সন্ধান জেনে নিয়ে সিন্ধীরাজার ধন-রত্ন উদ্ধার করে নিতে হবে এবং সিন্ধীরাজ্যে তার ন্যায্য অধিকারিণী সিন্ধীরাণীকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে
