বনহুর সিন্ধীরাণীর কথার কোন উত্তর না দিয়ে আবার তাকালোলা স্বচ্ছ কাঁচের আবরণী দিয়ে সাগরতলের দৃশ্যগুলোর দিকে।
সিন্ধীরাণী বললো–চলো।
সিন্ধীরাণী এবার এগুলো একটি সরু পথ ধরে। বনহুর ওকে অনুসরণ করলো। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একটা আবছা অন্ধকার স্থানে থমকে দাঁড়ালো সে। বনহুর চারদিকে তাকালো, কিছুই নজরে পড়লো না।
সিন্ধীরাণী বলল, এই যে একটি হাউজের মত দেখছ, এর মধ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ কর।
বনহুর লক্ষ্য করতেই দেখতে পেল, ঠিক তার একপাশে গভীর নিচু একটি খাদ বা গর্ত। ভাল করে চাইতেই আড়ষ্ট হলো তার চোখ দুটো! বিরাট আকার একটা হাঙ্গর সেই নিচু গভীর গর্তটার মধ্যে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে। অন্ধকার গর্তটার মধ্যে হাঙ্গরের চোখ দুটো আগুনের মতোই জ্বলছে।
সিন্ধীরাণী বলল–অপরাধীকে আমরা এই হাঙ্গরের মুখে নিক্ষেপ করে শাস্তি দিয়ে থাকি।
বনহুর বলল– অতি উত্তম কাজ।
কিন্তু তোমাকে আমি……
এভাবে হত্যা করবে না, এই তো?
দস্যুসম্রাট, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তোমাকে আমি হত্যা করতে চেয়ে ভুল করেছি। আমি আমার বাবার মুখে তোমার অনেক কথা শুনেছি। যদিও আমার বাবা কোনদিন তোমার সুনাম করেনি, তবু তার কথাবার্তায় আমি তোমার যে পরিচয় পেয়েছি, সেটা থেকে আমার মনে তোমার সম্বন্ধে অনেক উচ্চ একটা ধারণা জন্মেছে। তোমার অপূর্ব বীরত্বের কাহিনী আমার অজানা নেই। তোমাকে আগে কোনদিন না দেখলেও আমি অনেক শ্রদ্ধা করতাম।
তোমাকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি সিন্ধীরাণী। বনহুরের কথা শেষ হতে না হতেই মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো সেখানে–রাণীজী, মহারাজ এসেছেন!
মহারাজ! অস্ফুট শব্দ করে উঠলো সিন্ধীরাণী।
মায়া পূর্বের ন্যায় বিচলিত কণ্ঠে বললো–সর্বনাশ হবে রাণীজী, মহারাজ যদি জানতে পারে সাগরতলে পুরুষ মানুষ এসেছে।
সিন্ধীরাণীর মুখমণ্ডল মুহূর্তে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো, মায়ার দক্ষিণ হাতখানা সে মুঠোয়। চেপে ধরে অনুনয়ের সুরে বললো– মায়া, ওর কথা যেন প্রকাশ না পায়। তোর হাতে ধরছি মায়া।
মায়ার চোখ দুটো একবার বনহুরের মুখে সীমাবদ্ধ হল। বুঝতে পারলো তাদের রাণী ওকে ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু সেটা যে কত বড় অপরাধ সিন্ধীরাণীর পক্ষে তাও প্রকাশ পায় মায়ার দৃষ্টিতে।
মায়া বললো–আচ্ছা, আমি সবাইকে বারণ করে দিচ্ছি।
মায়া, তুই ছাড়া ওকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। যা সবাইকে বারণ করে দে গিয়ে—
মায়া চলে গেল।
সিন্ধীরাণী অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। বনহুরের মুখমণ্ডলে কোন পরিবর্তন আসেনি, স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো বনহুর– রাণী, তুমি বিচলিত হচ্ছো কেন? আমি মৃত্যুভয়ে ভীত নই!
কিন্তু আমি তোমাকে মরতে দেব না দস্যুসম্রাট। সিন্ধীরাণী দস্যু বনহুরের বুকে মাথা রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলো। তারপর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো–চলো, চলো তুমি আমার সঙ্গে। দ্রুত পা চালিয়ে চলো।
সিন্ধীরাণী বনহুরের হাত ধরে নিয়ে চললো।
একটা কক্ষের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো–এসো।
বনহুর সিন্ধীরাণীর সঙ্গে সেই কক্ষে প্রবেশ করলো। অদ্ভুত সে কক্ষ। সিন্ধীরাণী এবার সেই কক্ষের একপাশে দাঁড়িয়ে দেয়ালের একটি স্থানে চাপ দিল, সঙ্গে সঙ্গে একটা ছোট্ট পথ বেরিয়ে এলো। সিন্ধীরাণী ব্যস্তকণ্ঠে বললো–শিগগির তুমি এই পথে ভেতরে প্রবেশ কর।
বনহুর ভেতরে প্রবেশ করলো।
সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের ছোট্ট পথটা মিশে গেল। যেমন ছিল দেয়াল তেমনি হয়ে পড়লো।
সিন্ধীরাণী প্রিপদে শয্যায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। এই কক্ষটিই সিন্ধীরাণীর শয়ন কক্ষ।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলো মহারাজ, তার পেছনে মায়া এবং সিন্ধীরাণীর কয়েকজন সহচরী।
মহারাজ কক্ষে প্রবেশ করতেই সিন্ধীরাণী শয্যা ত্যাগ করে কুর্ণিশ জানাল। মহারাজ এগিয়ে এলো রাণীর শয্যার পাশে-কেমন আছ বৎস?
সিন্ধীরাণী বললো–উত্তম।
বেশ বেশ! মহারাজ এবার সহচরীগণের দিকে তাকিয়ে বললো–তোমরা যাও, রাণীজীর সঙ্গে একটি গোপন আলোচনা আছে।
মায়া এবং সহচরীগণ কুর্ণিশ জানিয়ে পেছনে হটে বেরিয়ে গেল।
মহারাজের চোখ দুটো কুৎসিত লালসায় চকচক করে উঠলো।
সিন্ধীরাণীর মুখ ভয়ে বিবর্ণ হলো। সে বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই মহারাজ আজ তার ওপর কোন উপদ্রব করে বসবে। ঢোক গিলে বললো–মহারাজ, আমি আপনার কন্যা সমতুল্য।
গর্জে উঠলো মহারাজ-এ কথা তুমি আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দাও কেন? কন্যা সমতুল্য হলেও তুমি আমার কন্যা নও!
মহারাজ। সিন্ধীরাণীর কণ্ঠ কম্পিত!
সিন্ধীরাণী আর মহারাজের যখন এপাশে কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন দস্যু বনহুর ওপাশে দেয়ালে কান লাগিয়ে তাদের সব কথা শুনতে পাচ্ছিল,. যদিও খুব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না; তবু সব কথাই বুঝতে পারছিল সে। বনহুর আরও আশ্চর্য হলো, মহরাজের কণ্ঠস্বর তার যেন বেশ পরিচিত বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু কোথায় শুনেছে স্মরণ করতে পারছে না সে।
মহরাজের কণ্ঠ এবার শোনা যায়–তুমি যাই বলো রাণীজী, আমার হাত থেকে তুমি রেহাই পাবে না। আমি তোমাকে বিয়ে করবো।
অস্ফুট শব্দ করে উঠলো সিন্ধীরাণী-বিয়ে!
হ্যাঁ।
কিন্তু আপনি আমার বাবার বন্ধু জেনেই আমি বিশ্বাস করে আপনার হাতে–
তোমার বাবার বন্ধু বলেই আমি তোমার হিতাকাঙ্খী। তোমায় বিয়ে করে আমি হবো মহারাজ আর তুমি হবে মহারাণী। হাঃ হাঃ হাঃ, অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো মহারাজ।
