হাঁ, মহারাজ মানে আমার বাবার বন্ধু এমন একটা উপায়ে ঐ যন্ত্রচালিত মোটরবোটটা তৈরি করেছে যে, সেটা তারই নির্দেশ মতো কাজ করে। যখন বাইরে নিয়ে যাবার দরকার হবে তখন সে ঐ যন্ত্রচালিত মোটরবোটখানা পাঠিয়ে দেয়। আমি তখন বাইরে যাই। আমাকে পৌঁছে দেবার পর সেটা চলে যায় নির্দিষ্ট স্থানে।
বনহুরের ললাটে গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠলো, থমকে দাঁড়িয়ে বললো–তাহলে তুমি ইচ্ছামত সাগরতল থেকে বাইরে যেতে পার না?
যাবার কোন প্রয়োজন হয় না।
হ্যাঁ। বনহুর নীরবে আবার চলতে শুরু করল।
সিন্ধীরাণীও আর কোন কথা বলল না।
একটা বেলকুনি ধরনের জায়গায় এসে দাঁড়াল সিন্ধীরাণী। বনহুর এসে দাঁড়ালো তার পাশে। অবাক হয়ে দেখলো বনহুর, যে জায়গায় এসে তারা দাঁড়িয়েছে, সেটা যেন একেবারে সাগরজলের মধ্যে। একটা কাঁচের আবরণের মত জিনিস দিয়ে সাগরজল আটকে রাখা হয়েছে। বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে দেখলো বনহুর সাগরতলে নানারকম উদ্ভিদ আর পানি ও গাছপালা। নানা রকম মাছ আর। কতগুলো অদ্ভুত ধরনের জীব দেখতে পেল সে। রং বেরঙের মাছগুলো কি সুন্দর সাঁতার কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উঁচুনীচু অনেক টিলাও নজরে পড়লো তার। এমন সুন্দর একটা জগৎ বনহুর কোনদিন দেখেনি।
তন্ময় হয়ে বনহুর তাকিয়ে আছে সাগরতলের অপূর্ব দৃশ্যের দিকে। উঁচুনীচু টিলার ফাঁকে ফাঁকে অদ্ভুত ধরনের মাছগুলো নানা রকম ভাবে সাঁতার কেটে চলেছে।
হঠাৎ বনহুর চমকে উঠলো, সিন্ধীরাণী বনহুরের কাঁধে হাত রেখেছে! সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো সে–এসব তোমার ভাল লাগছে?
হ্যাঁ।
থাকতে পারবে চিরদিন এখানে?
আশ্চর্য দৃষ্টি মেলে তাকালো বনহুর সিন্ধীরাণীর মুখের দিকে। তারপর বললো–তুমি আমাকে চিরদিনের জন্য আটকে রাখতে চাও?
হ্যাঁ, চাই তোমাকে আমি চিরদিনের জন্য এখানে আটকে রাখতে চাই দস্যুসম্রাট।
কিন্তু তোমার এতে অসুবিধা হবে না? তোমার সহচরীদের কথায় জানতে পেরেছি এখানে নাকি পুরুষের আগমন নিষিদ্ধ?
সিন্ধীরাণী নিষ্পলক চোখে বনহুরের মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললো–শুধু নিষিদ্ধ নয়, এই সাগরতলে কোনক্রমে পুরুষের আগমন হতে পারে না, হলে বিপদজনক।
এ আদেশ কি তোমার বাবার ছিল?
না, আমার বাবার বন্ধু মহারাজার এই আদেশ। সে যদি কোনক্রমে জানতে পারে তাহলে ভীষণ বিপদ হবে। শুধু সে তোমাকেই হত্যা করবে না, আমাকেও হত্যা করতে পারে।
আশ্চর্য কণ্ঠে বললে বনহুর তোমাকে হত্যা করতে পারবে–এমন লোক সে! তাকে তোমরা এত সম্মান কর!
এবার সিন্ধীরাণীর চোখে মুখে একটা বিষণ্ণ ভাব ফুটে উঠলো, বললো– উপায়হীন আমি! তার কথামতই আমাকে চলাফেরা করতে হয়। তার বিনা অনুমতিতে আমি কিছুই করতে পারি না।
তুমি না সিন্ধী দস্যুদের রাণী?
শুধু নামেই রাণী।
সে কি!
হ্যাঁ, এতটুকু অধিকার আমার নেই, নিজের ইচ্ছামত কোন কাজ করি। জানো, তোমাকে এনেছি এটা যদি কোন রকমে সে জানতে পারে, কিছুতেই সে আমাকে ক্ষমা করবে না।
বনহুর অবাক হয়ে সিন্ধীরাণীর কথা শুনে যাচ্ছিল।
সিন্ধীরাণী পুনরায় বলল–জান, সে আমার পিতার বন্ধু হলেও অতি জঘন্য তার মনোবৃত্তি। সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিল, তারপর আবার বলতে শুরু করলো সুযোগ পেলেই সে আমার এই সাগরতলে এসে হাজির হয়, নানা রকম কুৎসিত ইংগিত করে, শুধু আমার হাতের এই আংটির ভয়ে সে আমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
বনহুর তাকালো, দেখলো সিন্ধীরাণীর হাতের আংগুলে একটি লাল টকটকে হীরার আংটি রয়েছে।
সিন্ধীরাণী বুঝতে পারলো বনহুরের মনে তার আংটি সম্বন্ধে জানার বাসনা জেগেছে। তাই বলল–এটাই আমাকে আজও তার হাত থেকে রক্ষা করে আসছে। এটা বিষাক্ত হীরকখণ্ড দিয়ে। তৈরি। এটা একবার কেউ মুখে দিলে সে আর বাঁচবে না।
বুঝতে পেরেছি, মহারাজ তাহলে তোমাকে মহারাণী করতে চান?
সিন্ধীরাণী নত করে নিল তার দৃষ্টি।
বনহুর বললো–তুমি তাহলে আমাকে এখানে নিয়ে এসে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে এখনও জীবিত রেখেছ কেন? তোমার মহারাজা যদি জানতে পারে?
সিন্ধীরাণী চোখ দুটো অশ্রু ছলছল হয়ে উঠলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললো, তোমাকে হত্যা করলে প্রথম সাক্ষাতেই করতাম, কিন্তু তোমাকে আমি হত্যা করতে পারব না।
তুমি তোমার মহারাজের কথা অমান্য করবে?
আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি দস্যুসম্রাট।
বনহুরের ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল। এই কথাটা বনহুর জীবনে বহু নারীর কণ্ঠে বহুবার শুনেছে। আজ সিন্ধীরাণীর কণ্ঠেও সেই আবেগমাখা শব্দের প্রতিধ্বনি। সিন্ধীরাণীও তাকে ভালবেসে ফেলেছে। একটা করুণার আভাস তার মনে ছোঁয়া দিয়ে গেল, মায়া হলো বনহুরের। আজ পর্যন্ত যে-ই তাকে ভালবেসেছে সে–ই কেঁদেছে। চোখের পানি হয়েছে তার সাথী। হায়, একি তারই অপরাধ।
সিন্ধীরাণীর কোমল মুখখানার দিকে তাকিয়ে বেদনায় ভরে উঠলো বনহুরের মন।
সিন্ধীরাণীর বললো–তোমাকে আমি লুকিয়ে রাখবো। মহারাজ কিছুতেই তোমার সন্ধান। পাবে না।
তোমার সহচরীগণ সবাই আমাকে দেখেছে, তারা যদি বলে দেয়।
না, আমাকে তারা সবাই ভালবাসে, সমীহ করে, আমি বারণ করে দিলে ওরা কেউ বলবে না।
তুমি ওদের অত্যন্ত বিশ্বাস কর?
হ্যাঁ, আমার নিজের বোনের চেয়েও ওরা আমাকে বেশি ভালবাসে, তাই ওদের বিশ্বাস করি।
