তবে যে তোমাদের কে একজন মহারাজ আছে বললে?
হ্যাঁ, আমার বাবার এক বন্ধু। বাবার মৃত্যুর পর আমার দেখাশোনার ভার গ্রহণ করেছে। অবশ্য বেশ কিছুদিন পর সে এসেছে এখানে, সে–ই আমাদের মহারাজ।
তাহলে তুমি নারী হয়ে দস্যুতা করো কেন? মহারাজ পারে না?
মহারাজের হুকুম। সেই আমাকে তাদের সকলের রাণী বানিয়েছে।
হুঁ, তোমাদের মহারাজকে ধন্যবাদ। আচ্ছা, তোমাদের দস্যগণ যে জিনিসপত্র দস্যুতা করে। আনে সে–সব জিনিসপত্র কার কাছে জমা থাকে?
এত কথা তোমাকে বলতে আমি রাজি নই।
মৃত্যুদণ্ডে আমি দণ্ডিত, আজ না হয় কাল আমাকে তোমার হাতে মরতে হবে, আমার কাছে। বলতে তোমার আপত্তি কিসের রাণী?
শোনো, আমার বাবার মৃত্যুর পর আমার বাবার অনুচরগণ গোপনে আমার নিকটে আসে। এবং আমি ওদের সমস্ত ভার বহন করি! অনেকদিন আমাদের কাজ বন্ধ থাকলেও আমি ওদের ঠিক ঠিকভাবে পাওনা মিটিয়ে দেই এবং সে কারণেই ওরা আমাদের দল থেকে কোথাও চলে যায়নি। এরপর আমার বাবার বন্ধু মহারাজ আসে, নিজের হাতে আমাদের সকলের দায়িত্ব গ্রহণ করে আমাদের উপস্থিত মহাসঙ্কট থেকে রক্ষা করে। এখন লুণ্ঠিত যত সামগ্রী মহারাজের নিকটেই। জমা থাকছে। ঐদিন তুমি হয়তো দেখেছ আমার সঙ্গে আমার অনুচরগণ খালি হাতে এসেছিল আমাকে পৌঁছে দিতে।
বনহুরের মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরিয়ে এলো দেখেছি। একটু থেমে বললো সে– মহারাজ কোথায় থাকে?
সে খবর কাউকে জানাতে রাজি নই।
আমাকে তো তুমি মৃত্যুদণ্ডই দিচ্ছ, তবু বলতে রাজি নও?
না।
রাণী, আমি তোমার বাবাকে হত্যা করে ভুল করেছি। সেজন্য আমি অনুতপ্ত। তুমি যেভাবে ইচ্ছা আমাকে হত্যা কর, আমি তোমার সে দণ্ড মাথা পেতে নেব।
সিন্ধীরাণী ইতোপূর্বে দস্যু বনহুর সম্বন্ধে সব অবগত ছিল। দস্যু বনহুরের মত অসীম সাহসী বীর পুরুষ কমই আছে। সেই দস্যু আজ তার কাছে নতি স্বীকার করছে। তবু মহারাজের বাসস্থান সম্বন্ধে বলতে রাজি নয় সে।
কিন্তু বনহুরের মনে ঐ একটি কথা বার বার উঁকি দিতে লাগলো, এখন লুণ্ঠিত যতকিছু মহারাজের নিকটেই জমা থাকছে। কে সে মহারাজ, যে দস্যু নাথুরামের বন্ধুলোক। আর কোথায়ই বা তার বাসস্থান– যেখানে লুণ্ঠিত সব দ্রব্য জমা হচ্ছে? যেমন করে থোক তাকে জানতে হবে কে সে মহারাজ, কোথায় তার আস্তানা।
সিন্ধীরাণীর মুখমণ্ডল অনেকটা প্রসন্ন হয়ে এসেছে! বললো– দেখ, তুমি যদিও আমার বাবাকে হত্যা করেছ, তবু আমি তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবো না।
কেন?
আমি তোমাকে …….. না না, যাই পরে বলবো, যাই,
বনহুর কিছু বলার পূর্বেই বেরিয়ে গেল সিন্ধীরাণী। সঙ্গে সঙ্গে লৌহ দরজা অতি দ্রুত বন্ধ হয়ে গেল।
বনহুর চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
আরও দুদিন কেটে গেল সিন্ধীরাণীর খোঁজ নেই।
একজন সহচরী কিছু ফলমূল আর মিষ্টান্ন দিয়ে যেত। পরদিন বনহুর তাকে জিজ্ঞাসা করলো–তোমাদের রাণী কোথায়?
জবাব দিয়েছিল সহচরী-রাণী অসুস্থ।
সেদিন বনহুর বেশ কিছু চিন্তিত হয়েছিল। রাণী সেদিন কি বলতে গিয়ে বলেনি বা বলতে পারলো না। রাতে শুয়ে শুয়েও ঐ কথা মনে পড়ছিল।
হঠাৎ একটা শব্দ হলো, বনহুর না তাকিয়ে চুপচাপ শুয়েই রইলো। কে যেন দরজা খুলে কক্ষে প্রবেশ করলো।
নিকটে এসে দাঁড়ালো।
বনহুর চোখ মেলে তাকালো– একি রাণী তুমি!
হ্যাঁ।
তোমার নাকি অসুখ?
হ্যাঁ।
তবে কেন এলে, অসুখ বাড়বে না?
বাড়তে দাও।
সেকি! বনহুর সোজা হয়ে বসল।
সিন্ধীরাণী বসে পড়লো তার পাশে। একেবারে তার গা ঘেঁষে বসল একবার দরজার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো– দম্রাট, তোমাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি। তুমি আমাদের চেয়ে অনেক উঁচুতে।
তার মানে?
আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি তোমাকে হত্যা করার জন্য বারবার অনুচরগণকে নির্দেশ দিতে গিয়েছি, কিন্তু পারিনি। কে যেন অদৃশ্য হস্তে আমার গলা টিপে ধরেছে। পিতার হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে মনে রাগের সৃষ্টি করতে চেয়েছি তাও হয় নি, রাগের পরিবর্তে হৃদয়ে জেগেছে। এক অভূতপূর্ব অনুভূতি, বারবার তোমার মুখখানা আমার মনের মধ্যে উঁকি দিয়েছে, করে তুলেছে আমাকে উদ্ভ্রান্ত।
বনহুর সিন্ধীরাণীর কথায় এতটুকু বিচলিত হয় না বা সিন্ধীরাণীর নিকট হতে সরে বসে না। মৃদু হেসে বলে–সেজন্য আমিই দোষী।
না না, তুমি দোষী নও দস্যুসম্রাট, তুমি দোষী নও।
তোমার অনুগ্রহের কথা চিরদিন আমার স্মরণ থাকবে।
এখানে তোমার বড় খারাপ লাগছে, না?
অতি উত্তম স্থান এই অন্ধকার কারাকক্ষ, মোটেই খারাপ লাগছে না আমার।
এসো আমার সঙ্গে।
কোথায়?
এসো।
বনহুর গোলপাতার চাটাইয়ের শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল, অনুসরণ করলো সিন্ধীরাণীকে।
পথ চলতে চলতে জিজ্ঞাসা করলো সিন্ধীরাণী–তোমাকে দস্যুসম্রাট বললে রাগ করবে না তো?
না, খুব খুশি হব।
বেশ,তাহলে এখন থেকে তোমাকে দস্যুসম্রাট বলেই ডাকবো, কেমন?
ডেকো।
জানো এখন তুমি কোথায়?
জানি, সাগরতলে।
আর এটাও নিশ্চয়ই জানো, এখান থেকে বের হবার বা পালাবার কোন পথ নেই?
তাও জানি, কিন্তু পথ যদি না থাকবে, তবে এলাম কি করে সিন্ধীরাণী?
ও, তুমি ভুল করছ দস্যুসম্রাট। সেদিন তুমি যে যানে চেপে আমার সঙ্গে এসেছিলে, সেটা এক অদ্ভুত মোটরবোট, আমাকে পৌঁছে দিয়েই ওটা চলে গেছে তার নির্দিষ্ট জায়গায়।
দস্যু বনহুর আশ্চর্য কণ্ঠে বলল–সে কি রকম!
