রহমান স্তব্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো। দু’চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
.
বনহুর আজ ক’দিন হলো এই সাগরতলে এসেছে। প্রথম দিন তাকে একটা আবছা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। ঘন্টাকয়েক একটা গোলপাতার বিছানায় বসে বসে কাটাতেও হয়েছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তাকে সিন্ধীরাণীর এক সহচরী এসে নিয়ে গিয়েছিল সঙ্গে করে।
বনহুর যখন সহচরীর সঙ্গে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছল তখন হতবাক হয়ে পড়েছিল সাগরতলেও এমন দরবারকক্ষ আছে।
একটা সুউচ্চ সিংহাসনে সিন্ধীরাণী বসে আছে। পেছনে কয়েকজন সূতীক্ষ অস্ত্রধারিণী দাঁড়িয়ে রয়েছে। অস্ত্রধারিণী সিন্ধীরাণীর দু’পাশে দাঁড়িয়ে। সামনেও সারিবদ্ধ কয়েজন নারী। সকলের হাতেই তরবারি জাতীয় অস্ত্র।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করে সিন্ধীরাণীকে অভিবাদন করলো। যতই হোক সে তার প্রাণরক্ষাকারিণী।
সিন্ধীরাণী বনহুরকে লক্ষ্য করে বলল–যুবক, জানো এখানে আমি তোমাকে কেন এনেছি?
শুনেছিলাম আমাকে হাঙ্গরের মুখে নিক্ষেপ করা হবে, সে কারণেই এখানে আনা হয়েছে।
তুমি কি এ ভাবে মৃত্যু কামনা কর, না অন্য উপায়ে?
রাণীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার বলার কিছু নেই।
সিন্ধীরাণী বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে। যতই সে ওকে দেখছে। ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বহু পুরুষের সঙ্গে সিন্ধীরাণীর কাজ করতে হয়েছে, কিন্তু সে আজও এমন একটি লোক দেখতে পায় নি যার অদ্ভুত সুন্দর চেহারা তাকে আকৃষ্ট করেছে, যার কণ্ঠস্বর তার কানে অপূর্ব লাগছে, যার প্রতিটি শব্দ তার হৃদয়ে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে। যার গভীর নীল দুটি চোখ তার মনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সিন্ধীরাণী মোহগ্রস্তের মত তাকিয়ে আছে।
বনহুর সিন্ধীরাণীর দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। তারপর বললো– মরার জন্য আমি প্রস্তুত রাণী।
সিন্ধীরাণী সহচরীগণ এবার রাণীর আদেশের প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
কিন্তু একি, রাণীর মুখে কোন কথা নেই।
মায়া নামের সেই সহচরী সিন্ধীরাণীকে লক্ষ্য করে বললো–রাণী, বিলম্ব অশুভ। মহারাজ জানতে পারলে অঘটন হবে। সাগরতলে পুরুষ মানুষ বেশিক্ষণ রাখা উচিত হবে না। আদেশ . দিন, ওকে কিভাবে হত্যা করা হবে।
সিন্ধীরাণী এতক্ষণে যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, চমকে উঠে বললো– মায়া, ওকে নিয়ে যাও, তোমাদের যেভাবে খুশি হত্যা করোগে।
মায়া অন্যান্য সহচরীকে আদেশ দিল– ওকে বেঁধে ফেল।
বনহুরকে বেঁধে ফেলা হলো। কয়েকজন অস্ত্রধারিণী নারী নিয়ে চলল তাকে।
হঠাৎ সিন্ধীরাণী বলে উঠলো– দাঁড়াও!
সবাই দাঁড়ালো।
বনহুর ফিরে তাকালো সিন্ধীরাণীর মুখের দিকে। সে জানতো, সিন্ধীরাণী নিশ্চয়ই পিছু ডাকবে। কারণ সিন্ধীরাণীর মুখোভাবে সে বুঝতে পেরেছিল তার মনের কথা।
সিন্ধীরাণী বলল– ওকে হত্যা না করে বন্দী করে রাখ। আমি নিজ হাতে ওকে হাঙ্গরের মুখে নিক্ষেপ করবো।
মায়া বললো– আচ্ছা।
তারপর বনহুরকে আবার সেই কক্ষে এনে আটক রাখা হলো।
সিন্ধীরাণীর একজন সহচরী কিছু ফলমূল রেখে গেল তার সম্মুখে।
বনহুর ক্ষুধায় কাতর ছিল, খেতে শুরু করলো সে।
ক্লান্তি আর অবসাদে বনহুরের চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো। হাতের ওপর মাথা রেখে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।
হঠাৎ একটা কোমল নরম জিনিসের অস্তিত্ব শরীরে অনুভব করলো বনহুর! ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো– কক্ষের স্বল্পালোকে দেখলো সিন্ধীরাণী তার গায়ে একটা চাদর টেনে দিচ্ছে।
বনহুর চোখ বন্ধ করে ফেললো, সে দেখতে চায় সিন্ধীরাণী কি করে! সিন্ধীরাণী তার শরীরে চাদর ঢাকা দিয়ে চলে যাচ্ছিল–অমনি বনহুর বললো–রাণী!
সিন্ধীরাণী ভীষণ চমকে উঠলো, তারপর থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালো।
বনহুর চাদরটা বুক অবধি সরিয়ে চিৎ হয়ে শুলো। তারপর বললো– অনেক ধন্যবাদ।
সিন্ধীরাণী বনহুরের দিকে এগিয়ে এলো–তুমি কে যুবক? তোমার পরিচয় জানতে পারি কি?
নিশ্চয়ই পার।
বলো–বলো তুমি কে? তুমি যে কোন সাধারণ মানুষ নও, এটা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি।
সে কারণেই বুঝি হত্যাদণ্ডাদেশ অপরের ওপর না দিয়ে নিজের হাতে হত্যা করতে মনস্থ করছে?
তুমি কে বলো বলো, বিলম্ব করো না।
আমি দস্যু বনহুর।
অস্ফুট শব্দ করে উঠলো সিন্ধীরাণী–তুমি দস্যু বনহুর?
হ্যাঁ।
সিন্ধীরাণীর চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলে উঠলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো–এত সহজে আমি দস্যু বনহুরকে হাতের মুঠোয় পাব কোনদিন কল্পনাও করতে পারিনি। তুমিই আমার বাবাকে হত্যা করেছ।
তোমার বাবা, কে সে?
আমি সব জানি, তুমিই আমার বাবার হত্যাকারী।
তোমার বাবার পরিচয় কি রাণী?
আমার বাবা দস্যু নাথুরাম।
তুমি নাথুরামের কন্যা?
হ্যাঁ। গোপনে তুমি আমার বাবাকে হত্যা করলেও আমি সব জানি।
ঠিকই বলেছ–আমি তোমার বাবাকে হত্যা করেছি। শুধু তাকেই নয়, তার কয়েকজন সহকারীকেও আমি উচিত সাজা দিয়েছি। তুমিই নাথুরামের কন্যা, কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কই, তোমার সাথে তো নাথুরামের চেহারার কোনই সাদৃশ্য নেই। তুমি কি তার পালিতা কন্যা?
না, সে আমার বাবা, এই আমি জানি। আমার বাবা আমার সুখের জন্য এই সাগরতলে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে এ আস্তানা তৈরি করে দিয়েছে। আমারই সুখের জন্য সে এখানে একটি অদ্ভুত মোটরবোট তৈরি করে দিয়েছে। যাতে আমার কোন অসুবিধা না থাকে।
