অনুচরটি নীরব, কোন কথা বের হলো না তার কণ্ঠ দিয়ে।
নূরী ওর কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বার বার প্রশ্ন করতে লাগলো– বল হুর কোথায়? তোমরা অমন চুপ করে আছো কেন?
তবু কারও মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো না।
নূরী বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই তার হুরের কোন অমঙ্গল ঘটেছে, নইলে সবাই ওরা নিশ্চুপ। থাকতো না। নূরী এবার রহমানের জামার আস্তিন চেপে ধরল– তুমিও কিছু বলছ না কেন?
আমার হুর কোথায় বল? বল কোথায়?
রহমান এতক্ষণ চুপ থাকলেও মনের মধ্যে তার ঝড়ের তাণ্ডব বয়ে চলেছে, সব সংবাদ গোপন করতে পারে, কিন্তু এ সংবাদ গোপন করা চলে না। রহমান বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো–নূরী, আমরা সর্দারকে হারিয়েছি!
সঙ্গে সঙ্গে নূরী আর্তনাদ করে উঠলো–কি বললে, আমার হুর হারিয়ে গেছে!
অন্য একজন অনুচর বলে উঠলো–হাঁ, আমাদের সর্দারের মৃত্যু ঘটেছে।
নূরী রহমানকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত ছুটে গেল, নিজের খোঁপার মধ্যে লুকানো ধারালো সূতীক্ষ্ণ ছোরাখানা বের করে সঙ্গে সঙ্গে বসিয়ে দিল অনুচরটার বুকে।
কেউ কিছু বুঝবার পূর্বেই এত দ্রুত এই ঘটনা ঘটে গেল যে, রহমান পর্যন্ত নূরীকে আটকাতে পারলো না।
অনুচরটা আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। কিছুক্ষণ ছটফট করার পর স্থির হয়ে গেল তার দেহটা। রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো দরবার কক্ষের মেঝে!
নূরী এক মুহূর্ত ভূলুণ্ঠিত মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে ছুটে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।
রহমান বলল–একি হলো আমাদের! রহমান ছোট্ট বালকের ন্যায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
সমস্ত আস্তানায় একটা গভীর বেদনার ছায়া ঘনিয়ে এলো। সর্দারের শোকে সমস্ত অনুচর মুষড়ে পড়লো। নূরী সেই যে বেরিয়ে গেল, আর ঘরে ফিরে এলো না। বনে বনে কেঁদে কেঁদে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। এলো চুল, এলায়িত বস্ত্রাঞ্চল। দু’চোখে অশ্রু, পাগলিনীর ন্যায় হয়ে পড়লো নূরীর অবস্থা।
নূরী বনে বনে ঘোরে আর ডাকে হুর, হুর! কখনও ঝর্ণার পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদের কোথায় তুমি! কখনও গাছের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় বনহুর তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, ছুটে যায় ধরতে, অমনি গাছের গুঁড়িতে মাথা ঠুকে মাথা ফেটে যায়, রক্ত গড়িয়ে পড়ে। নূরী লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।
রহমান নীরবে দেখে, সেও চোখের পানি ফেলে। রহমান নূরীকে ছোটবেলা থেকে ভালবাসে, প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, কিন্তু কোনদিন সে তার ভালবাসা নূরীকে জানায় নি। জানে রহমান, নূরী আর একজনকে ভালবাসে, তাই সে কোনদিন নূরীর প্রেমে বাদ সাধতে যায় নি।
আজ নূরীর অবস্থা রহমানের মনে ব্যথার আগুন জ্বেলে দিয়েছে। কি করবে, কি করে নূরীকে সুস্থ করা যায় ভেবে আকুল হয় সে।
একদিকে সর্দারের অভাবে সমস্ত আস্তানার দায়িত্বভার তাকে গ্রহণ করতে হয়েছে। কিভাবে তাদের কাজ চলবে, কিভাবে সবকিছু ঠিক রাখবে, এসব নিয়ে সব সময় তাকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। সর্দারের অভাবে তাদের দল যাতে নষ্ট হয়ে না যায় সেজন্য রহমানের চেষ্টার ত্রুটি নেই।
এখানে থেকেই রহমান সিন্ধের খোঁজখবর নিতে লাগলো। তাদের সর্দার-পত্নীর যেন কোন অসুবিধা না হয় বা কোন রকম কষ্ট না পায়, সে ব্যাপারেও রহমান সতর্ক রইলো। কায়েস ছাড়াও কয়েকজন বিশিষ্ট অনুচরকে সিন্ধে মনিরার নিকটে রেখে দিল সে।
কিন্তু সবচেয়ে তার বড় চিন্তা এখন নূরীকে নিয়ে। ওকে কি করে বাঁচানো যায়! কি করে ওকে স্বাভাবিক করা যায়। নূরী কারও কথা শোনে না, কারও কাছে সে আসে না–সব সময় হুর হুর বলে চিৎকার করে। একমাত্র রহমান ছাড়া কেউ নূরীর নিকটে যায় না। এমন কি নূরীর সখীগণও তার নিকট যেতে ভরসা পায় না। ভয় পায়, নূরীর খোঁপার সূতীক্ষ ছুরি আবার যদি কারও বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়!
রহমান গেলে নিশ্চুপ থাকে নূরী। কোনরকম উৎপাত করে না বা ধমক দেয় না। রহমানই অনেক বলে–কয়ে একটু খাওয়ায় ওকে।
সেদিন নূরী একা ঝর্ণার পাশে বসে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিল। দু’চোখ তার বসে গেছে, চুলে বনের পাতা আটকে রয়েছে। কাপড় ছিঁড়ে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে।
রহমান ধীরে ধীর নূরীর পাশে গিয়ে বসলো। নূরীর কাঁধে হাত রেখে ডাকলো– নূরী!
নূরী এতটুকু চমকে উঠলো না। সে যেমন বসে ছিল তেমনি বসে রইলো।
রহমান বললো– নূরী, এমনি করে কাঁদলেই কি সে ফিরে আসবে? না তোর ডাকে সাড়া দেবে?
নূরী হঠাৎ ভাল মানুষের মত বলে উঠলো–রহমান, সত্যি সে আর কোন দিন ফিরে আসবে না?
যে চলে যায় সে কি ফিরে আসে পাগলী! কেন তুমি মিছামিছি তার জন্য এত কেঁদেকেটে আকুল হচ্ছো?
রহমান, আমি যে কিছুতেই মনকে সুস্থির করতে পারছি না। আমি যে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না আমার হুর নেই …… চিৎকার করে ওঠে নূরী না না, সে বেঁচে আছে। আমার মন বলছে সে বেঁচে আছে! রহমান, সে আবার আসবে, আবার আসবে!
হ্যাঁ আসবে, চলো তবে ঘরে চলো নূরী।
না, সে না এলে আমি ঘরে যাব না!
এই বনে বাঘ তোমাকে খেয়ে ফেলবে নূরী!
তাহলে তো আমার খুব আনন্দ হত রহমান, আমার হুরকে হারানোর কষ্ট আমাকে আর সইতে হত না।
এই তো বললে তোমার হুর বেঁচে আছে। আবার তুমি মরতে চাচ্ছো কেন?
কি জানি আমি কিছুই বুঝতে পারছি না রহমান।
চলো নূরী, ঘরে চলো।
না না, তুমি আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে চেয়ো না। আমি যাব না– যাব না– নূরী সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেল।
