হিমশীতল মেঝেতে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ভাবলো, এখন কিভাবে এই বন্দীখানা থেকে সে উদ্ধার পেতে পারে! এমন যে একটা অবস্থা তার জীবনে আসবে কল্পনাও করতে পারেনি দস্যু বনহুর। কিন্তু এত বিপদেও সে একটুও বিচলিত হয় নি। মাঝে মাঝে মনে পড়ছে মনিরার কথা। তার অন্যান্য অনুচর যারা বজরায় ছিল তাদের কথা। এখন ওরা কোথায়, কেমন আছে। জীবিত আছে না ওদের অবস্থাও তার সেই নিহত অনুচরটির মত হয়েছে কে জানে!
বনহুর দেখতে পেল একপাশে একটি গোলপাতার তৈরি চাটাই বিছানো রয়েছে। অগত্যা সে ঐ চাটাইটার ওপর গিয়ে বসলো।
হাঁটুর মধ্যে মাথা রেখে নিশ্চুপ বসে রইলো। জীবনে এই বুঝি দস্যু বনহুর ক্ষণিকের জন্য শান্তভাবে বসতে পারলো। চির-চঞ্চল, চির-উচ্ছল সে। বিশ্রাম বলে জীবনে সে কিছু জানে না।
বনহুর নিশ্চুপ বসে থাকলেও মন তার নিশ্চুপ ছিল না। এখান থেকে কিভাবে উদ্ধার পাবে, কিভাবে পালাতে সক্ষম হবে ভাবতে লাগলো। অবশ্য এখান থেকে পালানোর জন্য তাকে বেশি অসুবিধায় পড়তে হবে না, কারণ এই নারী রাজ্যে সে একমাত্র পুরুষ–দস্যু বনহুর মৃদু হাসলো।
.
মনিরা কিছুতেই ফিরে যাবে না। যে নদীগর্ভে তার স্বামী প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, সেইখানে সেও প্রাণ দেবে। কিন্তু দস্যু বনহুরের অনুচরগণ ও কায়েস তা হতে দিল না। মনিরাকে জোরপূর্বক বজরার কুঠরিতে আটকিয়ে তাকে সিন্ধে নিয়ে যাওয়া হল।
দস্যু বনহুরকে অনুচরগণ প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, কাজেই মনিবপত্নীকেও তারা কম ভালবাসে না। বনহুর মনিরাকে বিয়ে করেছে, এ কথা বনহুরের অন্যান্য অনুচর না জানলেও কয়েকজন বিশিষ্ট অনুচর জানত। বনহুর নিজে এদের কাছে বলেছিল। অবশ্য সে নূরীর কাছে বলতে চেয়েছে, কিন্তু নূরী তার কোন কথা শুনতে রাজি নয়। তাই কথাটা আজও নূরী জানে না।
সর্দার বিয়ে করায় তার অনুচরগণ সবাই খুশি হয়েছে, কিন্তু কেউ কথাটা নূরীকে বলার সাহসী হয় নি।
সিন্ধি শহরে পৌঁছে তার জন্য কেনা বাড়িটা দেখে মনিরার মনটা ব্যথায় গুমড়ে কেঁদে উঠল। তার সুখের জন্য মনির এতও করেছিল! রাজ প্রাসাদের মত বাড়ি-বাড়ির প্রত্যেকটা কক্ষ মূল্যবান আসবাবে সুন্দর করে সাজানো। বাড়ির সম্মুখে সুন্দর বাগান। নানারকম ফুলের সমাবেশ সেই বাগানে। গাড়ি বারান্দায় গাড়ি। দরজায় পাহারাদার, মনিরার যাতে কোন অসুবিধা না হয় সে জন্য সিন্ধিবাসী কয়েকজন দাস-দাসীও সংগ্রহ করে রেখেছে সে।
মনিরা এসব যতই লক্ষ্য করতে লাগল ততই সে ভেঙে পড়ল। নাওয়া খাওয়া সব ছেড়ে দিল। পাগলিনীর মত হয়ে পড়ল সে।
কায়েস মনিরাকে শান্ত, সুস্থ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
বনহুরের কয়েকজন অনুচর ফিরে গেল তাদের নিজস্ব আস্তানায়।
.
নূরী আজ ক’দিন হলো অস্থিরচিত্ত নিয়ে বনহুরের প্রতীক্ষা করছে। কোনদিন তো তার এমন বিলম্ব হয় না। এবার সপ্তাহ হতে চললো বনহুর ও তার কয়েকজন অনুচর উধাও হয়েছে! নূরীর একমাত্র ভরসা বনহুর যদি কোন বিপদে পড়তো বা পুলিশের হাতে বন্দী হত, তাহলে তার। অনুচরগণ ফিরে আসতো এবং সব সংবাদ দিত। কিন্তু আজও কেউ ফিরে এলো না, ব্যাপার কি!
কোথায় গেছে বনহুর, কবে ফিরবে, কেন ফিরছে না– সদাসর্বদা এই ধরনের প্রশ্নে রহমানকে সে অস্থির করে তুললো।
বনহুর অবশ্য রহমানকে সব বলে গেছে। রহমানকে না বলে সে যেতে পারে না, কারণ সেখানে তার বেশ কিছুদিন বিলম্ব হতে পারে।
রহমান নিজে বনহুর আর মনিরাকে সেদিন বজরায় উঠিয়ে দিয়ে এসেছে, কাজেই রহমান মুখে কিছু না বললেও সে নিশ্চিন্ত। তাদের সর্দার এখন কোথায় জানে সে।
বনহুর যাবার সময় রহমানের ওপর কিছু কাজের ভার দিয়ে গেছে এবং কিভাবে সেসব কাজ করতে হবে সব বলে গেছে। রহমান সেই মত কাজ করে চলেছে!
নূরীর বিচলিত ভাব লক্ষ্য করে রহমান দুঃখ পেত। নূরী যে বনহুরকে মনেপ্রাণে ভালবাসে এ কথা জানত রহমান। মুখে সান্ত্বনা দিত, বলতো, নিশ্চয়ই তিনি এসে যাবেন, অনেক দূরে গেছেন তাই ফিরতে বিলম্ব হচ্ছে, চিন্তা করো না।
রহমানের সান্ত্বনায় নূরীর মন আশ্বস্ত হত না, মনের কোণে একটা দুশ্চিন্তার মেঘ জমাট বেঁধে থাকত।
হঠাৎ এমন দিনে বনহুরের কয়েকজন অনুচর এসে হাজির হলো সিন্ধ শহর থেকে। রহমানকে দুর্ঘটনার কথা খুলে বললো তারা।
রহমান আর্তনাদ করে উঠলো– সর্দার নেই!
অনুচরগণ মাথা নত করলো, সকলের চোখ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। জীবনে তারা কেঁদেছে কিনা কে জানে। কঠিন হৃদয় দস্যুগণ আজ তাদের সর্দারের শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লো।
নূরী শুনতে পেল যারা বনহুরের সঙ্গে গিয়েছিল তারা ফিরে এসেছে ছুটে গেল সে দরবারকক্ষে।
রহমান আর অনুচরগণ সেখানেই ছিল।
নূরী দরবারকক্ষে প্রবেশ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালো, কেমন যেন থমথমে ভাব বিরাজ করছে। সেখানে। নূরী লক্ষ্য করলো, রহমানের চোখে পানি। নূরীর মন আতঙ্কে শিউরে উঠলো। অন্যান্য অনুচর যারা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সকলের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সে– একি, সকলের মুখেই একটা বিষাদের কালোছায়া! সকলের চোখেই অশ্রু! তবে কি তার হুরের কোন অমঙ্গল ঘটেছে?
নূরী ক্ষিপ্তের ন্যায় একজন অনুচরের জামার আস্তিন মুঠোয় চেপে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠলো– হুর কোথায়? হুর কোথায় বল?
