বনহুর বললো–নিশ্চয়ই কোন মহারাণী……
না, আমি সিন্ধী দস্যুদের রাণী।
বনহুর মিছামিছি ভয় পাবার ভান করে বললো– সর্বনাশ, তাহলে আমার মৃত্যু অনিবার্য! তুমি আমাকে হত্যা কর রাণী! তোমার হাতে মরতে আমার একটুও কষ্ট হবে না। বনহুর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সিন্ধীরাণীর সম্মুখে। মৃদু হেসে বললো– দাও। তোমার তরবারি আমার বুকে বসিয়ে দাও।
সিন্ধীরাণীর দু’চোখে বিস্ময়। একি অদ্ভুত যুবক! বড় মায়া হলো সিন্ধী রাণীর, বললো মরতে তোমার এত সাধ কেন যুবক?
বাঁচবার যার কোন আশা নেই, তার মৃত্যুভয়ে ভীত হবার কোন কারণই থাকতে পারে না।
সিন্ধীরাণী এগিয়ে আসে– তুমি বাঁচতে চাও?
বাঁচবার সখ কার না হয় রাণী?
এখন আমি তোমাকে কিভাবে বাঁচাতে পারি?
তুমি আমাকে মৃত্যুদণ্ড–
না, তা হয় না যুবক, চলো তোমাকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।
তোমার সঙ্গে?
হ্যাঁ, রাজি আছ?
জীবনের বিনিময়ে আমি সব কাজেই রাজি আছি।
এসো। যুবতী তরবারিখানা খাপের মধ্যে রেখে এগিয়ে এলো। একটা রুমাল বের করে দস্যু বনহুরের চোখ দুটো বেঁধে দিল। তারপর বললো– ধর, আমার হাত ধর, এসো আমার সঙ্গে।
দস্যু বনহুরের মনে একখানা মুখ আলোড়ন তুলছিল, না জানি তার মনিরা এখন কোথায়, কেমন আছে। নিজেকে বাঁচাতে হলে এই যুবতীর সঙ্গে যাওয়া ছাড়া তার কোন উপায় নেই। তাকে বাঁচতে হবে। মনিরা কোথায়, তাকে বাঁচাতে হবে।
বনহুর হাত বাড়িয়ে যুবতীর হাত ধরলো।
বনহুর অনুভব করলো যুবতীর হাতখানা তার হাতের মুঠায় একটু কেঁপে উঠলো।
মৃদু হাসির আভাস ফুটে উঠলো বনহুরের ঠোঁটের কোণে। একেই বলে নারীজাতি। যারা এতটুকুতেই বিচলিত হয়ে পড়ে। এতটুকুতেই মুষড়ে যায়। একটু পূর্বে যে তাকে হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হচ্ছিল না, আর এক দণ্ডের মধ্যেই তার মধ্যে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। নারীজাতি এমনই হয়, করুণা জাগে মনে।
বনহুরের মুখে হাসি দেখে বলে সিন্ধীরাণী–হাসলে কেন যুবক?
বনহুর নিজের আসনে স্থির হয়ে বসে বলল–নিয়তির খেলা দেখে হাসি পাচ্ছিল।
নিয়তির খেলা, সে কি রকম যুবক?
নিয়তি মানে অদৃষ্ট। একটু পূর্বেই মৃত্যু আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল, এক্ষণে বাঁচার আনন্দ আমাকে অভিভূত করে তুলছে। আচ্ছা, আমাকে তুমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছ রাণী?
সাগরতলে।
সাগরতলে!
হ্যাঁ আমার গোপন আস্তানা সেই অদ্ভূত রাজ্যে। জান যুবক, তোমাকে আমি যেখানে নিয়ে যাচ্ছি সেখানে কোনদিন কেউ যেতে পারেনি, আমার কোন অনুচরও নয়।
তাহলে আমিবনহুর গলায় ভীতি ভাব এনে বলে?
তোমার কোন ভয় নেই যুবক। আমার সাগর তলের সেই গোপন আস্তানা অতি সুন্দর, সেখানে কোন কষ্ট হবে না।
কিন্তু…. আমি সেখানে বাচবো তো? নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে না?
পাগল! আমি বুঝি মানুষ নই?
কিন্তু এমন করে আমার চোখ বেধে …..
না না, যতক্ষণ না আমি নিজে তোমার চোখের বাঁধন খুলে দিচ্ছি ততক্ষণ তুমি খুলবে না।
আচ্ছা।
বনহুর লক্ষ্য করলো মোটর বোটখানা সাঁ সাঁ করে নিচের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কই, তার শরীরে তো পানির ছোঁয়া লাগছে না। বোটখানা ছাড়ার পূর্বে একটা শব্দ শুনতে পেয়েছিল বনহুর। এবার বুঝতে পারলো সিন্ধীরাণী কোন যন্ত্রের সাহায্যে মোটর বোটখানার উপরে আচ্ছাদন সৃষ্টি করছে, যার জন্য সাগরের জল তাদের বোটের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে না।
বেশ কিছুক্ষণ চলার পর বনহুর বুঝতে পারলো মোটর বোটখানা থেমে পড়লো।
এবার দু’খানা কোমল হাত তার চোখের বাঁধন খুলে দিল।
বনহুর অবাক হয়ে দেখলো, সত্যিই অদ্ভুত এক রাজ্যে সে এসে পৌঁছেছে।
সিন্ধীরাণী বলল– যুবক নেমে এসো!
বনহুর নেমে পড়লো। ভাল করে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো, গভীর সাগরতলে অতি কৌশলে এই প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছে। যদিও এখানে পৃথিবীর আলো-বাতাসের নামগন্ধ নেই, তবু নিঃশ্বাস নিতে কোন কষ্ট হচ্ছে না বা আলোর কোন অসুবিধা নেই। উজ্জ্বল নীলাভ আলো প্রতিটি কক্ষকে আলোকিত করে রেখেছে।
সিন্ধীরাণী সাগরতলে পৌঁছতেই বনহুর দেখতে পেল কতগুলো যুবতী তাকে অভ্যর্থনা জানালো। সবাই নতমস্তকে ওকে অভিবাদন করলো। যদিও তারা তাদের রাণীর সঙ্গে একটি পুরুষ মানুষকে দেখে আশ্চর্য হচ্ছে তবু কারও কোন প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না। রাণীর অলক্ষ্যে সবাই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিল।
সিন্ধীরাণী এবার গম্ভীর কণ্ঠে তার সহচরীগণকে বলল– একে নিয়ে যাও। সাবধানে বন্দী করে রাখো।
একজন সহচরী কুর্ণিশ জানিয়ে বলল– রাণীজী, সাগরতলে পুরুষ মানুষ নিয়ে আসা কি ঠিক হয়েছে?
সে প্রশ্ন তোমাকে করতে হবে না মায়া, তোমাকে যা বললাম তাই কর।
তবু মায়া বলে উঠলো মহারাজ যদি জানতে পারেন?
তিনি জানবার পূর্বেই আমি ওকে হাঙ্গরের মুখে নিক্ষেপ করবো।
এবার সহচরীগণ বেশ খুশি হয়েছে বলে মনে হলো দস্যু বনহুরের।
মায়া দস্যু বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো– এসো আমার সঙ্গে।
বনহুর বিনাবাক্যে মায়াকে অনুসরণ করলো।
মায়ার সঙ্গে বনহুর একটি আবছা অন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করলো। সামান্য নীলাভ আলো ঘরটাকে আলোকিত করে রেখেছে। ঘরটা অত্যন্ত ঠাণ্ডা বলে মনে হলো তার। বনহুর সে কক্ষে প্রবেশ করতেই কক্ষের দরজা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেল।
কোথায় মায়া আর কোথায় কে! দস্যু বনহুর বেশ বুঝতে পারলো সে এখন সাগরতলে বন্দী।
