হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বনহুর।
কিন্তু এই গহন বনে কতক্ষণ সে ঐ ভয়ঙ্কর জীবটার হাত থেকে রক্ষা পাবে? হয়তো ঐ রকম আরও অনেকগুলো জীব আছে। যে কোন মুহূর্তে তার মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু অতি সহজে সে কাবু হবার বান্দা নয়। মরতে হয় মরবে তাতে আফসোস নেই। কিন্তু ঐ অদ্ভুত জীবের হাতে নয়।
বনহুর পাথরটার নিচে থেকে বেরিয়ে এলো। কি করবে, কোন দিকে যাবে ভাবতে লাগলো। নদীটা কোন দিকে সে তাই লক্ষ্য করতে লাগলো।
অতি সন্তর্পণে নিজেকে ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে এগুতে লাগলো দস্যু বনহুর। হঠাৎ একটা শব্দ তার কানে এলো, অশ্বপদশব্দ বলে মনে হলো। ….
এই গহন বনে, বিশেষ করে সিন্ধি পর্বতের নিকটে অশ্বপদশব্দ–অবাক হলো বনহুর। তাড়াতাড়ি মাটিতে কান লাগিয়ে শুনলো। হ্যাঁ, তার অনুমান মিথ্যা নয়। কতগুলো অশ্ব একসঙ্গে এই দিকেই যেন ছুটে আসছে।
তবে কি কোন মানুষের আগমন হয়েছে?
আশায় আনন্দে বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। পরক্ষণেই মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা দোলা দিল তার, পুলিশের দলতো তার সন্ধানে সিন্ধি পর্বতে আগমন করেনি!
তাড়াতাড়ি বনহুর একটা ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে পড়লো। অশ্বপদশব্দ নিকটবর্তী হচ্ছে। বনহুর উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
অল্পক্ষণেই একদল অশ্বারোহী অতি দ্রুত তার সামনে দিয়ে চলে গেল। বনহুর লক্ষ্য করলো সর্বাগ্রের অশ্বারোহী পুরুষ নয়-নারী। অদ্ভুত তার শরীরের ড্রেস। মাথায় সুন্দর মুকুট, গলায় ঝক ঝক করছে মনিমুক্তার মালা। খোঁপায় জড়ানো কতগুলো ফুলের গুচ্ছ। কিন্তু একি, নারীর কোমরে বেল্টের খাপে তরবারি কেন?
আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করলো বনহুর। সামনের নারী অশ্বারোহীর পেছনে সবগুলো। অশ্বারোহী বলিষ্ঠ জোয়ান পুরুষ। সকলের হাতেই রাইফেল আর বন্দুক।
বনহুরের মনে একটা জানার বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। নিশ্চয়ই এরা সভ্য মানুষ, হয়তো তাকে এরা কোনরকম সাহায্য করতে পারে।
বনহুর যতদূর সম্ভব দ্রুত ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে ছুটতে শুরু করলো, কোন্ দিকে গেল ওরা।
বনহুর কিছুদূর এগুতেই দেখলো একপাশে সিন্ধি পর্বতের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। আর একপাশে উজ্জ্বল জলরাশি তীরে আছাড় খেয়ে পড়ছে। এ সে কোথায় এসে পড়েছে? এটা তো সেই নদী, যে নদীবক্ষে কাল রাতে সে আর মনিরা বজরায় বসে ঝিন্দের পথে যাচ্ছিল।
অদূরে তাকাতেই বিস্ময়ে থ’হয়ে পড়লো বনহুর।
ঐ জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে একখানা মোটর বোট ধরনের নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। আরও অবাক হলো সে, এত ঢেউয়ের আঘাতেও মোটর বোটখানা এতটুকু নড়ছে না বা দুলছে না।
অশ্বারোহিগণ সেই মোটর বোটখানার অদূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
বনহুর সামনে যাবে কিনা ভাবতে লাগলো। এমন সময় তার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো অশ্বারোহীদের সামনের নারীটির ওপর। নারীটিকে সবাই ঘিরে ধরে অভিবাদন করছে!
বনহুর বুঝতে পারলো উক্ত যুবতী ঐ দলের নেত্রী বা সে ধরনের কিছু হবে। রাণীকে অভিবাদন করে সবাই পেছনে সরে দাঁড়ালো। নারীটি এবার তার অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়ালো, তারপর হাত নাড়ালো।
সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অশ্বারোহী বলিষ্ঠ পুরুষ তাদের নিজ নিজ অশ্বপৃষ্ঠে যে পথে এসেছিল সেই পথে ফিরে চললো। একজন তাদের রাণীর অশ্ব লাগাম ধরে নিজের অশ্ব চালনা করতে লাগলো, অল্প সময়ের মধ্যেই সাগরতীর জনশূন্য হয়ে পড়লো। একমাত্র সেই যুবতী ছাড়া আর কেউ নেই।
যুবতী এবার দ্রুত তার মোটরবোটের দিকে এগুলো।
বনহুর দ্রুত যুবতীর কাছে গিয়ে হাজির হলো। ডাকলো-এই শুনো।
যুবতী চমকে উঠলো, অবাক হয়ে তাকালো। এই জনহীন নির্জন স্থানে মানুষ দেখতে পেয়ে বিস্ময়ের সীমা রইলো না তার। সে বনহুরের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ক্রুদ্ধ সিংহীর ন্যায় গর্জন করে উঠলো-কে তুমি?
যুবতী দস্যু বনহুরকে যখন নিরীক্ষণ করছিলো তখন বনহুরও ওকে সূতীক্ষ দৃষ্টি মেলে দেখে নিচ্ছিল। যুবতী সুন্দরী বটে-সুঠাম দেহ, যৌবনের জোয়ার তার সারা দেহে। চোখ দুটো বুদ্ধিদীপ্ত। যুবতী সাধারণ কোন মেয়ে নয় বুঝতে বাকি থাকে না বনহুরের।
বনহুর যুবতীর দিকে নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে দেখে যুবতী আরও রেগে গেল, কঠিন কণ্ঠে বললো–কে তুমি জবাব দাও?
যুবতীর আচরণে মুগ্ধ হলো দস্যু বনহুর। জীবনে কোন নারী তার সঙ্গে এভাবে কথা বলেনি বা বলতে সাহসী হয় নি। যাকে সে পেয়েছে বা যাকে সে দেখেছে সবাই তাকে চোখের পানি উপহার দিয়েছে।
বনহুরকে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো যুবতী–কি চাও?
বনহুর বললো–জানতে চাই তুমি কে?
মুহূর্তে যুবতী কোমরের বেল্ট থেকে সূতীক্ষ্ণ ধার তরবারি খুলে নিল-আমি কে জানতে চাও? যদি প্রাণ দিতে চাও তবেই জানতে পারবে আমি কে!
প্রাণ নেবে। হেসে উঠলো দস্যু বনহুর!
যুবতী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। দস্যু বনহুরের হাসির মধ্যে সে কি দেখতে পেয়েছে, সে নিজেই বুঝি জানে না!
বনহুর হাসি থামিয়ে বললো–এ সিন্ধী পর্বতে মানুষ একা কোনদিন বাঁচতে পারে না। মরতে যখন হবেই তখন না হয় তোমার হাতেই মরলাম। তবু সিন্ধী পর্বতের সেই ভয়ঙ্কর জীবের পেটে যেতে চাই না। হত্যা কর তুমি আমাকে।
যুবতী এবার তার উদ্যত তরবারি নামিয়ে নিল, বললো–তুমি জানো না যুবক আমি কে। জানলে আমার সামনে আসার সাহস তোমার হত না।
