অতি কষ্টে নিজেকে টেনে টেনে বনহুর ঐ মৃতদেহটার নিকটে পৌঁছতে সক্ষম হলো। মৃতদেহটার দেহ একেবারে ছিন্নভিন্ন খণ্ড-বিখণ্ড, দেখে চিনবার কোনো উপায় নেই। এ তারই অনুচর ছাড়া আর কেউ নয়।
বনহুর আশ্চর্য হলো, এতক্ষণও তার দেহ ঐ লোকটার মত ছিন্নভিন্ন হয় নি কেন? তাবে কি তাকে রেখে দেওয়া হয়েছে পরে ভোজনের জন্য..ঠিক তাই হবে।
কিন্তু ওরা কোথায়–মনিরা আর তার অনুচরগণ। তাদেরকেও কি ঐ নিষ্ঠুর জীবটা হত্যা করেছে? বনহুরের মনের মধ্যে একটা অশান্তি ঘূর্ণি হাওয়ার মত ঘুরপাক খেতে লাগলো। নিজের কথা ভুলে গিয়ে ওদের চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লো দস্যু বনহুর।
কিন্তু বেশিক্ষণ এখানে এভাবে বসে ভাববার সময় তার নেই। তাকে বাঁচতে হবে, যেমন করে হোক বাঁচতে হবে। মরতে হলে এমনভাবে মরা তার চলবে না।
বনহুর অতি কষ্টে উঠে দাঁড়ালো। মাটিতে দৃষ্টি পড়তেই তার সাহসী অন্তরও শিউরে উঠলো। যেখানে বনহুর তখন দাঁড়িয়ে রয়েছে সে জায়গাটা ভিজা স্যাঁতসেঁতে ধরনের। বনহুর স্পষ্ট দেখলো। ভিজা মাটির বুকে অদ্ভুত ধরনের কয়েকখানা পায়ের ছাপ।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালাতে চেষ্টা করলো। হয়তো এখনই সেই জীবটা এসে পড়বে এবং তার দেহটা অখণ্ড খণ্ড করে খেয়ে ফেলবে। কি ভয়ঙ্কর জীব এটা! কেমন দেখতে, কি ওর নাম কিছুই জানে না সে।
জীবটাকে একবার দিনের আলোয় দেখার ইচ্ছা হলো দস্যু বনহুরের। সে ভাবতে লাগলো কি করে, কোথায় লুকিয়ে ঐ জীবটাকে দেখতে পারে, অথচ নিজেকে বাঁচাতে হবে।
হঠাৎ একটা থপ থপ শব্দ বনহুরের কানে এলো। চমকে উঠলো সে, তাড়াতাড়ি পাশের। একটা পাথরখণ্ডের নিচে গিয়ে লুকালো।
অল্পক্ষণেই তার নজরে পড়লো সামনের গাছগুলোর মাথার উপর দিয়ে একটা ভয়ঙ্কর মুখ। প্রকাণ্ড একটা মাথা, ছেলেদের খেলার বলের মত দুটো চোখ আগুনের ভাটার মত জ্বলছে।
বিরাট বড় বড় কতগুলো দাঁত। দু’হাত দিয়ে গাছপালা সরিয়ে হুমহুম শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে।
বিস্ময় নিয়ে বনহুর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। ইস, যদি তার হাতে একটা রিভলভার বা ঐ ধরনের কিছু থাকত! পানিতে গলায় জীবটার হাতের চাপে সে জ্ঞান হারাবার সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে রিভলভার পড়ে গিয়েছিল।
জীবটা ততক্ষণে নিকটে পৌঁছে গেছে।
বনহুর অবাক হয়ে দেখলো গরিলা ধরনের জীব এটা। জীবটা একটা তালগাছের সমান উঁচু হবে, লম্বা লম্বা দুটি লোমশ বাহু। দেহের আকারে মাথাটা বেশ ছোট-ঠিক গরিলার মত, কিন্তু আসলে জীবটা গরিলা নয় বেশ বুঝতে পারলো বনহুর। একটা আশ্চর্য জিনিস সে লক্ষ্য করলো, জীবটা একটি মাত্র পা! এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। দাঁতগুলো অতি ধারালো, তীক্ষ্ণ। আংগুলের নখগুলোও তেমনি সূতীক্ষ্ণ। পা-খানা একটা তালগাছের গুঁড়ির মত মোটা, পায়ের তলাটা ঠিক যেন কুলোর মত চওড়া।
বনহুর এর বেশি আর লক্ষ্য করার মত সুযোগ পেল না। অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে পাথর খণ্ডটার নিচে লুকিয়ে পড়লো।
জীবটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পূর্বে সে যেখানে শুয়েছিল সেখানে কেউ নেই দেখতে পেয়ে জীবটা ভয়ংকর গর্জন করে আশেপাশের গাছ থেকে ডালপালা ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে ফেলতে লাগলো। একটা পা দিয়ে বারবার লাফিয়ে সেই জায়গাটাকে তোলপাড় করে দিতে লাগলো।
বনহুর মাটি চেপে ধরে পড়ে রইলো। ভূমিকম্পের মত দুলে দুলে উঠছে গোটা বনটা। সে কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য! বনহুর যেমন আশ্চর্য হচ্ছে তেমন অনুতাপ হচ্ছে তার মনে। এত কাছে পেয়েও এমন একটা জীবকে সে হত্যা করতে পারলো না। বনহুর আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করলো। জীবটা যা কিছু করছে বাঁ হাতে করছে। গাছের মোটা মোটা ডালপালা মড় মড় করে ভেঙে টুকরো টুকরো করছে সে ঐ এক হাতেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলো বনহুর, জীবটার দক্ষিণ হাতের কনুইয়ের নিচে খানিকটা রক্ত জমাট বেঁধে আছে। এবার সে বুঝতে পারলো রাতে তার রিভলভারের গুলী ব্যর্থ হয় নি। জীবটার একটা হাত নষ্ট করে দিয়েছে।
হঠাৎ বনহুর শিউরে উঠলো, যে পাথরটার নিচে সে লুকিয়ে আছে সেই পাথরটা তুলে নেবার চেষ্টা করছে জীবটা। হয়তো ভাবছে, এটা আবার এখানে পড়ে থাকবে কেন, অন্যান্য ডালপালার সঙ্গে ওটাকেও সে দূরে নিক্ষেপ করে মনের রাগ মেটাবে।
এখন উপায়? বনহুরের মুখের সামনে কয়েকটা মোটা মোটা আংগুল নেমে এলো। বলিষ্ঠভাবে এঁটে ধরে পাথরটাকে টেনে তুলতে চেষ্টা করছে জীবট!
দক্ষিণ হাতখানা ভাল থাকলে হয়তো এতক্ষণে পাথরটাকে সে অনায়াসে টেনে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিত দূরে। সঙ্গে সঙ্গে তার হারানো বস্তুটাও মিলে যেত। মৃত্যু হতো এই মুহূর্তে বনহুরের এটা সুনিশ্চয়। কিন্তু জীবটার দক্ষিণ হাতখানা অকেজো হয়ে পড়ায় বনহুর এ যাত্রা রক্ষা পেল। ভাগ্যিস সে জীবটার দক্ষিণ হাতখানা নষ্ট করে দিতে পেরেছিল তাই প্রাণে বেঁচে গেল।
জীবটা কিছুক্ষণ পাথরখানা তুলে ফেলার চেষ্টা করে অসমর্থ হওয়ায় আশেপাশের গাছপালা ভেঙে তচনচ করে হুম হুম শব্দ করতে করতে অন্যদিকে চলে গেল। যাবার সময় বনহুরের মৃত অনুচরটির খণ্ড-বিখণ্ড দেহটার উপর পা দিয়ে কয়েকবার লাথি দিল। সে কী ভয়ঙ্কর শব্দ-থপ থপ! সঙ্গে সঙ্গে মাটি কেঁপে উঠতে লাগলো।
জীবটা সোজা যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে চলে গেল।
