সঙ্গে সঙ্গে কায়েস বলে উঠলো–আপনি এ সময় বাইরে বের হবেন না। বের হবেন না, যান ভেতরে যান
ও কোথায়?
সর্দার বজরার ছাদে!
আমিও যাব সেখানে।
না, আদেশ নেই।
আমি যাব।
না না, কিছুতেই এ সময়—
কায়েসের কথা শেষ হয় না, একটা ভয়ঙ্কর গর্জন নদীবক্ষ প্রকম্পিত করে তোলে–হুম হুম!
সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠলো বজরার ছাদে দস্যু বনহুরের হাতের রিভলভার, পরক্ষণেই তার গলার আওয়াজ শুনতে পেল মনিরা–তোমরা গুলী ছোড়, সবাই গুলী ছোড়ো….
একসঙ্গে গর্জে উঠলো কয়েকটা রাইফেল আর রিভলভার।
একজন অনুচরের কণ্ঠ শোনা গেল সর্দার, জীবটাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
বনহুরের কণ্ঠ–তোমরা নিজ নিজ রাইফেল প্রস্তুত করে দাঁড়াও। এখনই ভেসে উঠবে।
পুনরায় আর একজন অনুচরের কণ্ঠস্বর-ঐ যে, ঐ যে সর্দার–একেবারে আমাদের বজরার নিকটে এসে পড়েছে সর্দার–সর্দার
গুলী চালাও, গুলী চালাও-বনহুরের কণ্ঠস্বর এবং সঙ্গে সঙ্গে তার রিভলভারের গর্জন।
পর পর গুলীর আওয়াজে নদীবক্ষ প্রকম্পিত হতে লাগলো।
সবাই গুলী ছুড়ছে, কিন্তু জীবটা গেল কোথায়! আবার নদীবক্ষে অদৃশ্য হয়েছে।
বজরার মাঝিগণ সবাই দাঁড় ছেড়ে যে যেদিকে পারছে আত্মগোপন করেছে। বজরাখানা অথৈ নদীবক্ষে শুধু দুলছে, আর দুলছে।
হঠাৎ বজরার পেছন থেকে ভেসে এলো একটা করুণ আর্তনাদ-সর্দার বাঁচান….পরমুহূর্তেই ঝপাৎ করে একটা শব্দ।
জীবটা একজন মাঝি কিংবা বনহুরের অনুচরকে টেনে নিয়েছে।
রাতের জমাট অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নদীবক্ষ থেকেও পুনরায় ভেসে এলো করুণ আর্তকণ্ঠ-বাঁচান, বাঁচান, বাঁচায়া-য়া-য়া-ন।
অন্ধকারেও বনহুরের চোখ দুটো জ্বলে উঠলো ক্রুদ্ধ সিংহের মত। তারই চোখের সামনে তারই একটা অনুচর এভাবে প্রাণ হারাবে। মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেল সব, রিভলভার হাতে নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লো সে নদীতে।
সঙ্গে সঙ্গে তার অনুচরগণ আর্তনাদ করে উঠলো–একি করলেন সর্দার! একি করলেন—
কায়েস চিৎকার করে উঠলো–সর্দার, সর্দার—
নির্জন নদীর বক্ষে প্রতিধ্বনি জাগলো–সর্দার, সর্দার–
মনিরা এক ধাক্কায় কায়েসকে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো বজরার বাইরে, সেও আর্তনাদ করে উঠলো-কি হলো? কি হলো-বল তোমাদের সর্দার কোথায়? বল বল?
একজন বলে উঠলো-আমাদের একজনকে ঐ জীবটা ধরে নিয়ে গেছে, তাই সর্দার নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন ওকে বাঁচাতে।
সর্বনাশ! মনিরা এবার তাকালো নদীর জলরাশির দিকে, পরমুহূর্তে সেও ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল নদীতে।
অমনি কায়েস এবং আরো কয়েকজন মনিরাকে ধরে ফেলল মনিরা পাগলিনীর মত চিৎকার করতে লাগলো–ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও আমাকে ছেড়ে দাও। আমিও যাব ওর কাছে। ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও–
কিন্তু মনিরা সামান্য দুর্বল একটা নারী। ওরা দস্যু..বলিষ্ঠ পুরুষের দল, ওদের সঙ্গে সে কি পারে! কিছুতেই সে ওদের বলিষ্ঠ হাতের মুঠা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তার প্রিয় স্বামীর নিকটে পৌঁছতে সক্ষম হলো না।
ওরা তাকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বজরার কক্ষে রেখে আসল।
বনহুর নদীবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত সাঁতার কেটে এগুলো যেদিক থেকে একটু পূর্বে করুন আর্তনাদটা ভেসে এসেছিল। প্রাণপণ চেষ্টায় এগুতে লাগলো সে। রাতের অন্ধকার না হলে সে দেখে নিত কত বড় ভয়ঙ্কর জীব ওটা। কিন্তু বনহুর কিছুই দেখতে পারে না-শুধু শুনতে পাচ্ছে তার অনুচরের আর্তচিৎকার–সর্দার একি করলেন! একি করলেন! মনিরার করুন কণ্ঠস্বর তার কানে ভেসে আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই জলোচ্ছ্বাসের শব্দে সব তলিয়ে যায়!
বনহুর রিভলভার উঁচু করে নিয়ে সঁতরে এগুচ্ছে। সামান্য এগিয়েছে, অমনি একটা লোমশ বাহু তার গলা টিপে ধরলো, কি-কি ভয়ঙ্কর আর কঠিন বাহু দুটো জীবটার। সাঁড়াসির মত টিপে ধরলো বনহুরের গলাটা।
বনহুর মরিয়া হয়ে রিভলভারটা পানির মধ্যেই চেপে ধরলো লোমশ বাহুখানার ওপর, কিন্তু এত জোরে তার গলায় চাপ পড়ছে যে, তার হাতখানা শিথিল হয়ে এলো। তবু অতি কষ্টে রিভলবারখানা ধরে রাখার চেষ্টা করতে লাগলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ওর। বাঁ হাতে সে ঐ লোমশ হাতখানা টেনে ছাড়িয়ে ফেলতে গেল, কিন্তু এতটুকু নড়াতে পারলো না।
বনহুরের মত বলিষ্ঠ পুরুষও অল্পক্ষণের মধ্যে কাহিল হয়ে পড়লো, শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাবার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠলো। অতি কষ্টে রিভলভারখানা উঁচু করে পানির মধ্যে। লোমশভরা একটা বুক লক্ষ্য করে রিভলভারের ট্রিগার টিপল।
পানির মধ্যে তেমন কোন আওয়াজ না হলেও রিভলভার থেকে গুলী বেরুলো এটা বুঝতে। পারলো বনহুর। কিন্তু কি আশ্চর্য, জীবটা এতটুকু নড়লো না, তার হাতখানা আরও মজবুত হয়ে বসে যাচ্ছে বনহুরের গলায়।
বনহুরের চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো।
দস্যু বনহুরের জ্ঞান ফিরে এলো। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো সে। স্মরণ করতে চেষ্টা করলো এখন সে কোথায়। একি, তার তো মৃত্যু ঘটেছে! সেই যে নদীবক্ষে ভীষণ জীবটার হাতের মুঠায় তার কণ্ঠ নিষ্পেষিত হয়েছে। সে বেঁচে রইলো কিভাবে? চারদিকে ভাল করে তাকালো বনহুর, না সে তো মরেনি। এ যে একটা গহন বন। হঠাৎ ওর দৃষ্টি চলে গেল সামনে, চমকে উঠলো বনহুর। তার অদূরে খণ্ডবিখণ্ড একটা দেহ পড়ে আছে। একটা মানুষের দেহ। বনহুর তাড়াতাড়ি উঠতে গেল, লোকটাকে দেখবে, কিন্তু শরীরে এত ব্যথা সে অনুভব করলো যে, একটুও নড়তে পারলো না। বনহুর নিজের দেহের দিকে তাকালো। দেখলো তার শরীরের অনেক জায়গা ক্ষতবিক্ষত। গলায় হাত দিতেই ব্যথায় টন টন করে উঠলো, ফুলে মোটা হয়ে গেছে গলাটা। ঢোক গিলতে ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে। সে তাহলে মরেনি, এখনও জীবিত আছে। সেই জীবটা তাকে হত্যা করেনি। কিন্তু ঐ লোকটা কে, যার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে খাওয়া হয়েছে! নিশ্চয়ই। তারই সেই হতভাগ্য অনুচরটির দেহ!
