কোথায় আমাকে নিয়ে যাচ্ছ তা তো বললে না?
বললো মনিরাশুনো, ঝিন্দা শহর এক অপূর্ব শহর। এই শহরের এক প্রান্তে আমি তোমার জন্য সুন্দর একটি বাড়ি কিনেছি। আমার ইচ্ছা সেই বাড়িতে তোমাকে রাখবো। এই শহরে তুমি সম্পূর্ণ অপরিচিতা। এখানে তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।
কিন্তু মামীমা….
হ্যাঁ, তাকেও নিয়ে আসতে পারতাম, কিন্তু সেটা ঠিক হবে না। আম্মাকে সরিয়ে নিলে তার সোনার সংসার উচ্ছন্নে যাবে। তাঁর স্বামীর চিহ্ন ঐ চৌধুরীবাড়ির কোন অস্তিত্ব থাকবে না। বৃদ্ধ সরকার সাহেব আছেন, নকীব বিশ্বাসী ভৃত্য। তা ছাড়া অনেক আত্মীয়-স্বজন আছেন। মাঝে মাঝে এ হতভাগা সন্তান গিয়েও তার সন্ধান নেবে, কি চিন্তা বল?
তাঁকে বলে আসাটা উচিত ছিল না?
ছিল, কিন্তু সম্ভব ছিল না। তুমি মনে করো না মনিরা, চৌধুরীবাড়িতে কোন গুপ্তচর নেই।
সেখানেও আছে?
আছে এবং থাকবেও। তোমাকে নিয়ে আসার পর পুলিশ জানতে পেরেছে, তুমি এতোদিন চৌধুরীবাড়িতেই আত্মগোপন করে ছিলে এবং অচিরেই পালিয়েছ। আর তুমি যে দস্যু বনহুরের সঙ্গেই গিয়েছ, এ কথাও পুলিশমহল জানতে পেরেছে।
সেই কারণেই বুঝি…….
হ্যাঁ, সেই কারণেই আমি এই নির্জন পথ বেছে নিয়েছি, তোমাকে নিয়ে অতি সহজে পৌঁছতে সক্ষম হবো, ঝিন্দ শহরের আমার সেই বাড়িতে
কি জানি আমার মনে কেমন যেন আতঙ্ক জাগছে।
কিসের আতঙ্ক মনিরা?
বলতে পারবো না।
ছিঃ, মন খারাপ করো না!
ওগো, তোমার জন্য আমি সব ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু অজানা অচেনা জায়গায় গিয়ে তোমাকে ছাড়া আমি যে এক মুহূর্তও বাচবো না।
মনিরা, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তুমি বিশ্বাস করো..
ঠিক সেই মুহূর্তে বজরার ছাদে কায়েসের রাইফেল গর্জে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে কায়েসের কণ্ঠস্বর–সর্দার, একটা বিরাট আকার জানোয়ার এদিকে সাঁতার কেটে আসছে বলে মনে হচ্ছে!
মনিরা দু’হাতে বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরলো। ভয়বিহ্বল কণ্ঠে বললো–সর্বনাশ! তুমি যে জীবের কথা বললে সেই জীব না তো?
বনহুর মনিরাকে নিবিড় করে টেনে নিয়ে বললো–সেই রকমই মনে হচ্ছে।
তাহলে উপায়?
মনিরা, তুমি এই ছোরাখানা নিয়ে এখানে অপেক্ষা করো, আমি যাই।
না, কিছুতেই আমি তোমায় যেতে দেব না।
পাগলী, জানো না ঐ জীবগুলো কত ভয়ঙ্কর, কত সাংঘাতিক! এই মুহূর্তে আমাদের সবাইকে মরতে হবে, যদি সে এই বজরায় হানা দেয়। তুমি ভয় পেও না মনিরা, আমি আসছি,
বনহুর উদ্যত রিভলবার হাতে বজরার ভেতরে থেকে দ্রুত বেরিয়ে যায়।
মনিরা বজরার কক্ষে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপতে থাকে।
বনহুর বজরার বাইরে বেরিয়ে আসতেই কায়েস হাঁপাতে হাঁপাতে তার পাশে এসে দাঁড়ালো–সর্দার, একটা হাতির মত জানোয়ার নদীর মধ্যে সাঁতার কেটে এদিকে এগিয়ে আসছে। ঐদিকে অন্ধকারে ভাল করে তাকিয়ে দেখুন…দেখুন সর্দার!
কায়েস, তুমি গুলী ছুঁড়ে ভুল করেছ। হয়তো জানোয়ারটা নদী পার হয়ে ওপারে চলে যাচ্ছিল, তুমি তাকে শব্দ করে জানিয়ে দিয়েছ, আমরা মানুষের দল এই পথে যাচ্ছি। এত বুদ্ধিহীন তোমরা।
না সর্দার, আমি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি জানোয়ারটা আমাদের বজরার দিকে এগুচ্ছে।
আমি তো দেখছি, যদিও অন্ধকার তবুও বেশ বুঝা যাচ্ছে, বিরাট দেহ একটা কিছু এদিকে আসছে। কিন্তু কি আশ্চর্য, অতবড় একটা জীব পানিতে সাঁতার কেটে আসছে অথচ কোন শব্দ হচ্ছে না। কায়েস, আমাদের সব অনুচরকে ডাকো।
সবাই উপস্থিত সর্দার। শুধু মাঝিরা বজরার দাঁড় টেনে চলেছে।
তাদের আরও দ্রুত হাত চালাতে নির্দেশ দাও।
আচ্ছা, আমি বলে আসছি। কায়েস ক্ষিপ্র পদক্ষেপে মাঝিদের দিকে চলে যায়।
বনহুর তার চারপাশে দেখতে পায় তার অনুচরগণ উদ্যত রাইফেল বাগিয়ে অপেক্ষা করছে।
বনহুর ব্যস্তকণ্ঠে বলে ওঠে–তোমরা বিচলিত হবে না। সকলে নিজ নিজ অস্ত্র নিয়ে অপেক্ষা কর। ঐ যে কালোমত জিনিসটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, তা অতি ভয়ঙ্কর জীব। যেমন করে হউক তোমরা তাকে হত্যা করতে চেষ্টা করবে। আমাদের বজরার নিকটে পৌঁছলে কিছুতেই। ওর কবল থেকে রক্ষা পাবার উপায় থাকবে না। যাও তোমরা সবাই বজরার চার পাশে রাইফেল নিয়ে অপেক্ষা কর! আমি বজরার উপরে যাচ্ছি।
কায়েস ততক্ষণে বনহুরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
বনহুর কায়েসকে লক্ষ্য করে বলে উঠলো-কায়েস, আমি বজরার উপরে যাচ্ছি, তুমি বজরার দরজায় দাঁড়িয়ে সাবধানে পাহারা দাও, বুঝেছ?
জ্বী হ্যাঁ, বুঝেছি।
বনহুর ততক্ষণে গুলীভরা রিভলভার নিয়ে বজরার ছাদে উঠে গিয়েছে।
মনিরা বজরার ভেতরে বসে আতঙ্কে শিউরে উঠলো। হায় খোদা, একি হলো! এমন একটা বিপদের কথা সে কল্পনাও করতে পারেনি। নিজের জন্য তার চিন্তা নেই, তার ভয় হচ্ছে স্বামীর জন্য। ওকে তুমি বাঁচিয়ে নাও খোদা! ওকে তুমি রক্ষা কর! কিছুক্ষণ পূর্বে দেখা স্বপ্নটার কথা মনে হতেই বুকটা ধক ধক করে উঠলো। কে বা কারা যেন তার কাছ থেকে তার স্বামীকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিছুতেই মনিরা তাকে ধরে রাখতে পারছে না, সে কি ভীষণ চেহারার লোকগুলো! তাদের সকলের হাতে এক একটা সূতীক্ষ ধারাল খর্গ। ওকে নিয়ে গিয়ে বলি দেবে, কালী মন্দিরে বলি দেবে–তার স্বামীকে ঠিক সেই সময় মনিরার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তখন থেকেই একটা ভয় তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, না জানি কি বিপদ তাদের জন্য এগিয়ে আসছে, ঠিক হলোও তাই। মনিরা এভাবে বজরার মধ্যে বসে থাকতে পারছে না, ছুটে বেরিয়ে আসতে গেল!
