বজরার ছাদে উদ্যত রাইফেল হাতে চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল কায়েস, দস্যু বনহুরের ডাকে অনুচ্চকণ্ঠে বলল–সর্দার! সঙ্গে সঙ্গে বজরার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে বনহুরের সামনে। দাঁড়ালো সে।
বনহুর জিজ্ঞেস করল–আমাদের বজরা এখন কোন এলাকায় পৌঁছেছে কায়েস?
আমাদের বজরা এখন সিন্ধি পর্বতের নিকটবর্তী হয়ে চলেছে।
সিন্ধি পর্বত?
হ্যাঁ সর্দার।
খুব ভয়ঙ্কর স্থান এই সিন্ধি পর্বত। এখানে এই পর্বতে এক ধরনের জীব আছে, যারা মানুষের গন্ধে উন্মাদ হয়ে ওঠে। আমাদের অনুচরগণকে খুব সতর্কতার সাথে বজরা চালাবার নির্দেশ দাও।
আচ্ছা সর্দার।
যাও, বজরা সিন্ধি পর্বতের নিকট পৌঁছাবার পূর্বে কথাটা সবাইকে জানিয়ে দাও।
আগেই সবাইকে এ কথা জানানো হয়েছে।
তবু আবার স্মরণ করিয়ে দাও।
কায়েস কুর্ণিশ জানিয়ে চলে যায়।
বনহুর ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মনিরা।
কায়েস চলে যাবার পর মনিরা বনহুরের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ একটা দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল মনিরার। পাশে স্বামীকে না দেখতে পেয়ে উঠে ধীরে ধীরে বজরার বাইরে এসে দেখে বনহুর ও তার একজন অনুচরের মধ্যে কথাবার্তা হচ্ছে।
একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল মনিরা। কায়েস চলে যেতেই স্বামীর পেছনে এসে দাঁড়ায় সে।
বনহুর মনিরাকে লক্ষ্য করে হেসে বললো–ঘুম ভেঙে গেল?
হ্যাঁ, একটা দুঃস্বপ্ন দেখলাম।
ও কিছু না, চলো।
মনিরা ও দস্যু বনহুর বজরার কক্ষে প্রবেশ করে শয্যায় এসে বসলো।
বনহুর শয্যায় গা এলিয়ে দিল।
মনিরা বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কভরা কণ্ঠে বললো–ওর সঙ্গে কি যেন বলছিলে?
কিছু না।
সত্যি করে বল, কি বলছিলে তুমি ওকে? সিন্ধি পর্বতে নাকি ভয়ঙ্কর এক ধরনের জীব আছে, মানুষের গন্ধে নাকি তারা উন্মাদ হয়ে ওঠে?
হ্যাঁ মনিরা, সিন্ধি পর্বত অতি ভয়ঙ্কর স্থান। আমরা যতক্ষণ না এই পর্বত অতিক্রম করতে পেরেছি ততক্ষণ মোটেই নিশ্চিন্ত নই।
আমার কিন্তু বড় ভয় করছে। মনিরা বনহুরের পাশে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো।
বনহুর ওকে টেনে নিল আরও কাছে, হেসে বসলো–এত ভীতু তুমি?
আমার মন যেন কেমন করছে। আচ্ছা, এ পথ ছাড়া আর কি কোন পথ ছিল না, যে পথে আমরা নিরাপদে ঝিল শহরে পৌঁছতে পারি?
মনিরা তুমি একেবারে ছেলে মানুষ! জানো না তোমার স্বামী স্বাভাবিক মানুষ নয়। মানুষকুলে জন্ম হলেও লোকসমাজে তার কোন স্থান নেই। পুলিশমহল এত সতর্ক, এত চালাক হয়ে পড়েছে যে, দস্যু বনহুরকে তারা আজ অতি সহজেই খুঁজে নিতে পারে, বিশেষ করে মিঃ জাফরী নিজে এবার লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। যে কোন ব্যক্তি দস্যু বনহুরকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় তার কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে, সেই তৎক্ষণাৎ ঐ লাখ টাকা পেয়ে যাবে। মনিরা, এতবড় সুযোগ কোন্ হতভাগা হেলায় নষ্ট করবে? তাই প্রতিটি রাস্তায়, দোকানের আশেপাশে, হোটেলে, ক্লাবে, সিনেমা হলে, মাঠে-ঘাটে এমন কি গ্রামে গ্রামে সি, আই, ডি পুলিশ সর্বদা সতর্ক পাহারা দিয়ে চলেছে। তাদের প্রত্যেকের নিকট রয়েছে তোমার স্বামীর একটি ছবি আর গুলীভরা রিভলভার।
সত্যি! এ তুমি কি বলছ?
শিউরে উঠলে কেন মনিরা? এতটুকুতেই ভীত হলে তোমার চলবে না, তুমি যে দস্য পত্নী!
মনিরা বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। একটা দুশ্চিন্তার কালোছায়া তার সমস্ত মুখ ছেয়ে ফেললো। শুষ্ককণ্ঠে বললো–তুমি তাদের কোন অন্যায় করোনি?
আপনজনের কাছে কোনদিন অপরাধ ধরা পড়ে না। ওরা কোন ভুল করেনি মনিরা, সত্যিই আমি দোষী, অপরাধী। নইলে আজ লোকসমাজে কেন আমার স্থান নেই, কেন আমি সবার সামনে প্রকাশ্যে গিয়ে দাঁড়াতে পারি না। কেন আজ সকলের কাছে আত্নগোপন করে, এমন কি নিজের মায়ের কাছে না জানিয়ে তোমাকে চুরি করে নিয়ে আসতে হয়েছে?
কোথায় আমাকে নিয়ে যাচ্ছ তা তো কখনও আমাকে বললে না?
বলবো সব বলবো, তোমাকে। শুন মনিরা, এখনও তুমি অনেক কথা জানো না। সেদিন। তোমাকে তোমার চাচার বাড়ি থেকে চুরি করে পালিয়ে নিয়ে আসার পর তোমার চাচা পুলিশে ডায়েরী করে দেন এবং তোমাকে যে আমি, মানে দস্যু বনহুর চুরি করে নিয়ে গেছি, এ কথা তিনি জানাতে ভুলেন না, এবং সেই কারণেই তোমাদের বাড়ি তল্লাশি চলে। তুমি সেদিন ঝি এর ছদ্মবেশে আত্মগোপন করে না থাকলে ঐ দিন তোমাকে তোমার চাচা জোরপূর্বক নিয়ে যেত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাছাড়া শহীদের সঙ্গে পুনরায় তোমার বিয়েও দিত, এটা… …
চুপ করো! ও কথা বলতে তোমার বাধছে না?
হেসে বলল বনহুর–যা সত্য ঘটতো তা বলতে আপত্তি কি মনিরা?
কিছুতেই তা ঘটতো না। মনিরা শুধু নারী নয়, সে দস্যু সম্রাটের পত্নী প্রাণাধিকা স্ত্রী, দস্যুসম্রাট কি এত সহজেই তার স্ত্রীকে? ….
মনিরা তুমি যা বলছ তা সত্য। দস্যু বনহুরের স্ত্রীর শরীরে হাত দেয় পৃথিবীতে এমন কেউ নেই! ঠাট্টা করলাম মনিরা। না, ওসব ঠাট্টা আমার মনকে অস্থির করে দেয়।
হ্যাঁ শুনো, তারপর যখন তোমাকে তোমার বড় চাচা এবং পুলিশ চৌধুরীবাড়িতে খুঁজে পেল, তখন অবিরাম সন্ধান চললো, কোথায় গেছে বা আছো তুমি। প্রথমে তো তোমার বড় চাচা ভেবেছিলেন তুমি কোন পুকুরে বা ডোবায় আত্মহত্যা করেছ; তারপর অনুসন্ধান চালিয়ে যখন কোন পুকুরে বা ডোবায় তোমার লাশ তারা খুঁজে পেল না, তখন ঠিক ধরে নিল দস্যু বনহুরেরই এই কাজ। পুলিশমহলও তোমার বড় চাচার সন্দেহে একমত হলো, তোমাকে যদি গত দুদিন পূর্বে এভাবে সরিয়ে না আনতাম, তাহলে বুঝতে পারছ, হয়তো দস্যুসম্রাটও তার প্রিয়তমাকে–এ কথা শেষ না করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো দস্যু বনহুর।
