উঁ হুঁ।
তবে কি?
শুধু তুমি আর আমি। বাস্তব– মনিরা জানেনা, আজ আমি কেমন করে এসেছি?
কেমন করে?
হাওয়ায় ভেসে।
মনির!
বল?
জানো, আজ কত খুশি হয়েছি।
মনিরা ওকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেয় বনহুর।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় আঘাত হয়– ঠক্ ঠক্ ঠক্–
সঙ্গে সঙ্গে সরকার সাহেবের ভীত কণ্ঠস্বর– পুলিশ–পুলিশ—
বনহুর আর মনিরা তাকায় উভয়ের মুখের দিকে।
দরজায় তখনও আঘাতের পর আঘাত চলেছে।
১.০৮ সাগরতলে দস্যু বনহুর
ভারতী নদীর বুক চিরে গভীর অন্ধকার ভেদ করে নীরবে এগিয়ে চলেছে একখানা বজরা। বজরাখানা অন্য কারও নয়, দস্যু বনহুরের। বজরার কক্ষে দস্যু বনহুরের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ মনিরা, হৃদয়ে তার অফুরন্ত আনন্দোচ্ছাস। নিজেকে সে নিঃশেষ করে বিলিয়ে দিয়েছে স্বামীর বুকে।
মনিরার মত সুখী কে!
যে দস্যু বনহুরের ভয়ে দেশবাসীর মনে আতঙ্কের সীমা নেই, পুলিশমহল যার জন্য সদাসর্বদা উদ্বিগ্ন, যে দস্যু বনহুরের দয়ায় শত শত দীন– দুঃখী কৃতজ্ঞ, সেই দস্যু বনহুর তার স্বামী!
মনিরা হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে স্বামীর ভালবাসা উপলব্ধি করে চলেছে। নিজেকে সে ধন্য মনে করছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মন ব্যথায় গুমড়ে উঠলো, দু’চোখ ভরে উঠল অশ্রুতে, কতক্ষণ সে এ আনন্দ উপভোগ করতে পারবে! স্বামীকে সে কতক্ষণের জন্য কাছে পাবে..
বনহুর মনিরার মুখখানা দক্ষিণ হাতের আংগুল দিয়ে উঁচু করে ধরে-একি মনিরা, তোমার চোখে পানি!
মনিরার ঠোঁট দু’খানা একটু কেঁপে ওঠে, বলতে পারে না কিছু।
বনহুর আরও নিবিড় করে মনিরাকে টেনে নেয় বুকে, বলে– কি হলো মনিরা? হঠাৎ একি পরিবর্তন–
না না, তুমি আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা কর না।
জানি তুমি দুঃখ পাচ্ছো। মনিরা, দস্যুকে বিয়ে করে কোন নারী সুখী হতে পারে না, এ কথা আমি জানতাম–
মনিরা দক্ষিণ হাতখানা দিয়ে বনহুরের মুখ চেপে ধরে– ছিঃ তুমি আমাকে ভুল বুঝ না। আজ আমার মত সুখী কে? তুমি শুধু দস্যু নও–তুমি দস্যুসম্রাট। তোমার স্ত্রী হওয়া যে কত সৌভাগ্যের কথা সে তুমি বুঝবে না।
তবে তোমার চোখে অশ্রু কেন?
এ আমার আনন্দের অশ্রু। তোমাকে পাওয়া কত আনন্দের কথা! সত্যি, আজ আমার নারী। জন্ম সার্থক হয়েছে।
মনিরা!
হ্যাঁ, কিন্তু জানি না এত সুখ আমার সইবে কিনা। তোমার বুকে মাথা রেখে শেষ পর্যন্ত জীবনের দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারব কিনা কে জানে!
মনিরা, এই আনন্দময় মুহূর্তগুলো তুমি মিছামিছি দুশ্চিন্তায় ম্লান করে দিচ্ছে। ছিঃ, মুছে ফেলো তোমার চোখের পানি। তুমি তো জানো–আমি সবকিছু সইতে পারি, কিন্তু তোমার চোখে অশ্রু সইতে পারি না। ধীরে ধীরে বনহুর ভাবাপন্ন হয়ে যায়, বলে–মনিরা, জন্মাবার পর থেকে আমার জীবনে চলেছে সংঘাতের পর সংঘাত। নির্মম ব্যথা আর দুঃখই আমার জীবনের সাথী। যখন যেদিকে তাকিয়েছি শুধু অশ্রু আর অশ্রু। অস্রোতে আমার জীবনের সব আনন্দ, সব অনুভূতি কোথায় যে ভেসে গেছে, তাই আমি তোমার চোখে অশ্রু দেখলে মুষড়ে পড়ি।
না না, আর আমি কাঁদব না,। এই যে আমি চোখের পানি মুছে ফেললাম।
মনিরা!
বল?
সত্যি তুমি সুখী হয়েছ?
অনেক অনেক সুখী হয়েছি। আর তুমি? মনিরা আগ্রহভরা চোখে তাকালো দস্যু বনহুরের মুখের দিকে।
আমি সুখী হতে পারিনি মনিরা!
উঃ এ কথা তুমি আগে বলনি কেন? মনিরা স্বামীর বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেবার চেষ্টা করলো।
কিন্তু বনহুরের বলিষ্ঠ বাহুকে এতটুকু শিথিল করতে সক্ষম হলো না মনিরা, পুনরায় তার চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে উঠলো। অভিমানে রাঙা হয়ে উঠলো তার রক্তিম গণ্ডদ্বয়, বললো– জানতাম তোমাকে কোনদিন তুচ্ছ প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারবো না। নগণ্য নারীর ভালবাসা কিছুতেই তোমার মনে দাগ কাটতে সক্ষম হবে না।
মনিরা, তুমি যা ভাবছো, তা সম্পূর্ণ ভুল। ফুলের মত পবিত্র একটা জীবনকে আমি নষ্ট করে দিলাম এটাই আমার জীবনের চরম অনুতাপ। আমি পাপী, আমি নিষ্ঠুর, নরহত্যাকারী–মনিরা, তোমার মত একটা মেয়েকে আমি এভাবে এত আপন করে পাবো, এ যে আমার স্বপ্নের অতীত। তোমাকে আমি সুখী করতে পারবো না মনিরা, তাই আমার মনে এত ব্যথা–মনে ব্যথা রেখে কেউ কোনদিন সুখী হতে পারে না। মনিরা, তুমি আমাকে ভুল বুঝ না।
মনিরা বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে ওঠে-দুনিয়ায় যদি সত্য কিছু থাকে, সে তুমি। তোমাকে আমি কোনদিন ভুল বুঝতে পারি না।
হ্যাঁ মনিরা, কোনদিন তুমি আমাকে ভুল বুঝ না।
না, ওগো না…দু’বাহু দিয়ে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে মনিরা।
বনহুরের চিবুকটা ধীরে ধীরে নেমে আসে মনিরার মাথার উপর। গভীর আবেগে আরও নিবিড় করে কাছে টেনে নেয় ওকে।
.
ঘুমন্ত মনিরার হাতের মুঠা থেকে নিজের হাতখানা ধীরে ধীরে মুক্ত করে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো দস্যু বনহুর। কক্ষের লণ্ঠনের আলোতে একবার তাকালো ওর মুখের দিকে। তারপর। কক্ষের বাইরে এসে দাঁড়াল। জমাট অন্ধকারে চারদিক আচ্ছন্ন। আকাশে অসংখ্য তারা টিপ টিপ করে জ্বলছে। নিচে সীমাহীন জলরাশি ভারতী নদীর বুকে জোয়ার এসেছে। উচ্ছল জলতরঙ্গের ছল ছল কলকল শব্দ, আর সেই সঙ্গে মাঝিদের দাঁড়ের ঝুপঝাঁপ আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শুনা যাচ্ছে না।
বনহুর তার কালো প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করল। তারপর ডাকলো– কায়েস!
