সে কথা মিথ্যা নয় নাসরিন, নূরীকে সত্যি আমার ভাল লাগে।
উঃ!
কি হলো নাসরিন?
কিছু না। যাই দেখি জরিনা কোথায় গেল।
নাসরিন চলে যায়।
রহমান মৃদু হাসে, সে জানে নাসরিন তাকে মনে মনে ভালবাসে, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনদিন সে জানায় নি তার মনের গোপন কথা।
বনহুরের সামনে এসে দাঁড়ায় নূরী, কোন কথা বলতে পারে না সে।
বনহুর কোমরের বেল্ট থেকে রিভলভারখানা টেবিলে রেখে শয্যায় গিয়ে বসে, তারপর নূরীকে লক্ষ্য করে বলে– কেমন আছো?
নূরী শান্তকণ্ঠে বলে– ভাল।
বস নূরী, একটা নতুন গল্প আছে?
কাউকে গুলীবিদ্ধ করেছো, না গলাটিপে হত্যা করেছ?
দস্যু বলে আমি শুধু হত্যা করি, তাই না?
নাহলে কাউকে মোটা টাকা বখশিস দিয়েছ, কিংবা ধন রত্ন-অলঙ্কার।
ওসব নয় নূরী।
তবে কি?
বস, বলছি।
নূরী বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে যায় বনহুরের হাতে, চমকে ওঠে নূরী-ইস, হাতে কি হয়েছে তোমার? নূরী বনহুরের হাতখানা তুলে নেয় তার হাতে। এ যে কামড়ানোর দাগ! কে তোমায় কামড় দিয়েছে হুর?
নূরী, সে এক ভীষণ কাণ্ড… কোনটা শুনবে, যা বলতে চাইছিলাম সেটা না আমার হাতের এ দাগটা….. বলো?
দুটোই তোমাকে বলতে হবে।
উঁহু, যা শুনবে একটা।
আমি কোনটাই শুনতে চাই না।
বেশ, আমিও বলবো না।
হুর, এখনও তোমার ছেলেমানুষি গেল না। আমার কাছে কথা লুকিয়ে তোমার কি লাভ হয় বলতো?
তবে শুনো, এবার মধুমতী চরে বন্যাপীড়িতদের সাহায্য দিতে গিয়ে সে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরী কেমন করে জানতে পেরেছিলেন, মধুমতী চরে বন্যাপীড়িতদের মধ্যে পাওয়া যাবে দস্যু বনহুরকে, তাই গোপনে চলেছিলেন তাকে হয় বন্দী, নয় হত্যা করে পুলিশমহলে সুনাম ছড়াতে–ঘটনাটা বিস্তারিত বলে যায় বনহুর নূরীর কাছে। তার হাতের ক্ষতের কথাটা নূরী যাতে ভুলে যায় এই হলো বনহুরের ঘটনাটা ইনিয়ে বিনিয়ে বলার উদ্দেশ্য।
নূরী অবাক হয়ে সব শুনলো, তারপর বললো– এমন একজন শত্রুকে হাতের মুঠায় পেয়ে। তুমি ছেড়ে দিলে হুর! সে যদি তোমাকে অমন অবস্থায় পেতো তাহলে কি করতো জানো?
হত্যা কিংবা গ্রেফতার।
আর তুমি তাকে জামাই আদরে ডাঙ্গায় পৌঁছে দিলে।
দস্যু হলেও বনহুর মানুষ! সে কোন অসহায়ের প্রতি আঘাত করে না– ঘোর শত্রু হলেও না।
শুধু তুমি আঘাত করো একজনকে! যাকে আঘাত করেও দুঃখ পাও না।
কে সে আমার পরম বন্ধু যাকে আমি আঘাত করে আনন্দ পাই?
সত্যি সে তোমার পরম বন্ধু?
তার চেয়েও বেশি যাকে আমি আঘাত করে আনন্দ পাই।
হুর!
বল?
বল হুর, কেমন করে তোমার হাতে ঐ ক্ষত হলো?
নূরী এত কথার মধ্যেও তার হাতের ক্ষতটার কথা ভুলে যায় নি, বনহুর মনে মনে চমকে উঠলো। হেসে বললো সে– তোমার স্মরণশক্তি দেখছি ভয়ানক।
তুমি মনে করেছিলে আমি বুঝি ভুলে গেছি?
ঠিক তা নয়, কারণ কেমন করে আমার হাতে ক্ষত হলো সেই কথাই আমি ভুলে বসে আছি। দাঁড়াও স্মরণ করে দেখি কি করে এ ক্ষতটা হলো।
মানে কে তোমার হাত কামড়ে দিয়েছিল?
ওঃ হ্যাঁ, কামড়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে-ঐ যে শহরে একটা বাড়ির কুকুর কামড়ে দিয়েছে হঠাৎ…
এটা কুকুরের কামড়ের দাগ? না না, কিছুতেই নয়।
তবে কিসের?
মানুষের দাঁতের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি।
হুঁ-তাহলে তুমি ঠিক ধরেছ নূরী, স্বপ্নঘোরে নিজের হাত নিজেই কামড়ে দিয়েছি।
ঠাট্টা রাখ বলছি।
বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?
না, সত্যি কথা বল?
মিথ্যা না বলে যে উপায় নেই নূরী।
আর সত্য বললে?
তুমি আবার কামড়ে দেবে।
সব সময় এমন হেঁয়ালিভরা কথা আমার…..
ভাল লাগে না, এই তো?
হ্যাঁ।
একটা মেয়ে আমার হাতে কামড়ে দিয়েছিল।
মিথ্যা কথা!
জানি তুমি বিশ্বাস করবে না।
থাক আমি শুনতে চাই না। চলো হাত-মুখ ধুয়ে খাবে চলো।
সেই ভাল। চলো।
বনহুর আর নূরী কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় নূরীর। শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়। অতি ধীরে লঘু পদক্ষেপে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে, এগিয়ে যায় বনহুরের কক্ষের দিকে। অতি সন্তর্পণে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় নূরী। দেখতে পায়– বিছানা শূন্য, বনহুর বিছানায় নেই। নূরী তাকায় কক্ষের চারদিকে, ওপাশে দেয়ালে বনহুরের পোশাকগুলো ঠিক জায়গায় ঝুলছে।
তবে সে গেল কোথায়? টেবিলে তার রিভলভার যেমন ছিল তেমনি পড়ে আছে।
নূরীর দু’চোখ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়তে লাগলো। বনহুরের শূন্য কক্ষে দাঁড়িয়ে তার শূন্য হৃদয় খাঁ খাঁ করে উঠলো। টেবিল থেকে বনহুরের রিভলভারখানা তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরলো নূরী।
.
অতি সন্তর্পণে জানালা খুলে কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর। কক্ষের নীলাভ আলোতে তাকিয়ে দেখলো দুগ্ধফেনিল বিছানায় ঘুমিয়ে আছে মনিরা। এক থোকা যুঁই ফুলের মত ছড়িয়ে আছে তার দেহখানা। একরাশ ঘন কালো চুল এলোমেলো হয়ে লুটিয়ে পড়েছে তার বুকের উপর।
বনহুর ধীরে ধীরে মনিরার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো। নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে রইলো মনিরার ঘুমন্ত মুখের দিকে।
কক্ষের নীলাভ আলোয় মনিরার মুখখানা অপূর্ব সুন্দর লাগছিল। দস্যু বনহুর নিজকে সংযত রাখতে পারে না, বসে পড়ে মনিরার বিছানায়। ধীরে ধীরে ঝুঁকে আসে বনহুরের মুখখানা মনিরার মুখের ওপর।
একটা উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে যার মনিরার। চোখ মেলে তাকায়, সঙ্গে সঙ্গে ঘুমজড়িত চোখ দুটো উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে ওঠে। ভাল করে চোখ রগড়ে তাকায় সে– আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মনিরার মন, দু’হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরে বনহুরের গলা, বলে– একি স্বপ্ন– না সত্য?
