ব্যাপারটা পুলিশ সুপার মিঃ আহমদের কানে পৌঁছল। গোটা পুলিশ বিভাগ শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। মিঃ জাফরীর মত একজন বিশিষ্ট পুলিশ কর্মচারীর অন্তর্ধানে একটা গভীর বেদনার ছায়া ঘনিয়ে এলো পুলিশমহলে।
মিঃ শঙ্কর রাও যখন জানতে পারলেন মিঃ জাফরীকে খুঁজে পাওয়া যায় নি, এমনকি তাঁর। লাশও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তিনি অত্যন্ত শোকাভিভূত হয়ে পড়লেন।
মাঝিরা জাল দিয়ে নদীতে অনুসন্ধান করলো, কিন্তু কোথাও তারা খুঁজে পেল না মিঃ জাফরীর লাশ।
এখানে যখন মিঃ জাফরীর মৃত্যুশোকে সকলে মুহ্যমান তখন দস্যু বনহুরের সঙ্গে বসে ডিনার খাচ্ছেন মিঃ জাফরী।
খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালো দস্যু বনহুর, মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললো– চলুন ইন্সপেক্টার, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
লঞ্চ থেকে নেমে একটা বোটে চেপে বসলো বনহুর এবং মিঃ জাফরী। ইতিমধ্যে সেই মাঝিটাকেও মোটরবোটে তুলে নেয়া হয়েছে।
জায়গাটা যে কোথায় বুঝা গেল না। লঞ্চ ছেড়ে মোটর-বোট তীর বেগে এগিয়ে চলল। মিঃ জাফরী অবাক হয়ে দস্যু বনহুরকে দেখছেন।
দস্যু বনহুর স্বয়ং মোটর-বোটখানা চালিয়ে চলেছে। হেসে বলল বনহুর রিভলভার থাকলে হয়তো এতক্ষণ একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতেন, তাই না ইন্সপেক্টার?
মিঃ জাফরী কোন কথা বললেন না।
বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একটা নৌকা দেখতে পেলেন মিঃ জাফরী। নৌকাখানা নিয়ে একজন মাঝি মাঝনদীতে অপেক্ষা করছে। মনে হচ্ছে এদের জন্যই প্রতীক্ষা করছে সে।
বনহুর নৌকাখানার অদূরে এসে বোটখানা থামিয়ে ফেললো, তারপর নৌকার মাঝিকে ইংগিতে নিকটে আসতে বললো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই মোটর-বোটের ধারে এসে নৌকাখানা ভিড়লো।
বনহুর এবার মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললো– এখান থেকে ঘাট বেশি দূরে নয়। মাঝিই আপনাকে নিয়ে যাবে।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ জাফরীর সঙ্গী সেই মাঝি মোটর-বোট থেকে নৌকাখানায় চেপে বসলেন। যে মাঝি এতক্ষণ নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিল সে উঠে এলো মোটর-বোটে।
মিঃ জাফরী নৌকায় চেপে বসলেন। মাঝি বৈঠা হাতে তুলে নিল।
দস্যু বনহুর হাত নেড়ে তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানালো।
ক্রমে নৌকাখানা সরে যাচ্ছে।
মোটর বোটখানাও দূর হতে দূরে সরে যাচ্ছে।
মিঃ জাফরী তখনও তাকিয়ে আছেন দস্যু বনহুরের মোটর-বোটখানার দিকে।
ঘাটে পৌঁছতে বেশি সময় লাগলো না তাদের।
কিন্তু যেখানে তখন তারা পৌঁছলেন সেটা তাদের পরিচিত কোন জায়গা নয়। সেখান থেকে ফিরে এলেন শহরে। পুরো একটা দিন কেটে গেল তাদের ট্রেনে।
মিঃ জাফরীকে ফিরে পেয়ে পুলিশমহলে আনন্দের বান বয়ে চলল। সবাই তাঁকে নিয়ে খুশিতে মেতে উঠলেন। নদীতে ডুবেও সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছেন মিঃ জাফরী, এ কম সৌভাগ্যের কথা নয়! কম আশ্চর্যের কথা নয়! কেমন করে তিনি প্রচণ্ড ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেলেন, এ নিয়ে সকলের মধ্যে একটা প্রশ্নের জাল ছড়িয়ে পড়লো। আসল জবাব কেউ খুঁজে পেলেন না।
মিঃ জাফরী ঘটনাটা কাউকেই খুলে বললেন না। মাঝিটা অবশ্য জানে। কিন্তু কে যে লঞ্চের মালিক, কে তাদের মোটরবোটে করে নৌকায় পৌঁছে দিল, তার আসল পরিচয় সে জানে না। জানার কোন প্রয়োজনও তার ছিল না।
কাজেই মিঃ জাফরীকে কে রক্ষা করেছে, এ কথা সকলের কাছেই গোপন রয়ে গেল।
মিঃ আহমদ নিজে এসে মিঃ জাফরীর সঙ্গে দেখা করে তাকে অভিনন্দন জানালেন।
.
নূরীর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে নাসরিন-সব সময় তুই কেঁদে কেঁদে সারা হলি নূরী। যে তোকে চায় না, কেন তুই তার জন্য এত করিস!
নাসরিন, তুই কি বুঝবি! আমার হৃদয়ের ব্যথা তুই কি বুঝবি!
জানি তুই ওকে নিজের জীবনের চেয়েও ভালবাসি। কিন্তু নূরী, প্রতিদানে সে তোকে কি দিয়েছে? দিয়েছে তোকে ব্যথা আর বেদনা। তার চেয়ে তুই অন্য কাউকে বিয়ে করে নে নূরী।
নূরী বাল্যসখী নাসরিনের কথায় চমকে ওঠে। তাড়াতাড়ি ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে–আর কোনদিন অমন কথা বলিসনে নাসরিন। বিয়ে কোনদিন দু’বার হয় না।
নূরী, এই কথা বলে বলেই জীবন কাটিয়ে দিবি?
হ্যাঁ নাসরিন, তাছাড়া আর যে কোন পথ নেই আমার। হুরই যে আমার ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন….
কি জানি নূরী, আমি জীবনে এমন কোনো পুরুষ দেখিনি যে পুরুষ তোর মত একজন মেয়েকে উপেক্ষা করতে পারে। তোর মত সুন্দরী খুব কমই হয়!
আমার চেয়ে আমার হুর অনেক সুন্দর নাসরিন। ওর সঙ্গে কারও তুলনা হয় না।
এমন সময় রহমান এসে দাঁড়ায় নূরী আর নাসরিনের পাশে।
নূরী আনন্দভরা কণ্ঠে বলে ওঠে– হুর এসেছে?
হ্যাঁ, এসেছে।
নাসরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায় নূরী। আর একবার তাকায় রহমানের মুখে, তারপর ছুটে চলে যায় সেখান থেকে।
রহমান নূরীর গন্তব্যপথের দিকে তাকিয়ে হাসে। নাসরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রহমানকে লক্ষ্য করে বলে– সর্দারকে ভালবেসে নূরী মরবে।
রহমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে– তবু সর্দারের নাগাল পাবে না।
সত্যি, পুরুষ জাতটাই বড় নিষ্ঠুর।
রহমান নাসরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো– সব পুরুষই সমান নয় নাসরিন। তুমি তো জানো, নূরীর জন্য আমাদেরই দলের কত পুরুষ পাগল। ওর একটু ভালবাসার জন্য কতজন। আকুল হৃদয় নিয়ে অপেক্ষা করে, কিন্তু সর্দারের ভয়ে কেউ ওকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।
অভিমানভরা কণ্ঠে বলে নাসরিন–জানি, তুমিও ওকে ভালবাস রহমান।
