ভোরের আলো তখন ক্যাবিনের মেঝেতে এসে পড়েছে।
মিঃ জাফরী তাকিয়ে রইলেন দরজার দিকে।
ক্যাবিনে প্রবেশ করলো দস্যু বনহুর। শরীরে তার সাধারণ পাজামা পাঞ্জাবী, পায়ে পাম্পসু। স্বাভাবিক সচ্ছ মুখমণ্ডল, উজ্জ্বল দীপ্ত চোখ দুটো। মুখে মৃদু হাসির রেখা। মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললো– গুড মর্নিং ইন্সপেক্টার।
অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন মিঃ জাফরী– গুড মর্নিং।
যাকে দেখার জন্য এতক্ষণ উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করছেন মিঃ জাফরী, এই সেই ব্যক্তি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, কোথায় যেন একে দেখেছেন বলে মনে হয় তার। কণ্ঠস্বর যেন পরিচিত বলে মনে হয়। এতক্ষণ যে একটা বিপুল আগ্রহ নিয়ে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাবার জন্য ব্যাকুলভাবে প্রতীক্ষা করছিলেন, সব যেন কর্পূরের মত কোথায় উড়ে গেল! এ যে তার অতি পরিচিত মুখ। একবার নয় অনেকবার বিভিন্ন রূপে তিনি এ মুখ দেখেছেন। পুলিশ বিভাগের সুদক্ষ কর্মচারী মিঃ জাফরী। তাঁর শ্যেনদৃষ্টির কাছে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। মিঃ জাফরী চিনতে পারলেন দস্যু বনহুরকে।
দস্যু বনহুরের মুখে কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। হেসে বলে–চিনতে পেরেছেন নিশ্চয়ই?
মিঃ জাফরীর মুখ গম্ভীর হয়ে এসেছে। দস্যু বনহুর তাঁর প্রাণরক্ষাকারী যার রক্তে তিনি মধুমতী চর ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সেই দস্যু তাকে বাঁচিয়েছে। মুখ ফিরিয়ে নেন মিঃ জাফরী।
বনহুর পূর্বের ন্যায় স্বচ্ছকণ্ঠে বলে জানি আপনি কি ভাবছেন।
মিঃ জাফরী পুনরায় তাকালেন। অদ্ভুত এই দস্যু বনহুর, একবার তাকালে সহজে চোখ ফিরিয়ে নেয়া যায় না। মিঃ জাফরীও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলেন না।
বনহুর বলল– আপনার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে ঐ ঝড়। আমারও। শান্ত কণ্ঠে কথা বলল সে।
মিঃ জাফরী স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন, কোন উত্তর দেন না।
মিঃ জাফরী যতই ভাবছেন ততই আশ্চর্য হচ্ছেন। দস্যু বনহুর তার সবকিছুই জানে। তিনি যে আজ রাতে বনহুরকে হত্যা বা গ্রেফতারের জন্যই যাচ্ছিলেন তাও বুঝতে পেরেছে, অথচ তার প্রতি এতটুকু অসৎ ব্যবহার করেনি বা করছে না সে। মনের মধ্যে একটা কৃতজ্ঞতা ভাব জাগে মিঃ জাফরীর। ইচ্ছা করলে এখনই সে তাকে হত্যা করতে পারে যা খুশি করতে পারে, কিন্তু সে এখন পর্যন্ত কোন অভদ্র ব্যবহার করেনি…
হঠাৎ মিঃ জাফরীর চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ে, দস্যু বনহুর বলে–কি ভাবছেন ইন্সপেক্টার?
কিছু না।
নিশ্চয়ই কিছু ভাবছিলেন।
ভাবছিলাম, শঙ্কর রাও কেমন আছেন।
শঙ্কর রাও!
হ্যাঁ, তিনি এখন কেমন আছেন?
শঙ্কর রাও ছিলেন নাকি আপনার সঙ্গে?
কেন, তাঁকেও নাকি তুমি উদ্ধার করেছ শুনলাম।
না, আপনার সঙ্গে যাকে নদীবক্ষ থেকে আমি তুলে এনেছি সে মিঃ রাও নয়, একজন মাঝি।
এতক্ষণে বুঝতে পারলেন মিঃ জাফরী, তাঁর সঙ্গে যাকে উদ্ধার করা হয়েছে সে মিঃ শঙ্কর রাও নয়, তার নৌকার মাঝি। একটা ব্যথার ছোঁয়া লাগলো মিঃ জাফরীর মনে– তাহলে মিঃ রাও আর বেঁচে নেই।
দস্যু বনহুর সান্ত্বনার স্বরে বললো–দুঃখ করে কোন লাভ নেই ইন্সপেক্টার। অদৃষ্টে যার যা আছে তা হবেই। আচ্ছা এখন চলি, গুডবাই…
দস্যু বনহুর বেরিয়ে যায় মিঃ জাফরীর ক্যাবিন থেকে।
মিঃ জাফরী ভাবতে থাকেন, এ কি হলো, যাকে গ্রেফতার করতে এসেছিলেন তার হাতেই বন্দী হলেন!
.
মিঃ হারুন অফিসে বসে ডায়েরী লিখছেন। মিঃ হোসেন এবং অন্যান্য অফিসার যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
গত রাতে মিঃ জাফরী এবং শঙ্কর রাও মধুমতী চলে গেছেন। এখনও ফিরে আসেন নি, এ নিয়েই চিন্তা করছিলেন মিঃ হারুন। কথাটা অফিসের আর কেউ জানে না, মিঃ জাফরী শুধু মিঃ হারুনকে ব্যাপারটা গোপনে জানিয়েছিলেন।
মিঃ হারুন নিজেও মিঃ জাফরীর সঙ্গে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিঃ জাফরী তাতে রাজি হন নি। তিনি বলেছিলেন, একা গিয়ে দেখতে চাই কি করতে পারি। মিঃ রাওকে সঙ্গে নিয়েছিলেন, যদি ছদ্মভাবে কিছু করা যায় তাঁকে দিয়ে করাবেন। যেমন কোন ভিখারী কিংবা কোন চাষীর বেশে ওকে পাঠিয়ে নিজে সুযোগ নেবেন।
গতরাতে যে প্রচণ্ড ঝড় হয়ে গেছে, এ জন্যই চিন্তা হচ্ছিল মিঃ হারুনের। এতক্ষণ ফিরে না আসারই বা কারণ কি? যদিও মিঃ হারুন ডায়েরী লিখছিলেন, কিন্তু তার মনে ঐ এক চিন্তা আলোড়ন জাগাছিল –মিঃ জাফরী ও শঙ্কর রাও কোন বিপদে পড়েননি তো…
হঠাৎ মিঃ হারুনের চিন্তাজাল ছিন্ন করে ফোনটা বেজে ওঠে।
মিঃ হারুন ডায়েরীতে হাত চালাতে চালাতে বাম হাতে রিসিভারখানা তুলে নেন হ্যালো! সঙ্গে সঙ্গে হাতের কলম রেখে সোজা হয়ে দক্ষিণ হাতে রিসিভার চেপে ধরেন কানে– হসপিটালে মিঃ শঙ্কর রাও! নদী থেকে তাঁকে জেলেরা নৌকায় উঠিয়ে এনেছে! জীবিত আছেন তো?
মিঃ হারুন যখন রিসিভারে কথা বলছিলেন, তখন অন্যান্য পুলিশ কর্মচারী স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন।
মিঃ হারুন রিসিভার রেখে উঠে দাঁড়ন, তারপর মিঃ হোসেনকে লক্ষ্য করে বলেন– আপনি এক্ষুণি আমার সঙ্গে চলুন। মিঃ রাও হসপিটালে আছে। তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।
মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন হসপিটালে পৌঁছে অবাক হলেন।
পথে গাড়িতে মিঃ হারুন গত রাতের কথাগুলো মিঃ হোসেনকে বলেছিলেন।
মিঃ শঙ্কর রাওয়ের জ্ঞান ফিরে এলো সন্ধ্যার দিকে।
মিঃ হারুন এবং অন্যান্য সবাই দুঃখে মুষড়ে পড়লেন। মিঃ জাফরী ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পাননি। নিশ্চয়ই তাঁর মৃত্যু ঘটেছে।
