বিদ্যুতের আলোতে তারা দেখতে পেল তাদের কিছু দূরে একটা নৌকা তলিয়ে গেল।
মোটর-বোটের প্রথম আরোহী বলে উঠলো–রহমান, যেমন করে হোক ঐ নৌকার যাত্রীদের বাঁচাতে হবে।
রহমান অতি কষ্টে মোটর-বোট চালিয়ে যাচ্ছিল বলে ওঠে সে– সর্দার, এ অবস্থায় নিজেদের বাঁচা কঠিন হয়ে পড়েছে, কি করে ওদের বাঁচাবেন…
মোটর-বোটের প্রথম আরোহী অন্য কেউ নয়–দস্যু বনহুর।
রহমানের কথায় বনহুর বলল– তুমি মোটর বোটখানা রক্ষা কর রহমান—মাহবুব আর, তুমি এই রশিখানা আমার কোমরের সঙ্গে বেঁধে মোটর-বোটের সঙ্গে আটকে নাও। বোটের তলায় যে চাল ডালের বস্তা আছে নদীতে ফেলে দাও–আমি নিজেই রশি পরে নিচ্ছি..
বনহুর ক্ষিপ্রহস্তে নিজের কোমরে রশি বেঁধে নদীবক্ষে লাফিয়ে পড়লো। ততক্ষণে মোটর বোটখানা অনেক চেষ্টায় ডুবন্ত নৌকার কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন লোককে ধরে ফেললো বনহুর, তাকে নিয়ে অতি কষ্টে মোটর বোটখানায় তুলতে সক্ষম হল। দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, হঠাৎ আর একখানা কালো মাথা বিদ্যুতের আলোতে দেখা গেল।
বনহুর অতি কৌশলে সাঁতার কেটে সেই ডুবন্ত লোকটাকেও ধরে ফেলল। খুব মোটা এবং ভারী দেহ লোকটার। বনহুর ওকে নিয়ে মোটর বোটের নিকটে পৌঁছতে খুব পেরেশান হয়ে পড়লো কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুটি লোককে বাঁচাতে সক্ষম হলো তারা।
বিদ্যুতের আলোতে বনহুর লোক দুটিকে লক্ষ্য করে চমকে উঠলো। একজন তার অতি পরিচিত মিঃ জাফরী। অন্যজন নৌকার মাঝি। এত বিপদেও বনহুর হেসে উঠলো।
ঝড় ধীরে ধীরে থেমে আসছে।
বনহুর বোটের মেঝেতে শায়িত সংজ্ঞাহীন লোক দুটির দিকে তাকিয়ে বলল–রহমান, জান এরা কারা?
রহমান এতক্ষণ বোটখানাকে ঝড়ের দাপট থেকে বাঁচাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে চলেছিল এতক্ষণে একটু আশ্বস্ত হয়েছে সে। বনহুরের কথায় বললো– তা কেমন করে জানবো সর্দার!
ইনি প্রখ্যাত পুলিশ অফিসার মিঃ জাফরী। অপর জন মাঝি।
সর্দার, তাহলে…
হ্যাঁ, দস্যু বনহুরের সন্ধানেই চলেছিলেন ভদ্রলোক, হঠাৎ তার এই অবস্থা।
সর্দার, মিঃ জাফরী তো আপনার ভীষণ শত্রু।
হ্যাঁ, তিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি শক্ত মনে করেন।
তাহলে ওকে বাঁচিয়ে লাভ কি সর্দার? হুকুম করুন আমরা ওকে–
না রহমান, শত্রুর বিপদ-মুহূর্তে শত্রুকে আঘাত করা কাপুরুষতা, চলো, ওকে আমার লঞ্চে নিয়ে চলো।
তবে কি আমরা লঞ্চে ফিরে যাবো?
হ্যাঁ। ঝড় সম্পূর্ণ থেমে গেলে আবার আসা যাবে।
দস্যু বনহুরের মোটর-বোটখানা মিঃ জাফরী এবং সংজ্ঞাহীন মাঝিটিকে নিয়ে বনহুরের লঞ্চের গায়ে এসে ভিড়ল। আকাশ তখন পরিষ্কার হয়ে এসেছে। নদীবক্ষ এখন শান্ত ধীর স্থির।
মিঃ জাফরী এবং মাঝিটিকে যত্ন সহকারে লঞ্চে উঠিয়ে নেয়া হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সংজ্ঞা ফিরে এলো মিঃ জাফরীর, ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। শুভ্র কোমল বিছানায় তাঁকে শোয়ানো হয়েছিল।
মিঃ জাফরী উঠে বসতেই একজন লোক এক গ্লাস গরম দুধ এনে তার হাতে দিল– খেয়ে নিন।
মিঃ জাফরী দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে স্মরণ করতে চেষ্টা করলেন এখন তিনি কোথায়।
অল্পক্ষণের মধ্যে মনে পড়ে গেল তার সব কথা–সেই নৌকা, সেই মাঝি, সেই প্রচণ্ড ঝড়ের কথা– তিনি তো নদীতে ডুবে গিয়েছিলেন– এখানে এলেন কি করে। এরা কারা কেমন করে তাকে উদ্ধার করেছে? মিঃ রাও এবং মাঝিই বা গেল কোথায়?
গরম দুধটুকু খেয়ে অনেকটা সুস্থ বোধ করলেন মিঃ জাফরী। তিনি নিজের শরীরে শুকনো জামাকাপড় দেখলেন বুঝতে পারলেন যারা তাকে উদ্ধার করেছেন তারাই তার দেহ থেকে ভিজে জামাকাপড় খুলে নিয়ে এসব পরিয়ে দিয়েছে। কৃতজ্ঞতায় মিঃ জাফরীর মন ভরে উঠলো। তিনি এবার লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলেন–কে তাকে রক্ষা করেছেন, তিনি কোথায়?
লোকটা জবাব দিল–আমাদের মনিব স্বয়ং আপনাকে রক্ষা করেছেন–তিনি সময় হলেই দেখা করবেন।
কে তিনি? কি নাম তার?
তিনি একজন হৃদয়বান লোক। মনিবের নাম আমরা উচ্চারণ করি না।
মিঃ জাফরী পুনরায় বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। হঠাৎ মনে পড়লো মিঃ শঙ্কর রাওয়ের কথা। এবার তিনি লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলেন–আমার সঙ্গীটি কোথায়?
আছে,পাশের ক্যাবিনে।
আশ্বস্ত হলেন মিঃ জাফরী। যাক তাহলে মিঃ শঙ্কর রাও-ও বেঁচে গেলেন।
নিশ্চিন্ত মনে চোখ বন্ধ করলেন মিঃ জাফরী। বোটের ঝক ঝক আওয়াজ তার চিন্তাধারাকে ভাসিয়ে নিয়ে চললো। তিনি ভাবতে লাগলেন, কোথায় দস্যু বনহুরকে হত্যা করে তার লাশ নিয়ে। ফিরে যাবেন আর কিনা নিজেই মৃত্যুপথের যাত্রী হয়ে কোনরকমে প্রাণ ফিরে পেয়ে কার না কার লঞ্চের ক্যাবিনে শুয়ে আছেন। কিন্তু তিনি যে প্রাণে বেঁচে আছেন এটাই তার ভাগ্য। কে সে মহান ব্যক্তি যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে গভীর জলের উন্মত্ত উচ্ছ্বাস থেকে তাঁকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। মনে মনে বারবার তাকে ধন্যবাদ জানান মিঃ জাফরী।
হঠাৎ পদশব্দে চোখ তুলে তাকান, দেখতে পান পূর্বের সেই লোকটি ক্যাবিনে প্রবেশ করলো। মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললো আমাদের মনিব আসছেন।
আনন্দে কৃতজ্ঞতায় চক্ চক্ করে উঠলো মিঃ জাফরীর চোখ দুটো। উন্মুখ হৃদয় নিয়ে তাকালেন ক্যাবিনের দরজার দিকে। এক্ষুণি তিনি দেখতে পাবেন তার প্রাণরক্ষাকারীকে। কি বলে তাকে ধন্যবাদ জানাবেন ভাবতে লাগলেন মিঃ জাফরী।
