হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বললেন শঙ্কর রাও-রাত এখন দুটো।
নৌকা কখন আসবে ঘাটে?
রাত তিনটেয় স্যার। আমাদের সঙ্গে কিছু পুলিশ নিলে হয় না?
না, পুলিশ ফোর্স নিয়ে আমি ঝামেলা বাড়াতে চাইনা। দু’জনই যথেষ্ট। কিন্তু ব্যাপারখানা তো কেউ জানতে পারেন নি?
স্যার, শুধু আপনি আর আমি ছাড়া এ সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না। আর জানে নৌকার মাঝি ফরিদ মিয়া।
তাকে কি করে বিশ্বাস করি?
বিশ্বাস করতে হবে স্যার। ফরিদ মিয়া আমাদেরই একজন। তা ছাড়া সে তো আমাদের সন্ধান দিয়েছে দস্যু বনহুর আগামী অমাবস্যার রাতে মধুমতী চরে বন্যাপীড়িতদের মধ্যে টাকা পয়সা আর অন্ন বিতরণ করবে। এ খবর তো আমরা তার কাছেই পেয়েছি।
মিঃ রাও, মনে রাখবেন, এর একচুল যদি মিথ্যা বা অসত্য হয়, তাহলে……
স্যার, আমি নিজের চেয়ে ফরিদ মিয়াকে বেশি বিশ্বাস করি।
বেশ, চলুন।
এখনও কিছু সময় দেরী আছে স্যার।
রিভলভার, গুলী সব তৈরি আছে?
আছে।
রিভলভার নেবেন দুটো। একটা থাকবে লুকানো, আর একটা প্রকাশ্য। একটা হস্তচ্যুত হবার সঙ্গে সঙ্গে অন্যটা ব্যবহার করবেন। দস্যু বনহুরকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিনা দ্বিধায় গুলী ছুড়বেন। তাকে জীবিত গ্রেফতার করা সম্ভব নয়, তাই তাকে আমরা হত্যা করেই আনতে চাই।
রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে মিঃ জাফরী এবং শঙ্কর রাও নৌকায় এসে উঠলেন।
আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা; বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে– ঝড়ের পূর্ব লক্ষণ।
বিদ্যুতের আলোতে নৌকাখানা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। নৌকায় কোন আলো নেই।
মিঃ জাফরী এবং শঙ্কর রাও নৌকায় পৌঁছলেন। মাঝি ফরিদ মিয়া অন্ধকারে তাদের অভ্যর্থনা জানালো।
মিঃ জাফরী অন্ধকারেও নিপুণভাবে ফরিদ মিয়াকে দেখে নিলেন। লোকটাকে পরীক্ষা করে দেখে আশ্বস্ত হলেন তিনি। অতি সাদাসিদে লোক বলেই মনে হলো তার। তবু মিঃ জাফরী যতদূর সম্ভব পুলিশী কায়দায় ভয় দেখিয়ে ওকে যাচাই করে নিলেন এবং এ কথাও তিনি শুনে নিলেন সত্যিই দস্যু বনহুর আজ রাতে মধুমতী চলে যাবে কিনা।
ফরিদ মিয়া বললো–হুজুর, আমার নৌকা আজ বিশ বছর এই নদীতে পাড়ি জমাচ্ছে। নদী চরে কোথায় কি হয় তাই যদি না জানলাম–
দস্যু বনহুর যে বন্যাপীড়িতদের মধ্যে সাহায্য দান করবে তা কেমন করে জানলে?
হুজুর, আজ শুধু নয়– আরও কয়েক বছর সে এমনি করে মধুমতী চরে দান করেছে। আমরা তাকে জানি হুজুর। সে আমাদের কোন ক্ষতি করে না–
থাক, অত গল্প করতে হবে না, জোরে চালিয়ে চল। দেখ দাঁড়ের শব্দ যেন না হয়।
হলেই বা ক্ষতি কি হুজুর। ফরিদ মাঝি কাউকে ভয় করে না। দস্যুর বাবা এলেও না– কিন্তু হুজুর, আমার ভয় শুধু ঐ পবন বেটাকে।
কথাটা শুনে মিঃ জাফরীর বলিষ্ঠ প্রাণটাও একটু কেঁপে ওঠে। ছৈ-এর ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে একবার আকাশখানা দেখে নিলেন তিনি। আকাশের অবস্থা মোটেই ভাল নয়। ঘন কাল মেঘ সমস্ত পৃথিবীটাকে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। একে অমাবস্যা রাত তার ওপর এই দুর্যোগপূর্ণ আকাশ। মিঃ জাফরী ভাবলেন, ফিরে যাওয়া যাক। ভয় হল, তিনি তো সাঁতার জানেন না। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন তার মত একজন সাহসী লোক যদি এই সামান্য কারণে আজ ফিরে যান, তাহলে নিজের কাছে নিজেরই লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। তা ছাড়া শঙ্কর রাও ও মাঝিটাই বা ভাববে কি?
মনকে শক্ত করে নিলেন মিঃ জাফরী, বুকে সাহস সঞ্চয় করে বললেন পবন বেটার সাধ্য কি আমাদের কাজে বাধা দেয়। ফরিদ মিয়া, তোমাকে মোটা বখশিস দেব, তুমি সাবধানে শুধু মধুমতী চরে নৌকা ভিড়িয়ে দেবে। কেউ যেন টের না পায়।
না না হুজুর, আমি ঠিকভাবে পৌঁছে দেব, আপনারা চুপ করে বসে থাকুন।
শঙ্কর রাওয়ের কিন্তু মুখ ভয়ে চুর্ণ হয়ে এসেছে। আকাশের অবস্থা তার মনে একটা অমঙ্গলের বার্তা বয়ে আনছে, কোন কথা তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। মনে মনে ভগবানের নাম স্মরণ করতে লাগলেন তিনি। ফিরে যাবার কথাও মুখ ফুটে বলতে পারছেন না, মিঃ জাফরী যদি রেগে যান!
নৌকা এখন মাঝ নদীতে এসে পড়েছে।
আকাশ যেন ভেঙে পড়ার জোগাড় হলো। সেকি ভীষণ গর্জন করছে মেঘ-বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে– ঝড় বইছে– আর বুঝি রক্ষা নেই!
এতবড় নৌকাখানার একমাত্র মাঝি শুধু ফরিদ মিয়া। অন্য কোন মাঝিকে বিশ্বাস করতে পারেন নি শঙ্কর রাও, তাই ফরিদ মিয়াকে একাই আজ নৌকা বেয়ে আসতে হয়েছে।
ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফরিদ মিয়া হাঁপিয়ে উঠেছে। আর রক্ষা নেই।
ঝড় ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।
মিঃ জাফরী এবং শঙ্কর রাওয়ের মন থেকে দস্যু বনহুরকে হত্যার বাসনা মুছে গেছে। নৌকাখানা যদি ডুবে যায় তাহলে তাদের বাঁচার কোন আশাই থাকবে না। কারণ তারা সাঁতার জানেন না। আর একটু আধটু জানলেই বা কি– দুর্যোগপূর্ণ রাত্রির নদীর বুকে প্রচণ্ড ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাঁতার দেওয়া অতি নিপুণ সঁতারুর পক্ষেও সম্ভব নয়!
প্রকাণ্ড ঢেউগুলো আছাড় খেয়ে পড়তে লাগলো মিঃ জাফরী আর শঙ্কর রাওয়ের গায়ে। ভিজে চুপসে গেলেন তাঁরা।
এমন সময় নৌকাখানা কাৎ হয়ে গেল একপাশে।
দুর্যোগপূর্ণ রাতের অন্ধকার ভেদ করে জেগে উঠলো দুটি কণ্ঠ ফরিদ মিয়া, ফরিদ মি–য়া–য়া ..
আর শুনা গেল না কিছু।
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারে ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আসছিল একটি ছোট্ট মোটরবোট। মোটর বোটখানাতেও মাত্র তিনজন আরোহী।
