মিঃ জাফরী রুদ্ধকণ্ঠে বললেন– দস্যু বনহুরের!
বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু–দস্যু বনহুর! বলেন কি স্যার!
মিঃ জাফরী বললেন–যখন এটাচীতে আপনাদের টাকা অক্ষত অবস্থায় আছে জানতে পারলাম তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল, সাধারণ লোক হলে এত সহজে সে এতগুলো টাকার লোভ সামলাতে পারত না। তখন আমি ভালভাবে লক্ষ্য করি। আলম সাহেবের বেশে বনহুরকে বেশ কিছুদিন আমি পাশে পেয়েছিলাম। কজেই তাকে চিনতে আমার বেশি কষ্ট হয় নি। কিন্তু হাতের কাছে পেয়েও পেলাম না–গ্রেফতার করতে পারলাম না। অধর দংশন করেন মিঃ জাফরী। .
কিন্তু তিনি আশ্বস্ত হন, দস্যু বনহুরকে চিনতে তার বেশি বেগ পেতে হয় নি।
মিঃ জাফরী, শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু তাঁদের নিজস্ব ভাড়াটিয়া গাড়িতে উঠে বসলেন।
.
অন্ধ রাজা মোহন্ত সেন তাঁর বিশ্রামকক্ষে বসে গম্ভীরভাবে চিন্তা করছিলেন। মনে পড়ছিল তার সেদিনের কথা– সেই অজানা বন্ধু যে তাঁকে সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল, তার কথা।
সেদিন রাজা মোহন্ত সেন তাঁর অজানা বন্ধুকে এতটুকু ধন্যবাদ জানাবার সময়ও পান নি। সত্যি কত মহৎ, কত হৃদয়বান সেই অজানা লোকটা। এখন যদি একবার তাকে কাছে পেতেন তাহলে বুকে জড়িয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতেন। যা পুরস্কার সে চাইতো তাই দিতেন তিনি ওকে।
মোহন্ত সেন যতই ভাবেন মনটা তার ততই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। একটিবার সেই অজানা বন্ধুর সান্নিধ্য পাবার আশায় চঞ্চল হয়ে ওঠেন তিনি।
মানুষ কথায় বলে যে যা চায়, যা কামনা করে, তাই সে পায়। মোহন্ত সেনের মনের ডাকে সাড়া দেয় তার অজানা বন্ধু, পেছন দরজা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে রাজা মোহন্ত সেনের পাশে এসে দাঁড়ায়। সেই যে তাকে উদ্ধার করে বাড়ি পৌঁছে দেবার পর আর আসেনি সে। আজ তাকে দেখার জন্য সশরীরে হাজির হলো।
মোহন্ত সেনের কাঁধে হাত রাখতেই চমকে উঠলেন তিনি।
মোহন্ত সেন– কে?
তোমার সেই অজানা বন্ধু।
তুমি– তুমি এসেছো?
হ্যাঁ, এসেছি। কেমন আছ রাজা?
ঈশ্বরের কৃপায় আর তোমার দয়ায় ভাল আছি। বন্ধু, এই মুহূর্তে আমি তোমার কথাই স্মরণ করছিলাম।
তাই তো আমি এসেছি রাজা।
দু’হাত বাড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেন রাজা মোহন্ত সেন– তুমি, তুমিই কি…
হ্যাঁ, আমি……. আমিই দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর! শুনেছি তুমি ধনবানের শত্রু–গরিবের বন্ধু।
শুধু আমি গরিবের বন্ধু নই রাজা, অসহায়ের সাথীও।
তুমি কি পুরস্কার চাও বন্ধু বলো? যা চাবে তাই আমি তোমাকে দেবো। আমার প্রাণরক্ষার বিনিময়ে তুমি যা চাইবে,তাই দেবো।
ভিক্ষুক আমি নই রাজা। প্রতিদানও আমি চাই না।
তবে কি চাও? রাজভাণ্ডারে আমার যত অর্থ আছে নিয়ে যাও। যা খুশি করো, আমি তোমাকে সব দিলাম।
তোমার মধুর ব্যবহার আমার কাছে তোমার রাজভাণ্ডারের সোনাদানা, মনিমুক্তার চেয়ে মূল্যবান। তোমার দয়ায়, তোমার গরিব প্রজাগণ সুখে আছে, তারা শান্তিতে বসবাস করছে– এটাই আমার বড় পাওয়া।
পিতাকে একা একা কথা বলতে শুনে চুপি চুপি উঁকি দেয় বাসবী দেবী। চমকে ওঠে সে, পিতার পাশে কে একজন রাজপুত্রের মত সুন্দর যুবক দাঁড়িয়ে কথা বলছে!
অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে বাসবী দেবী। কে এই যুবক। পিতার কক্ষে কেমন করেই বা এলো? তারা গোটা বাড়ির লোক কেউ জানলো না কোন পথে প্রবেশ করেছে?
যত দেখে বাসবী ততই মুগ্ধ হয়ে যায়। এত সুন্দর সুপুরুষ সে কোনদিন দেখেনি।
দস্যু বনহুরকে পূর্বে একদিন দেখেছে বাসবী, কিন্তু সেদিন কেউ তার চেহারা দেখতে পায়নি, বাসবীও না। আজ বাসবী প্রথম দেখাল তাকে।
দস্যু বনহুর রাজা মোহন্ত সেনের সঙ্গে কথা শেষ করে যে পথে কক্ষে প্রবেশ করেছিল, সেই পেছনে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
এবার বাসবী পিতার কক্ষে প্রবেশ করে ডাকে– বাবা!
চমকে ওঠেন রাজা মোহন্ত সেন। ভাবেন, বাসবী তো ওকে দেখেনি। আবার একটা হাঙ্গামা বাধিয়ে না বসে! একটু কেশে বলেন– কে, মা বাসবী?
হ্যাঁ। আচ্ছা বাবা, বলো তো কার সঙ্গে তুমি কথা বলছিলে?
ও কিছু না, ও কিছু না মা।
তুমি যে কথা বললে……
এমনি। বুড়ো মানুষ যা মনে আসে বলে ফেলি।
বাবা, আমি ছোট্ট খুকী নই, সব জানি। বলো কে ঐ যুবক যার সঙ্গে তুমি একটু পূর্বে আলাপ করছিলে?
বুঝেছি, তুই তাহলে লুকিয়ে দেখে ফেলেছিস, তাই না মা?
হ্যাঁ। বল কে সে?
ঐ … ঐ … ওকে তুই দেখেছিস। দেখেছিস মা?
দেখেছি বাবা।
কেমন দেখতে একটু বলতো মা?
খুব–খুব খারাপ দেখতে..
না, তা হতে পারে না। যার মন আকাশের মত উদার, যার হৃদয় সাগরের মত গভীর, যার দয়ার সীমা নেই, সে কখনও দেখতে খারাপ হতে পারে না মা, তুই তাহলে ভুল দেখেছিস।
বলনা কে সে?
আমার সেই অজানা বন্ধু।
মানে যে তোমাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল, সেই দস্যু।
দস্যু নয় মা, দস্যু নয়–দেবতা।
বাসবীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পূর্বে দেখা একখানা মুখ–অপূর্ব সুন্দর সে মুখ।
.
মিঃ জাফরী নিজস্ব অফিস-রুমে ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করে চলেছেন। তাঁর সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে উঠেছে। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন– এবার দস্যুকে সামনে পেলে গ্রেফতার নয়, হত্যা করবো। হত্যা ছাড়া তাকে বন্দী করা যাবে না।
স্যার, কখন রওয়ানা দেবেন? প্রশ্ন করেন শঙ্কর রাও। এখন রাত কটা বাজে মিঃ রাও?
