প্রথম মাড়োয়ারী ভদ্রলোকটার মুখমণ্ডল কঠিন ইস্পাতের মত শক্ত হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ পাশে বিশ হাজার টাকার এটাচ ব্যাগ রেখে সামনে তাকিয়ে বসে আছেন।
ড্রাইভারকে বলে দিলেন– পার্ক রোড ধরে লেকের ধারে গাড়ি নিয়ে চলো।
ড্রাইভার সেইভাবে গাড়ি চালাতে লাগলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি নির্জন লেকের ধারে এসে থেমে পড়লো। ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়লেন মাড়োয়ারী ভদ্রলোকদ্বয়। সেই গাড়িটা সামান্য কিছু অগ্রসর হতেই অন্য একটা ট্যাক্সি ডেকে তাঁরা চেপে বসলেন এবং সামনের গাড়িখানাকে ফলো করতে বললেন।
মাড়োয়ারীদ্বয়ের গাড়ি সামনের খালি গাড়িখানা থেকে বেশ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে লাগলো।
সামনের গাড়িখানা আরোহীর আশায় ধীর ধীরে চলছিল। এক জায়গায় এসে সামনের গাড়িখানা থেমে পড়লো। একটা বয়স্ক ভদ্রলোক উঠে বসলেন গাড়িখানাতে।
মাড়োয়ারীদ্বয়ের একজন ড্রাইভারকে বললেন–ঐ গাড়িখানাকে অনুসরণ করো। খুব হুঁশিয়ার হয়ে গাড়ি চালাবে, দেখো সামনের গাড়িখানা যেন টের না পায়!
ড্রাইভার জবাব দিল– আচ্ছা স্যার।
আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে সামনের গাড়িখানা এগুচ্ছে।
পেছনের গাড়িখানা। সামনের গাড়ি থেকে বেশ দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে।
প্রথম মাড়োয়ারী ভদ্রলোক দ্বিতীয় জনকে বললেন– নিশ্চয়ই আমাদের অজ্ঞাত বন্ধু তার। চাওয়া টাকার অনুসন্ধানে ব্যস্ত আছে।
আমারও তাই মনে হচ্ছে। এবার আমরা কি করতে পারি?
ঐ গাড়ির আরোহীকে আমি ফলো করবো, সে কোথায় যায় এবং কি করে দেখব।
তার পূর্বেই যদি আমাদের জন্য সে মৃত্যুর ব্যবস্থা করে?
মাথা পেতে বরণ করতে হবে।
একি! গাড়িখানা এবার নির্জন পথ ধরে একটা বস্তির দিকে এগুচ্ছে।
প্রথম মাড়োয়ারী বললেন– ড্রাইভার, এবার ঐ গাড়ির পাশ কেটে তোমাকে সামনে যেতে হবে। ঐ যে ওখানে একটা ফাঁকা জায়গা দেখছো, সেখানে তোমাকে গাড়িখানাকে পাশ কেটে উঠতে হবে।
আচ্ছা স্যার। ড্রাইভার এবার গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সামনের গাড়িখানার পাশ কেটে পেছনের গাড়ি এগিয়ে গেল।
ড্রাইভারের নিপুণ দক্ষতায় খুশি হলেন মাড়োয়ারীদ্বয়।
প্রথম মাড়োয়ারী ভদ্রলোক এবার সামনের গাড়িখানার পথ রোধ করে দাঁড়াবার নির্দেশ দিলেন।
সামনের গাড়ির বাঁধা পাওয়ায় পেছনের গাড়ি থেমে পড়তে বাধ্য হলো।
মাড়োয়ারীদ্বয় দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পেছনের গাড়ির আরোহী ভদ্রলোকের সামনে এসে দাঁড়ালেন, দুজন একসঙ্গে রিভলভার তুলে ধরলেন। মাড়োয়ারী ভদ্রলোক চাপাকণ্ঠে বললেন–হ্যান্ডস আপ!
দ্বিতীয় গাড়ির আরোহী মৃদু হাসলো, তারপর বললো– থ্যাঙ্ক ইউ, আপনারা দেখছি খাস মাড়োয়ারী বনে গেছেন।
মাড়োয়ারীদ্বয় মুহূর্তে হাত নামিয়ে সেলুট করলেন। তারপর কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে প্রথমজন বললেন–স্যার, মাফ করবেন, আপনাকে চিনতে পারিনি!
মিঃ জাফরী হাসলেন– এই বুদ্ধি নিয়ে আমরা দস্যু বনহুরকে পাকড়াও করতে নেমেছি। মিঃ রাও, আপনার সঙ্গীটি…..
ইয়েস স্যার, আমার সহকারী গোপাল বাবু।
আচ্ছা, টাকাগুলো ঠিকভাবে উঠিয়ে নিতে পেরেছেন তো?
হ্যাঁ স্যার, টাকাগুলো ঠিকভাবেই উঠাতে পেরেছি। কিন্তু—
কিন্তু কি?
অনেক কথা আছে স্যার আপনার সঙ্গে।
আপনার গাড়ি ছেড়ে চলে আসুন এ গাড়িতে।
দ্বিতীয় মাড়োয়ারী ভদ্রলোকের বেশে গোপাল বাবু বলে ওঠেন–ব্যাগটা কিন্তু এখনও গাড়িতেই রয়েছে।
হোয়াট! অবাক করলেন, টাকার ব্যাগ গাড়িতে রেখে নেমে গেছেন আপনারা।
স্যার অতি দ্রুত …
বুঝেছি ….দ্রুত আমাকে পাকড়াও করতে গিয়ে–
ততক্ষণে ড্রাইভার এটাচী হাতে এগিয়ে আসে– হুজুর, আপনারা এটা গাড়িতে ফেলেই..
দাও। মাড়োয়ারীবেশি শঙ্কর রাও ড্রাইভারের হাত থেকে এটাচীখানা নেন। তারপর গোপাল বাবুকে ওর ভাড়া মিটিয়ে দিতে বলেন।
মিঃ জাফরী একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে গাড়িতে বসেছিলেন। এমন নিখুঁত ছদ্মবেশ তিনি ধরেছিলেন, তাঁকে চেনা মুস্কিল ছিল যদি নিজে কথা না বলতেন।
গোপাল বাবু যখন গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিচ্ছিলেন তখন মিঃ জাফরী নিপুণভাবে লক্ষ্য করছিলেন ড্রাইভারটাকে।
শঙ্কর রাও এটাচী খুলে দেখে নিচ্ছিলেন টাকাগুলো ঠিক আছে কিনা।
না, টাকাগুলো ঠিকই রয়েছে। ড্রাইভারকে সন্দেহ করার কিছু নেই।
ড্রাইভার তার ভাড়া বুঝে নিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিতেই মিঃ জাফরী বাঘের মত হুঙ্কার ছেড়ে লাফিয়ে পড়লেন এবং রিভলভার উদ্যত করে উঠলেন– ওকে পাকড়াও করুন। পাকড়াও করুন…. সঙ্গে সঙ্গে মিঃ জাফরীর রিভলভার গর্জন করে উঠলো।
কিন্তু কি আশ্চর্য, ততক্ষণে গাড়িখানা যেন হাওয়ায় মিশে গেল, এক নিমিষে উধাও হয়েছে গাড়িটা। শুধু মিঃ জাফরীর রিভলভারের একরাশ ধোয়া ছড়িয়ে রয়েছে সেখানে।
মিঃ জাফরী হঠাৎ গাড়ির ড্রাইভারকে এভাবে আক্রমণ করায় শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু হকচকিয়ে যান। তাদের টাকার একটি পয়সাও যায়নি, অথচ..
শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবুকে লক্ষ্য করে মিঃ জাফরী ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন– শিগগির ঐ গাড়িখানাকে ফলো করুন।
শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু সামনে তাকালেন, অসংখ্য গাড়ির ভীড়ে সেই গাড়িখানা অদৃশ্য হয়েছে।
মিঃ জাফরী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকেন।
শঙ্কর রাও এবং গোপাল বাবু তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। মিঃ রাও বললেন– স্যার, ও গাড়িখানা কার?
