মিঃ জাফরী বললেন– স্যার, আমি শপথ করছি, এবার আমি দস্যু বনহুরকে যদি পাকড়াও করতে না পারি, তাহলে পদত্যাগ করবো।
কক্ষস্থ সকলে একসঙ্গে তাকালেন মিঃ জাফরীর ভাবগম্ভীর কঠিন চেহারার দিকে। অগ্নিদগ্ধ। ইস্পাতের মত রাঙা হয়ে উঠেছে তার মুখমণ্ডল।
কিছুক্ষণ কক্ষে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
মিঃ জাফরীর এই শপথ গ্রহণ সকলের মনেই একটা আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে।
পুলিশ সুপার মিঃ আহমদ এবার মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললেন– থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ জাফরী, আপনি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে কৃতকার্য হবেন বলে আশা করি। তারপর অন্যান্য পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন– আপনারা তাঁকে সাহায্য করবেন।
মিঃ হারুন সকলের পক্ষ হয়ে বললেন– নিশ্চয়ই করবো স্যার, আমরা সর্বান্তকরণে তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবো।
এরপর বিদায়ের পালা।
মিঃ জাফরী এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার যে যার গাড়িতে গিয়ে বসলেন।
মিঃ জাফরীর গাড়ি বাসার দিকে না গিয়ে শঙ্কর রাওয়ের গাড়ি খানাকে অনুসরণ করলো।
মিঃ রাও বারান্দায় গাড়ি রেখে নেমে দাঁড়াতেই মিঃ জাফরীর গাড়ি প্রবেশ করলো সেখানে।
মিঃ রাও অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন– স্যার আপনি!
জরুরি কথা আছে, আসুন ভেতরে গিয়ে বসি। মিঃ জাফরী গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন।
মিঃ জাফরী এবং শঙ্কর রাওয়ের মধ্যে বহুক্ষণ গোপনে আলোচনা চললো।
তারপর সেদিনের মত শঙ্কর রাওয়ের বাসা থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন মিঃ জাফরী।
হোটেল রক্সি!
শহরের সেরা হোটেল।
কত লোক আসছে যাচ্ছে, তার কোন হদিস নেই।
হোটেলের একপাশের টেবিলে বসে চা পান করছেন দু’জন মাড়োয়ারী ভদ্রলোক। চা পানের ফাঁকে ফাঁকে নিম্নস্বরে কিছু আলাপ আলোচনা হচ্ছিল তাঁদের মধ্যে।
মাড়োয়ারীদ্বয় যে বেশ ধনী তাতে কোন সন্দেহ নেই।
চা পান শেষ করে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলেন মাড়োয়ারীদ্বয়, এবার তারা একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে বসলেন। বয়স্ক মাড়োয়ারী ভদ্রলোকটি ড্রাইভারকে বললেন– ন্যাশনাল ব্যাংকে চলো।
ট্যাক্সি ন্যাশনাল ব্যাংকের উদ্দেশ্যে ছুটতে শুরু করলো।
অল্পক্ষণেই এপথ সেপথ ঘুরে ব্যাংকের সামনে এসে গাড়ি থামালো।
মাড়োয়ারী ভদ্রলোক দু’জন গাড়ি থেকে নেমে ব্যাঙ্কের ভেতরে প্রবেশ করলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে একখানা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো পূর্বের গাড়িখানার পাশে। একটা যুবক গাড়ি থেকে নেমে সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো, তারপর অগ্রসর হলো ব্যাংকের দিকে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর যুবক ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো।
যুবকের গাড়ি চলে যেতেই, মাড়োয়ারী ভদ্রলোকদ্বয় এটাচ ব্যাগ হাতে গাড়িতে এসে বসলেন।
এটাচ ব্যাগটা তাদের একজনের হাতে আগে থেকেই ছিল, এবার ব্যাগটা বেশ ভারী বলে মনে হচ্ছে।
গাড়িতে মাড়োয়ারী ভদ্রলোকদ্বয় বেশ হেসে হেসে আলাপ করছিলেন।
হঠাৎ মাড়োয়ারীদ্বয়ের একজন নিচে তাকিয়ে দেখতে পান একটা ভাঁজকরা কাগজ পড়ে রয়েছে। তাড়াতাড়ি কাগজখানা হাতে তুলে নিয়ে মেলে ধরেন চোখের সামনে। দ্বিতীয়জনও তাকান সেইদিকে। কাগজখানায় গাঢ় লাল কালিতে লেখা?
যে বিশ হাজার টাকা তোমরা নিয়ে যাচ্ছে তা থেকে আমাকে কমপক্ষে দশ হাজার দিতে হবে। নচেৎ তোমাদের মৃত্যু অনিবার্য। এই গাড়ির মধ্যেই আমার প্রয়োজনীয় টাকা রেখে নেমে যাবে।
তোমাদের অজ্ঞাত
‘বন্ধু’
মাড়োয়ারীদ্বয়ের একজন হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন– অজ্ঞাত বন্ধুই বটে!
হ্যাঁ, তা না হলে টাকা চাইবার সাহস কার আছে? কিন্তু আপনি কি মনে করেন টাকা না দিয়েই চলে যাবেন? দ্বিতীয় জন বললেন।
প্রথম মাড়োয়ারী ভদ্রলোক বললেন– বন্ধু যখন টাকা চাইছে, না দিয়েই বা উপায় কি! কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ড্রাইভারের পিঠে রিভলভার চেপে ধরে চাপাকণ্ঠে বললেন– গলির মধ্যে গাড়ি নিয়ে চলো।
ড্রাইভার চমকে ওঠে। পেছন ফিরে তাকাবার সাহস হয় না তার। সামনেই গলি, সেই গলির মধ্যে গাড়ি নিয়ে যায় ড্রাইভার।
তখনও সে পিঠে হিমশীতল একটা জিনিসের অস্তিত্ব অনুভব করে। এবার সে শুনতে পায় গাড়ি থামাও!
ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে ফেলে ড্রাইভার। মুখখানা তার ভয়ে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
গাড়ি থামতেই প্রথম মাড়োয়ারী ভদ্রলোক গাড়িতে পাওয়া চিঠিখানা মেলে ধরেন তার সামনে– এ চিঠি কে রেখেছে?
ড্রাইভার চিঠির লেখাগুলোতে দৃষ্টি বুলিয়ে বলে– হুজুর, আমি এ চিঠি সম্বন্ধে কিছু জানিনা।
গর্জে ওঠেন মাড়োয়ারী ভদ্রলোক নেকামি করো না, সত্য করে বলো– এ চিঠি গাড়িতে কি করে এলো?
হুজুর, আমি সত্য বলছি, ও চিঠি সম্বন্ধে কিছু জানি না।
এ গাড়ির মালিক কে?
শ্যামলাল বাবু– ঐ যে চৌ-রাস্তায় মদের দোকান আছে যার। আর বলতে হবে না।
দ্বিতীয় মাড়োয়ারী ভদ্রলোক বললেন– গাড়ির মালিক এ ব্যাপারে আমার মনে হয় কিছুই জানে না।
প্রথম মাড়োয়ারী বললেন– গাড়ি ছাড়ো।
ড্রাইভার বলল– কোথায় যাব?
সেই অজ্ঞাত বন্ধুর খোঁজে। তাকে টাকা না দিয়ে যাই কি করে?
প্রথম মাড়োয়ারীর কথায় দ্বিতীয় মাড়োয়ারী বললেন– ঐ সামান্য একটা চিঠির ভয়ে দশ হাজার টাকা দেবেন?
তাছাড়া উপায় কি?
গাড়ি তখন চলতে শুরু করেছে।
গলি থেকে বেরিয়ে এবার বড় রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করে।
