বনহুর বুঝতে পারে, মনিরার মনে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে মনিরা।
বনহুর হেসে বললো– এ তোমারই দেওয়া পুরস্কার।
মনিরা বিস্ময়ভরা চোখে তাকায় বনহুরের উজ্জ্বল দীপ্ত মুখমণ্ডলের দিকে, বলে ওঠে — তবে কি, তবে কি সেই রাজা–
হ্যাঁ মনিরা, সেই মহারাজ আর কেউ নয়– দস্যু বনহুর।
অস্ফুট ধ্বনি করে বনহুরের বুকে মুখ লুকালো মনিরা। অনাবিল একটা আনন্দ তার মনকে সচ্ছ করে দিল। এত আনন্দ বুঝি জীবনে মনিরা কোনোদিন পায় নি। আত্মহারা হয়ে গেল সে। বেশ কিছুক্ষণ লাগলো মনিরার নিজকে সামলে নিতে। তারপর বললো– কেন তুমি আমাকে। এভাবে পরীক্ষা করতে গেলে?
তোমার ভুলের জন্য কিছুটা শাস্তির প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু তুমিও কম শাস্তি পাওনি। দেখো তো ভয়ানক ক্ষতটা হয়েছে। ইস্ কত কষ্ট তুমি পেয়েছো, এসো ঔষধ লাগিয়ে বেঁধে দিই।
মনিরা বনহুরকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে, ঔষধ এনে সুন্দর করে হাতের ক্ষতটা বেঁধে দিতে লাগলো।
এমন সময় মরিয়ম বেগম দুটি গ্লাসে গরম দুধ নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। কক্ষে প্রবেশের আগে একটু কেশে তিনি নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দেন বনহুর ও মনিরাকে।
মনিরা বনহুরের হাতের ক্ষত বেঁধে দিয়ে সরে দাঁড়ায়।
মরিয়ম বেগম আতঙ্কভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন–ওকি, মনিরের হাতে কি হয়েছে?
বনহুরই জবাব দেয়– গোলাপের কাঁটা ফুটেছিল মা।
সেকি বাবা, গোলাপের কাটা?
হ্যাঁ মা। জানো মা, ঐ গোলাপ তুলতে গেলে কাঁটার আঘাত খেতে হয়। হাত বাড়ায় বনহুর। মায়ের দিকে-দাও।
মরিয়ম বেগম ছেলের হাতে দুধের গ্লাসটা দিয়ে অন্য গ্লোসটা মনিরার দিকে বাড়িয়ে ধরেন নাও মা, খেয়ে নাও।
মনিরা দুধের গ্লাস হাতে নেয়।
মরিয়ম বেগম সেই ফাঁকে বেরিয়ে যান। অনাবিল এক আনন্দে তাঁর মাতৃহৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বনহুর দুধের খালি গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে মনিরাকে টেনে নেয় কাছে। বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে সে– আজ কামড়ে দেখ। উঃ কি সাংঘাতিক মেয়ে তুমি!
নাগিনীর চেয়েও সাংঘাতিক তাই না?
তার চেয়েও ভয়ঙ্কর।
পুলিশের রাইফেলের চেয়েও আমার দাঁত মারাত্মক অস্ত্র। দুধর্ষ দস্যু বনহুরকেও ঘায়েল করতে পারে।
হাসে ওরা দুজন।
মনিরা বলে– কেন তুমি আমাকে এতদিন ভোগালে?
আমার ইচ্ছাকৃত কিছুই নয় মনিরা।
বড় নির্দয় তুমি।
সেকি তুমি আজ নতুন করে আবিষ্কার করলে?
তাই বলে তুমি আমাকে এমনি করে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাঁদাবে? আমি জানি তোমাকে যে-ই ভালবেসেছে সেই কেঁদেছে, তাই বলে তুমি সবাইকে কাঁদাবে?
আমি তো বললাম ইচ্ছাকৃত আমার কিছুই নয়। মনিরা, তুমি বুঝবে না আমি কত নিষ্ঠুর, কত হৃদয়হীন।
সব আমি জানি।
সব জেনেও তুমি আমাকে ভালবাসতে পার? সত্যি বড় আশ্চর্য মেয়ে তুমি।
তার চেয়ে আশ্চর্য তুমি। নরহত্যা আর লুট ছাড়া তোমার কি অন্য কাজ নেই? কেন হত্যা করো, বলো কেন, বলো কেন তুমি হত্যা করো? হত্যার নেশায় তুমি পাগল হয়ে যাও কেন?
বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর কঠিন হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো– অন্যায় আমার কোনদিন সহ্য হয় না মনিরা। অন্যায়কে আমি কোনদিন ক্ষমা করতে পারি না। শুধু হত্যাই নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি সব করতে পারি।
মনির।
বল?
তুমি কি কোনদিন শান্ত হবে না?
বোধ হয় না।
চিরদিন তুমি লুট আর হত্যা নিয়েই থাকবে?
যদি থাকতে হয় থাকবো। মনিরা, তুমি কোনদিন আমার কাজে বাধা দিতে এসো না। তাহলে যেটুকু আমাকে পেয়েছে তাও পাবে না।
উহ! এ কথা বলতে তোমার এতটুকু বাঁধলো না। তোমাকে না পাওয়ার ব্যথা যে আমার কাছে মৃত্যুর চেয়েও বেদনার।
মনিরা।
বল?
আর কোনদিন তুমি আমার সন্ধানে যাবে না।
তুমি যদি এসো, কোনোদিন আমি যাবো না।
আসবো, তোমাকে ছেড়ে কি আমি থাকতে পারবো মনিরা?
আচ্ছা বলতো, সেদিন তুমি কি করে আমায় চিনে অমনভাবে আটক করেছিলে?
আমার চোখে শিয়ালের মত ধূর্ত নাথুরাম কোনদিন ধূলো দিতে পারেনি– আর তুমি দেবে? যেদিন তুমি এভাবে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছ, ঐ দিনই আমি সংবাদ পেয়েছি। তুমি একা একা ঘুরে বেড়ালেও আমার লোক সব সময় তোমার পেছনে পেছনে ছায়ার মত ছিল।
এতসব জেনেও তুমি আমাকে এত ভুগিয়েছ?
দেখতে চেয়েছিলাম, কতদূর তুমি সহ্য করতে পারো।
পাষণ্ড কোথাকার।
ইচ্ছা করে তোমাকে ধরা না দিলে কোনদিন তুমি আমার দেখা পেতে না, কাজেই আর কোনদিন তুমি অমন কাজ করবে না।
বেশ, করবো না।
হ্যাঁ, মনে রেখ মনিরা, আমি তোমারই।
মনির। সত্যি আজ আমার কি আনন্দ–মনিরা বনহুরের বুকে মাথা রাখলো।
.
পুলিশ সুপার মিঃ আহমদ হুঙ্কার ছাড়লেন– আমাদের পুলিশমহল কি এতই অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে যে, দস্যু বনহুর তাদের চোখের সামনে লুটতরাজ আর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে যাচ্ছে। আর তার কোনই সুব্যবস্থা হচ্ছে না– এসব কি পুলিশমহলের কলঙ্কের কথা নয়!
পাশাপাশি কয়েকখানা চেয়ারে বসেছিলেন মিঃ জাফরী, মিঃ হোসেন, মিঃ শঙ্কর রাও, মিঃ হারেস, মিঃ হামিদ এবং মিঃ হারুন। সকলের মুখমণ্ডল গম্ভীর ভাবাপন্ন। একটা অস্বস্তির ছাপ যেন। সকলের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে।
মিঃ জাফরীর ললাটে গভীর চিন্তা রেখা। তাঁর জীবনে এই প্রথম পরাজয়। দস্যু বনহুরকে তিনি হাতের মুঠোয় পেয়েও গ্রেফতার করতে সক্ষম হলো না, এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে!
