এমন কত চিন্তাই না মরিয়ম বেগমের মনে ভেসে উঠে আবার মুছে যাচ্ছিল। কিছুতেই ঘুমাতে পারছিলেন না তিনি। দেয়ালঘড়িটা টিকটিক করে বেজে চলেছে। রাত তিনটে হবে।
হঠাৎ একটা শব্দে চমকে ওঠেন মরিয়ম বেগম। দরজায় ঠক ঠক করে একটা আওয়াজ শুনতে পান তিনি।
সজাগ হয়ে বিছানায় উঠে বসেন।
আবার সেই শব্দ– ঠক্ ঠক্ ঠক্। পরক্ষণেই একটা অতি পরিচিত মধুর কণ্ঠস্বর– মা, মাগো, দরজা খোল।
মুহূর্তে মরিয়ম বেগমের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠে, এ-যে তার মনিরের কণ্ঠস্বর। এ কণ্ঠস্বর যে তার অন্তরের কানায় কানায় গাঁথা রয়েছে, এ যে তারই কণ্ঠ।
মরিয়ম বেগম ধড়মড় করে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে আর্তকণ্ঠে বলেন–একি। কি হয়েছে ওর?
তিনি দেখতে পান মনিরের হাতের ওপর ছিন্নলতার মত এলিয়ে রয়েছে মনিরার দেহখানা। বনহুর মনিরার সংজ্ঞাহীন দেহটা নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে তারপর শুইয়ে দেয় বিছানায়।
মরিয়ম বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। দু’চোখে তার অপরাধীর ছাপ ফুটে উঠেছে। কোন কথা বলবার মত সাহস তিনি পাচ্ছেন না।
বনহুর মনিরার সংজ্ঞাহীন দেহটা বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ফিরে তাকায় মায়ের মুখের দিকে।
মরিয়ম বেগম কিছু বলতে গিয়ে থেমে যান।
বনহুর বেশ কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলে–মা, আমি জানি, মনিরা তোমার অমতে এ কাজ করেছে। কিন্তু এটা মোটেই উচিত হয় নি।
ওর কি হয়েছে বাবা?
কিছু না।
এতদিন তুই আসিনি বলেই তো….
আমি তো এ কথা তোমাকে প্রথমেই বলেছিলাম মা! আমার সঙ্গে বিয়ে হলে মনিরা কোনদিন সুখী হতে পারবে না।
মনির!
মা, তুমি জানো না আমার জীবন কত বেদনাময়। কত সময় আমি নিজেকে খুঁজে পাই না, হারিয়ে যাই কোন অজানার মধ্যে। এ বিয়েতে শুধু মনিরাই নয়, তুমিও কোনদিন সুখী হতে পারবে না।
মনির, এসব তুই কি বলছিস? আগে বল, মনিরার অমন অবস্থা কেন? কি হয়েছে ওর?
তুমি ব্যস্ত হচ্ছো কেন মা, তোমার মনিরা ভালই আছে, এখনই ওর জ্ঞান ফিরে আসবে। কিন্তু এভাবে ওর যাওয়া মোটেই ঠিক হয় নি।
কি জানি বাবা, এতসব আমার কপালে ছিল! আমি কত করে বারণ করেছি তবু শুনলো না, বললো কি জানিস আমি যদি তোমার পুত্রবধু হয়ে থাকি তবে যেখানেই থাকি কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। হঠাৎ মনিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন মরিয়ম বেগম– ঐ যে মার আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে।
বনহুর একপাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়েছিল, মনিরাকে চোখ মেলতে দেখে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ায়।
মরিয়ম বেগম ঝুঁকে পড়েন মনিরার মুখের ওপর– মা মনিরা, এখন কেমন লাগছে মা?
মামীমা, আমি বাড়িতে এলাম কি করে। মনিরা উঠে বসতে যায়।
মরিয়ম বেগম ওকে শুইয়ে দিয়ে বললেন– সব জানতে পারবি, এখন শুয়ে থাক বাছা।
না মামীমা, তুমি বলো, আমি কি স্বপ্ন দেখছি?
গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে বনহুর– তোমার জীবনের সবই স্বপ্ন মনিরা, খেয়ালের বশে তুমি সব…………
এতক্ষণ মনিরা বনহুরকে লক্ষ্য করেনি, এবার কি যে এক আনন্দ শিহরণ বয়ে যায় তার শিরায় শিরায়। নিৰ্ণিমেষ নয়নে তাকায় মনিরা ওপাশে দাঁড়ানো বনহুরের দিকে।
মরিয়ম বেগম বললেন– মনিরার জন্য একটু দুধ গরম করে আনিগে।
বেরিয়ে যান তিনি। মনিরা শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়, যদিও মাথাটা তার এখনও ঝিমঝিম করছে তবু উঠে গিয়ে বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে বলল, তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? বলো জবাব দাও?
আমাকে তুমি ভুলে যাও মনিরা।
মনির! একি বলছো তুমি!
প্রথমেই বলেছিলাম, যা করছে তাতে তুমি সুখী হবে না।
কে বললো আমি সুখী নই?
সুখীই যদি হবে তাহলে এভাবে ঘর ছেড়ে….
তা তো তোমারই জন্য। কিন্তু….. কিন্তু আমি এখানে এলাম কি করে। কোথায় সেই রাজ প্রাসাদ, কোথায় সেই নরপিশাচ যে আমাকে…… ও বুঝেছি, তুমি– তুমিই আমাকে ওর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছ। এবার আমি সব বুঝতে পারছি। সত্যি মনির এ যে আমি কল্পনাও করতে পারছি না–
মনিরাকে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে বনহুর– যদি বলি তোমাকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছি।
মনিরার মুখমণ্ডল মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে ওঠে, বনহুরের জামার আস্তিন থেকে হাতখানা খসে আসে ধীরে ধীরে। দৃষ্টি নত করে নেয় মনিরা। নিজকে একটা নগণ্য কীটের চেয়ে হীন বলে মনে হয় তার। একি শুনলো সে। তবে কি সে ঐ নরপিশাচের হাত থেকে পরিত্রাণ পায় নি। ভয়ে শিউরে উঠলো মনিরার হৃদয়, ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার মুখ, একটা ঝড় বইতে শুরু করলো ওর মনে।
বনহুর মনিরার মুখোভাব লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো, তার মনে প্রচণ্ড আলোড়ন শুরু হয়েছে।
বনহুর এগিয়ে এলো মনিরার দিকে, বললো– এমন ভুল আর কোনদিন তুমি করবে না। ধরতে গেল বনহুর মনিরাকে। মনিরা অমনি সরে দাঁড়ালো, তীব্রকণ্ঠে বলে উঠলো “না না, তুমি আমাকে স্পর্শ করো না। সত্যিই যদি আমার এ দেহ কলুষিত হয়ে থাকে আমাকে যদি কোনো পর পুরুষ স্পর্শ করে থাকে, তবে এ জীবন নিয়ে আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না। তোমার পবিত্র দেহ আমি অপবিত্র করতে চাই না। স্পর্শ করো না–করো না আমাকে.– মনিরা ছুটে যায় মুক্ত জানালার দিকে, লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে সে।
বনহুর মনিরার মনোভাব বুঝতে পেরে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে খপ করে ধরে ফেলে ওকে।
মনিরা বলে ওঠে– না না, ছেড়ে দাও আমাকে….. মনিরা জোর করে বনহুরের হাত ছাড়িয়ে নিতে যায়। অমনি নজরে পড়ে বনহুরের হাতের পিঠে একটা ক্ষত তখনও রক্তের দাগ রয়েছে। চমকে ওঠে মনিরা, এ যে তারই দাঁতের কামড়ানোর চিহ্ন। মনিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বনহুরের হাতের ক্ষতটার দিকে।
