মনিরা তৎক্ষণাৎ মরিয়া হয়ে ছুটে গিয়ে দেয়াল থেকে ছোরাখানা তুলে নিল, তারপর রুদ্ধ নিঃশ্বাসে বললো– এবার এসো তুমি আমার কাছে। তোমার রক্ত আমি শুষে নেব এটা দিয়ে।
লোকটার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। কোন কথা বললো না সে। তার হাত থেকে তখন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মনিরার দাঁতের আঘাতে লোকটার হাতে বেশ ক্ষত হয়ে গিয়েছিল।
লোকটা মনিরার দিকে না এগিয়ে বললো– এখনকার মত আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম। যুবতী। আবার আসবো।
মনিরা দাঁতে দাঁত পিষে বললো– এই ছুরি তখন তোমার জবাব দেবে।
বেশ, তাই হবে। লোকটা বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
মনিরা ছুটে আসে দরজার পাশে, ততক্ষণে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
মনিরা কি করবে ভেবে পায় না। আত্মহত্যা করবে কি? হাতের সূতীক্ষ্ণধার ছোরাখানার দিকে তাকায় মনিরা। এখনই লোকটাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যেতে পারে সে। লৌহশিকলেও তখন তাকে কেউ আটকাতে সক্ষম হবে না, বন্ধ ঘরে শুধু পড়ে থাকবে তার প্রাণহীন দেহটা।
অনেকক্ষণ ধরে ভাবলো মনিরা। নিজেকে রক্ষা করার মত কোন পথই সে খুঁজে পেল না। মৃত্যু ছাড়া এখন তার রক্ষা নেই।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল।
মনিরা সচকিতভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, এখনও তার হাতে রয়েছে সেই ছোরাখানা।
সেই রাজাধিরাজ আবার এসেছে। কক্ষের বৈদ্যুতিক আলোতে লোকটার পোশাক ঝকমক করছে।
মনিরার দু’চোখে আগুন ঝরে পড়তে লাগলো। এই তার শেষ মুহূর্ত– হয় লোকটাকে হত্যা করে মুক্ত হবে, নয় নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে এ জীবনের সমাপ্তি ঘটাবে। প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল মনিরা।
লোকটার মুখে এখনও দুষ্টামির হাসি ফুটে রয়েছে। এবার সে মনিরাকে লক্ষ্য করে বললো মনস্থির করেছ? ভিখারিণী, তোমাকে আমি রাজরাণী করবো।
তোমার মত রাজাকে আমি ঘৃণা করি, অর্থের লোভ দেখিয়ে তুমি এভাবে মেয়েদের সর্বনাশ কর।
কি, এতবড় কথা তুমি বললে আমাকে।
লোকটা এবার খপ করে মনিরাকে ধরে ফেললো। মনিরা নিজকে রক্ষার জন্য ছোরাখানা বসিয়ে দিতে গেল লোকটার বুকে।
লোকটা চট করে তার বলিষ্ঠ মুঠায় মনিরার ছোরাসহ হাতখানা ধরে ফেলল। তারপর অতি সহজে মনিরার কোমল হাতের মুঠা থেকে ছোরাখানা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে।
মনিরা আপ্রাণ চেষ্টায় নিজকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো। লোকটা ততক্ষণে মনিরার নাকের ওপর একটা ঔষধ মেশানো রুমাল চেপে ধরলো।
ধীরে ধীরে মনিরা এলিয়ে পড়লো সেই রাজাধিরাজ লোকটার বলিষ্ঠ বাহুর ওপর।
.
মনিরাকে বিদায় না দিয়ে সেদিন উপায় ছিল না মরিয়ম বেগমের। এমন জেদী মেয়ে, যা সে জেদ ধরবে তা করবেই। তা ছাড়া মনিরের জন্য সে যে রকম অস্থির হয়ে পড়েছিল তাতে মরিয়ম বেগম নিজেও অত্যন্ত ভাবাপন্ন হয়েছিলেন। কাজেই মনিরাকে সেদিন তিনি কতকটা বাধ্য হয়েই বিদায় দিয়েছিলেন।
কিন্তু মনিরা চলে যাবার পরই তিনি মনে মনে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। যুবতী মেয়ে, কোথায় যাবে– কোন না কোন বিপদে পড়বে। কোথায় থাকবে, কোথায় কে তাকে আশ্রয় দেবে? তবে ভরসা ছিল মনিরা অশিক্ষিত মেয়ে নয়– জ্ঞান-বুদ্ধি তার বেশ রয়েছে, নিজেকে বাঁচিয়ে চলার মত ক্ষমতা আছে তার। কিন্তু পরক্ষণেই মনটা চঞ্চল হয়ে উঠলো– তবু তো মেয়েছেলে!
বেশ কয়েকদিন যখন কেটে গেল মনিরা ফিরে এলো না, তখন মরিয়ম বেগম বিচলিত হয়ে পড়লেন।
ঘটনাটা তিনি গোপনে সরকার সাহেবকে বলেছিলেন। সরকার সাহেব তো মরিয়ম বেগমের মুখে ব্যাপারটা শুনে হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিছুক্ষণ তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয়নি।
তারপর বলেছিলেন– এ আপনি কি করেছেন বেগম সাহেবা! একটা মেয়েকে আপনি তার খেয়ালের বশে একা যেতে দিয়েছেন। আপনাদের দু’জনেরই কি মাথা খারাপ হয়েছিল? এর বেশি আর কিছু বলেন নি সরকার সাহেব, তিনি তখনই বেরিয়ে পড়েছিলেন মনিরার সন্ধানে।
দুদিন পর ফিরে এসেছিলেন সরকার সাহেব। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিলেন। কোন কথা তার মুখ দিয়ে বের হয় নি।
মরিয়ম বেগম আশঙ্কিত কণ্ঠে বলেছিলেন– কোন খোঁজ পেলেন না?
হতাশ কণ্ঠে বলেছিলেন সরকার সাহেব কোথায় খুঁজে পাবো! একি গরু-ছাগল যে খুঁজে বের করব? রাগে ক্ষোভে সরকার সাহেব অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। না হলে তিনি এতবড় কথাটা মনিব-গৃহিণীর সামনে বলতে পারতেন না।
মরিয়ম বেগমও আর তাকে প্রশ্ন করতে পারেন নি, নিজের ভুল তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। মনিরাকে অমনভাবে ছেড়ে দিয়ে ভুল করেছেন, বুঝতে পারেন মরিয়ম বেগম।
কাজেই নিশ্চুপ থাকা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। মরিয়ম বেগম মুখে যতই চুপ থাকতে চেষ্টা করুন না কেন, অন্তরে অন্তরে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। চোখে তার ঘুম ছিল না? নাওয়া খাওয়ার কোন ঠিক ছিল না। সব সময় মনিরার জন্য চিন্তা করতেন মরিয়ম বেগম।
সেদিন গভীর রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন, না জানি মেয়েটা আজ কোথায় কেমন আছে?
ভালো আছে না কোন বিপদে পড়েছে কে জানে? কে তাকে মনিরার সন্ধান এনে দেবে? মনির– সে তো আজ কতদিন হল আসে না। সেই বা কোথায় আছে কে বলবে। মরিয়ম বেগমের মনে নানা রকম চিন্তা হয়।
একমাত্র সন্তান মনির যখন ছয়-সাত বছর বয়সে ছিল তখনই মরিয়ম বেগম বুঝতে পেরেছিলেন আর কোন সন্তান তাদের হবে না। মনিরই তাদের বংশের একমাত্র সম্বল। ওকে নিয়েই মরিয়ম বেগম এবং চৌধুরী সাহেব কত আকাশকুসুম স্বপ্ন রচনা করেছিলেন। কত আশা, কত বাসনা উঁকি দিয়ে যেত সেদিন ঐ দুটি প্রাণে। পুত্রকে মানুষ করবেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন, দশ জনের মধ্যে সে যেন একজন হতে পারে, এমনিভাবে গড়ে তুলবেন পুত্রকে। কিন্তু সব আশা তাদের ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র সন্তান, নয়নের মনি, হৃদয়ের ধন মনিরকে তারা নদীবক্ষে বিসর্জন দিয়েছিলেন।
