সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে সবাই। কেউ ভাঙা থালা, কেউ বাটি, কেউ কলার পাতা হাতে নিয়ে প্রতীক্ষা করছে খাবারের।
মনিরার থালা নেই, কলার পাতাও সে সংগ্রহ করতে পারেনি। লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে ঘোমটায় মুখ ঢেকে হাত পেতে দাঁড়ায় সে।
ওদিক থেকে দু’জন লোক খাবার দিয়ে যাচ্ছে। সবাই সারিবদ্ধভাবে খাবার নিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে একজন তাদের হাতে কিছু কিছু পয়সা তুলে দিচ্ছে।
মনিরার শুধু হাতে খাবার দিতে গিয়ে বলে ওঠে একজন–কিগো, কিসে খাবার নেবে –হাতে দেব?
মনিরা নিশ্চুপ। হাতে খাবার কি করে নেবে। তাই হাত গুটিয়ে নেয়।
লোক দুটি মনিরাকে লক্ষ্য করে বলে ওদিকে যাও, পয়সা পাবে।
মনিরা রিক্তহস্তে অন্যদের সংগে এগিয়ে গেল।
সবাইকে পয়সা দেওয়া হচ্ছে।
মনিরাও হাত পাতলো।
সঙ্গে সঙ্গে কে একজন বললো–এ মেয়েটি খাবার পায় নি, একে খেতে দাও।
মনিরা চোখ তুলে তাকালো, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় খুব কাতর হয়ে পড়েছিল মনিরা কাজেই সে অমত করতে পারলো না।
একটা লোক মনিরাকে লক্ষ্য করে বলল–এদিকে এসো, খাবার দিচ্ছি।
মনিরা কোনরূপ দ্বিধা না করে লোকটাকে অনুসরণ করলো।
যে কক্ষে মনিরা লোকটার সঙ্গে প্রবেশ করলো সেটা একটা মাঝারি রকমের খাবার ঘর। টেবিলে নানা রকমের খাদ্যদ্রব্য থরে থরে সাজানো। মনিরা কতদিন এমন খাবার খায়নি।
লোকটার ইংগিতে মনিরা একটা টেবিলের পাশে এসে বসলো। খানসামা গোছের লোক একটা প্লেটে অনেক রকম খাবার এনে মনিরার সম্মুখে রাখলো।
লোকটা মনিরাকে বললো–খাও।
মনিরা যদিও মনে মনে অবাক না হয়ে পারলো না, তবু ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিল বলে গোগ্রাসে খেতে শুরু করলো।
খাওয়া শেষ করে মনিরা উঠে দাঁড়ালো। তাকালো কক্ষের চারদিকে। এতক্ষণে সে যেন অনেকটা সুস্থ বোধ করছে। কিন্তু একি! মনিরা চমকে উঠলো-দরজা বন্ধ কেন? আর ঐ লোকটা গেল কোথায়?
মনিরা এতক্ষণ খাবার খেয়ালে ছিল, কোনদিকে লক্ষ্য করে নি। ঘরে কাউকে না দেখে ভীত হয়ে পড়লো। হঠাৎ এমন করে এখানে আসা তার ঠিক হয় নি। এবার বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই কোন দুষ্টলোক তাকে কায়দায় আটক করেছে। এখন উপায়?
মনিরা অস্থিরচিত্তে জোরে জোরে কক্ষের দরজায় আঘাত করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পূর্বের সুস্বাদু খাবারগুলো এখন তার কাছে বিষাক্ত বলে মনে হতে লাগলো।
অনেক চেষ্টা করেও মনিরা দরজা খুলতে সক্ষম হলো না। হতাশ মনে সে চুল ছিঁড়ে। হাতের মাংস কামড়ে রক্ত বের করে ফেললো।
হঠাৎ পেছনে পদশব্দ শুনতে পেয়ে চমকে ফিরে তাকালো।
সেই লোকটা দাঁড়িয়ে দেখতে পেল মনিরা, যে লোকটা তাকে প্রথম খাবার দিতে বলেছিল।
মনিরা রাগত কণ্ঠে বলে ওঠে– আমাকে তোমরা আটক করেছে কেন? আমি ভিখারী মেয়ে, আমাকে ছেড়ে দাও।
লোকটা মৃদু হাসলো, বললো–তোমাকে আর যেন ভিক্ষে না করতে হয় তার ব্যবস্থা করবেন আমাদের মনিব।
কেন আমি তার দয়া নেব?
আমাদের মনিবের তোমার ওপর খুব দরদ।
মনিরা ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলো। নিশ্চয়ই কোন কুমতলব এঁটেছে এরা। বললো তোমার মনিবের দরদ চাই না। আমাকে ছেড়ে দাও, আমি চলে যাই।
এসো আমার সঙ্গে। লোকটা বললো।
মনিরা মনে মনে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। এমন যে একটা বিপদে পড়ে যাবে ভাবতে পারেনি সে। তবু এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বিপদ আরও বাড়ানোর চেয়ে লোকটার সাথে যাওয়া ভাল মনে করলো।
সে লোকটার সঙ্গে এগুলো।
কয়েকটা কক্ষের মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটা দরজা পেরিয়ে মনিরাকে সঙ্গে করে লোকটা এখন সুসজ্জিত কক্ষে প্রবেশ করলো।
মূল্যবান আসবাবপত্রের কক্ষটা সুন্দর করে সাজানো। লোকটা বললো– তুমি এখানে অপেক্ষা করো। আমার মনিব এক্ষুণি আসবেন।
মনিরা অস্থিরকণ্ঠে বললো– না না, আমি তোমার মনিবের সঙ্গে দেখা করতে চাই না, আমি তোমার মনিবের সঙ্গে দেখা করতে চাই না, আমাকে যেতে দাও–
মনিরার কথা শেষ হয় না, একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতে পায় সে চমকে ওঠে মনিরা, তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। চোখ তুলে তাকাতেই দু’চোখ তার ছানাবড়া হয়। একটা অর্ধবয়স্ক লোক, শরীরে তার মূল্যবান রাজ-রাজার পোশাক, মাথার চুলে পাক ধরেছে, দুটো গোঁফ ঝুলে আছে নাকের দু’পাশে, গলায় মূল্যবান মুক্তার হার। মুখে মৃদু হাসি। মনিরার দিকে এগুচ্ছে সে। ভয়ে মনিরা পিছু হটে। ফিরে তাকায় মনিরা পূর্বের সেই লোকটা উধাও হয়েছে। বুক ধক্ ধ করতে শুরু করে।
লোকটা এগিয়ে আসছে তার দিকে।
মনিরা নিরুপায়ের মত তাকায় কক্ষের চারদিকে। এতটুকু ভরসা সে পায় না নিজকে রক্ষা করার। মনে মনে খোদাকে স্মরণ করে সে।
হঠাৎ তার নজরে পড়ে, ওদিকে দেয়ালে একটা সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা টাঙানো রয়েছে। মনিরার মনে কিঞ্চিৎ ভরসা হয়। কোনরকমে ঐ ছোরাখানার নিকটে পৌঁছতে পারলে সে একবার দেখে নিত। হয় ওর প্রাণ নেবে, নয় নিজের জীবন বিসর্জন দেবে মনিরা। কেউ জানবে না কোথায় হারিয়ে গেছে সে।
লোকটা যতই এগুচ্ছে মনিরা ততই পিছু হটছে, একটু একটু করে সরে যাচ্ছে সে ওদিকে দেয়ালের দিকে।
লোকটা মনিরাকে ধরতে গেলে। অমনি মনিরা পিছু হটতে গিয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
লোকটা এবার ধরে ফেলল মনিরাকে, আকর্ষণ করলো নিজের দিকে।
মনিরা খুব জোরে লোকটার হাত কামড়ে দিল।
অসহ্য যন্ত্রণায় লোকটা অস্ফুট শব্দ করে উঠলো। ছেড়ে দিল ওকে।
