দুঃখ-ব্যথায় মুষড়ে পড়লো মনিরা। সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন প্রতীক্ষা করছিল, সে দস্যু বনহুরের– এবার নিশ্চয়ই সে সংযত হবে, সভ্য হবে সে কিন্তু মনিরার সমস্ত আশা বাসনা ধুলিসাৎ হয়ে গেল। দস্যু বনহুরের সাক্ষাৎলাভ তার ভাগ্যে জুটলো না।
সমস্ত রাত মনিরা বিছানায় শুয়ে ছটফট করে। অসহ্য একটা ব্যথা তার মনকে নিষ্পেষিত করে। চোখের পানিতে বালিশ সিক্ত হয়।
একটু শব্দ হলেই চমকে উঠে ছুটে যায় জানালার পাশে, ঐ বুঝি এলো সে।
কিন্তু সব আশা বিফল হয়, শূন্য অন্ধকারে তাকিয়ে চিত্রার্পিতের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
রাত ভোর হয়ে আসে, শয্যায় লুটিয়ে পড়ে মনিরা। এতদিন ওকে ভালবাসতো–সে ভালবাসা ছিল প্রাণহীন। এখন বনহুর তার স্বামী তার সর্বস্ব।
হাহাকার করে ওঠে মনিরার হৃদয়। দিন যায়, আবার রাত আসে। রাত শেষ হয়, আবার দিন আসে। মনিরা বনহুরের প্রতীক্ষায় কেঁদে কেঁদে সারা হয়।
মরিয়ম বেগম সব বুঝেন। তিনি মনিরার হৃদয়ের ব্যথা অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করেন– কিন্তু কি করবেন, কোনরূপ সান্ত্বনাই তিনি দিতে পারেন না মনিরাকে। স্ত্রীর স্বামীই যে সব। স্বামী ছাড়া নারী জীবন ব্যর্থ। এ কথা তার নারী মনে সদা-সর্বদা জাগরিত রয়েছে।
মনিরার চোখের পানি মরিয়ম বেগমের মনের শান্তি কেড়ে নিল। পুত্রের চিন্তায় তিনি যতটুকু বিচলিত না হয়েছেন তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হলেন মনিরার জন্য।
তিনি ভেবেছিলেন, মনিরার বিয়ে হলে তিনি নিশ্চিন্ত হবেন। হয়তো তাঁর মনির ভাল হবে, দস্যুতা ছেড়ে দেবে। কিন্তু সব আশা-আকাঙ্খা তাঁর সমূলে মুছে গেল বরং আর একটা চিন্তা তাঁকে অস্থির করে তুললো। এ তিনি কি করলেন। কেন তিনি না ভেবেচিন্তে মনিরের হাতে মনিরাকে সঁপে দিলেন। অন্য কোন সুপাত্রের কাছে মনিরার বিয়ে দিলে সুখী হত, সে সব সময় স্বামীকে পাশে পেত-এর চেয়ে আনন্দ আর কি আছে।
একদিন মনিরাকে কাছে নিয়ে বললেন মরিয়ম বেগম–মা মনিরা, একি হলো। একি করলাম আমি। ভাল ভেবে তোকে আমি ওর হাতে তুলে দিলাম, কে জানতো সে তোকে ভুলে যাবে আমি ওকে অভিশাপ দেবো…
না না, ও কথা তুমি মুখে এনো না মামীমা। আমি সব ব্যথা সইতে পারবো কিন্তু ওর অমঙ্গল সইতে পারবো না। সইতে পারবো না মামীমা।
রুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন মরিয়ম বেগম– নরাধম তোকে এমনি করে কাঁদাবে?
এ কাঁদায় তবু আনন্দ আছে মামীমা। আমি যদি সত্যিই তার স্ত্রী হয়ে থাকি, নিশ্চয়ই সে একদিন না একদিন আসবে।
মনিরার এত আশা, এত স্বপ্ন সফল হলো না। বনহুর নিজকে নিয়েই মেতে রয়েছে, কোন কথা ভাবার সময় নেই। পুলিশ বাহিনীর শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে নিজের কাজ সমাধা করে চললো সে।
মনিরা ঘরে বসে পত্রিকা পড়ে জানতে পারল সব।
একদিন রাতে মনিরা মামীমার কক্ষে গিয়ে হাজির হলো, বললো সে– মামীমা, আমাকে অনুমতি দাও। ওকে একবার দেখে আসি।
অবাক কণ্ঠে বললেন মরিয়ম বেগম–পাগলী মেয়ে–এও কি সম্ভব। যার সন্ধানে শত শত পুলিশবাহিনী অহরহ সন্ধান চালিয়েও কোন হদিস পাচ্ছে না, আর তুই তাকে খুঁজে বের করতে পারবি?
পারবো, আমি পারবো তাকে খুঁজে বের করতে। তুমি শুধু অনুমতি দাও মামীমা।
তবে সরকার সাহেবকে নিয়ে যা।
না, আমি একাই যাব।
সেকি মা!
ভয় করো না। তোমার পুত্রবধু যদি হয়ে থাকি তবে কেউ আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
.
দীন-দুঃখী গরিবদের মধ্যে মনিরাও এসে দাঁড়ালো। শরীরে তার ছিন্ন বসন। চুলগুলো রুক্ষ, গায়ে-পায়ে ময়লা জমে রয়েছে। তাকে দেখলে কেউ চিনতেই পারবে না এই সেই মনিরা।
আজ কতদিন হলো মনিরা গৃহত্যাগ করে দস্যু বনহুরের সন্ধানে বেরিয়েছে। পথে-ঘাটে, মাঠে শহরে-গ্রামে কত জায়গাই না খুঁজেছে সে বনহুরকে। রাতের পর রাত ধনীদের বাড়ির আশে পাশে ধর্ণা দিয়েছে,যদি সে দস্যুতা করতে আসে। গরিব-ধনী-দুঃখীদের মধ্যেও দিন কাটিয়েছে। যদি সে দান করতে আসে। আশায় আশায় পথে পথে ফিরছে মনিরা একটিবার তার দেখা যদি পায়। কিন্তু সব আশা, সব বাসনা মুছে গেল, দেখা পেল না তার জীবন সাথীর।
সেদিন হঠাৎ শুনলো পাশের গ্রামে একটা ভোজসভা হবে। সেখানে শুধু গরিবদের খাওয়ানো হবে। খাওয়া শেষে সেখানকার জমিদারপুত্র গরিবদের মধ্যে টাকা-পয়সা দান করবেন।
আজ দু’দিন অনাহারে অনিদ্রায় মনিরা একেবারে ভেঙে পড়ার মত হয়েছে? পয়সা-কড়ি যা সংগে এনেছিল সব শেষ হয়ে গেছে। কজেই মনিরার দু’দিন সম্পূর্ণ অনাহারে কাটছে। দুঃখ সইবার মত ক্ষমতা তার আছে, কিন্তু এত কষ্ট কোনদিন সে পায় নি। অনাহার কাকে বলে জানে না মনিরা। চাইবার অভ্যাস তার কোন কালেই নেই। ছোটবেলা হতেই সে রাজকন্যার মত সুখে। স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ হয়েছে। হঠাৎ এই অবস্থার জন্য মোটেই সে প্রস্তুত ছিল না। ভেবেছিল মনিরা, ওকে খুঁজে বের করা তার পক্ষে কঠিন হবে না এবং বেশিদিনও লাগবে না। কিন্তু সব আশা তার। বিফল হয়েছে।
আজ কদিন ঘুরে ঘুরে মনিরা হতাশায় ভেঙে পড়লো। আর যখন তার চলার মত শক্তি নেই তখন জানতে পারলো, পাশের গ্রামে একটা ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। ক্ষুধায় এত কাতর হয়ে পড়েছিল যে কিছু ভাববার সময় তার নেই। দীন-দুঃখীদের মধ্যে সেও গিয়ে দাঁড়ালো ভোজসভায়।
