না না মায়া, ও শয়তান নয়, শয়তান নয়–দেবতা। আমাকে ও-ই রক্ষা করেছে, সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আমার চোখ নেই, তাই ওকে দেখতে পাচ্ছিনে, বলতো ও কেমন দেখতে? ওকে একটিবার দেখতে আমার বড় ইচ্ছা হচ্ছে।
কারও মুখে কথা নেই, মোহন্ত সেন বলেই চলেন, জানো মায়া কে আমাকে পাহাড়পুর দুর্গে বন্দী করে রেখেছিল, জানো তোমরা? আজ কে আমাকে হত্যা করতে নিয়েছিল তাও জানো না। আমারই ছোট ভাই যতীন্দ্র। যতীন্দ্রই আমাকে হত্যার জন্য লোক নিযুক্ত করেছিল, কিন্তু ভগবান আমার সহায়, তাই বেঁচে গেছি।
যতীন্দ্র সেনের মুখ ছাইয়ের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বারবার দরজায় দণ্ডায়মান মূর্তির। হাতের রিভলভারের দিকে তাকাচ্ছে, যম দূতের মতোই মনে হচ্ছে তার কাছে মূর্তিটাকে।
মায়ারাণী যতীন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন– ঠাকুরপো, এসব সত্যি?
ঢোক গিলে বলে যতীন্দ্র সেন– না না, তুমি ওসব বিশ্বাস করো না। সব মিথ্যা …
কি বললে? ছায়ামূর্তি গর্জে উঠলো। চমকে উঠলেন মায়ারাণী, বাসবী ও যতীন্দ্র। কি গম্ভীর ব্যক্তিত্বপূর্ণ গলা।
মোহন্ত সেন বলে ওঠেন–এবারের মত ওকে ক্ষমা করে দাও বন্ধু।
ক্ষমা! যম কখনও ক্ষমা করে না।
যতীন্দ্র সেন এবার ছায়ামূর্তিকে লক্ষ্য করে বলে ওঠে-কে আপনি? কি দোষে আমাকে….
তোমার দোষের পুনরাবৃত্তি করতে আমি রাজি নই। বড় ভাইকে হত্যার দায়ে আমি তোমাকে হত্যা করব। জমকালো মূর্তি এগিয়ে এলো যতীন্দ্র সেনের দিকে।
দাদাকে আমি তো হত্যা করতে চাইনি?
আবার মিথ্যা কথা। শয়তান, এক্ষুণি আমি তোমার মিথ্যা বলার শাস্তি দিচ্ছি—গর্জে ওঠে জমকালো মূর্তির রিভলভার।
একটা তীব্র আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় যতীন্দ্র সেন।
মোহন্ত সেন বেদনার্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন–একি করলে বন্ধু। একি করলে…
বাসবী স্থির নয়নে তাকালো ছায়ামূর্তির মুখের দিকে। একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়লো তার দৃষ্টিতে, কোন কথা বের হলো না তার কণ্ঠ দিয়ে।
জমকালো মূর্তি শুধু একটা কথা উচ্চারণ করলো–শয়তানের সাজা দিয়েছি। তারপর বেরিয়ে গেল সে।
রিভলভারের গুলীর শব্দে লোকজন ছুটে এলো, সবাই যতীন্দ্র সেনের রক্তাক্ত মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে হায় হায় করতে লাগলো। সবাই মোহন্ত সেনকে দেখতে পেয়ে আশ্চর্যও হলো। একবাক্যে বলল সবাই– যতীন্দ্র সেনকে অন্ধ রাজা মোহন্ত সেনই হত্যা করেছেন।
পুলিশসহ দারোগা এলেন। লাশ এবং সমস্ত কক্ষ তল্লাশি করে দেখতে লাগলেন।
পুলিশ সাব ইন্সপেক্টর মিঃ হোসেন কক্ষ তল্লাশি করার সময় হঠাৎ তার নজরে পড়ে গেলো যতীন্দ্র সেনের লাশের পাশে রক্তের মধ্যে পড়ে রয়েছে একখানা ভাঁজকরা কাগজ।
মিঃ হোসেন কাগজখানা তুলে নিয়ে পড়ে দেখলেন– একি, এ যে দস্যু বনহুরের চিঠি!
সবাই দেখলো কাগজখানায় লেখা রয়েছে,
‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত’ –দস্যু বনহুর
এতক্ষণে সকলের কাছে ব্যাপারটা খোলসা হয়ে গেল। অন্ধ রাজা মোহন্ত সেনকে প্রজাগণ শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস করতো। যতীন্দ্র সেনের নিহত হওয়ার ব্যাপার নিয়ে সকলের মনেই যে একটা বিস্ময়কর প্রশ্নের উদয় হয়েছিল, সেটা এক্ষণে সমূলে দূরীভূত হল।
একবাক্যে বললো সবাই আমাদের রাজা কোনদিন এমন কাজ করতে পারেন না।
দস্যু বনহুরেরই এ কাজ। প্রজাগণ মুখে কিছু না বললেও মনে মনে জানে, যতীন্দ্র সেন অত্যন্ত দুষ্ট এবং কুচক্রী ছিল। দস্যু বনহুর তাকে হত্যা করে ভালোই করেছে।
মিঃ হোসেন যতীন্দ্র সেনের বাড়ি তল্লাশি করে আরও দেখলেন যতীন্দ্র সেনের লোহার সিন্দুক শূন্য পড়ে আছে। টাকা-পয়সা-অলঙ্কার সব উধাও হয়েছে। এও যে দস্যু বনহুরের কাজ তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মিঃ হোসেন লাশ চালান দিয়ে নিজেও রওয়ানা হলেন। পুলিশ মহলে একেই দস্যু বনহুর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার ওপর পর পর দুটি খুন– চাঁদপুরের জমিদার হত্যা আর যতীন্দ্র সেনের নিহত হওয়ার ব্যাপার নিয়ে এক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো!
এত পাহারা, এত সাবধানতা সত্ত্বেও দস্যু বনহুর তার কাজ যথাযথ সমাধা করে চলেছে। পুলিশবাহিনী কোন সমাধানই করতে সক্ষম হচ্ছে না।
মিঃ জাফরী এবং পুলিশমহল দস্যু বনহুরের জন্য ভীষণ আশঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
পর পর দুইটি হত্যার ব্যাপারে জোর তদন্ত শুরু হল।
.
দস্যু বনহুর যতীন্দ্র সেনের সিন্দুক থেকে লুণ্ঠিত টাকা-পয়সা-অলঙ্কার নিয়ে এসে দীনহীন, গরিব-দুঃখীদের বিলিয়ে দিতে লাগলো। যাদের খাবার নেই তাদের অন্নের সংস্থান করলো। যাদের পরিধেয় বস্ত্র নেই, তাদের বস্ত্র দিল। দস্যু বনহুর উন্মত্ত নেশায় মেতে উঠলো। ধনীদের ধনরত্ন কেড়ে নিয়ে বিলিয়ে দিতে লাগলো অনাথদের মধ্যে।
ধনীরা যেমন দস্যু বনহুরের ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠতে লাগলো, তেমনি দুঃখীগণ দস্যু বনহুরের নামে হৃদয়ে অনাবিল এক আনন্দ উপভোগ করতে লাগলো।
দস্যু বনহুর মেতে রইল তার খেয়াল নিয়ে। লুণ্ঠিত দ্রব্য দীন-দুঃখীদের বিলিয়ে যা বেচে যেত, সব ছুঁড়ে ফেলে দিত সে নদীর জলে।
ওদিকে চৌধুরীবাড়িতে মনিরা ঝি-এর বেশে দু’দিনের বেশি আত্মগোপন করে থাকতে পারলো না। ধরা পড়ে গেলো সে মামীমার কাছে। অতি সাবধানে নিজকে বাঁচিয়ে চলাফেরা করতে লাগলো মনিরা। বড় চাচার আশঙ্কায় সদাসর্বদা চিন্তিত থাকত। কিন্তু তার নিজের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন থাকতো মনিরা দস্যু বনহুরের জন্য। পত্রিকায় দস্যু বনহুর সম্বন্ধে সবকিছুই জানতে পেরেছিল সে। বনহুর যে দিনের পর দিন নরহত্যা লুটতরাজ নিয়ে মেতে রয়েছে,এ খবর সে পত্রিকা মারফতেই পেল।
