গম্ভীর কণ্ঠে একটা শব্দ করলো বনহুর–হুঁ!
ভুলু সিং তখনও বলে চলেছে–সর্দার, আজ রাতেই মোহন্ত সেনকে হত্যা করা হবে, সে কথাও আমি নিজ কানে শুনেছি।
বনহুর রহমানকে লক্ষ্য করে বলে, রহমান তাজকে প্রস্তুত রেখ। তোমরাও প্রস্তুত থেক। মোহন্ত সেনকে উদ্ধার আর যতীন্দ্র সেনের যথাসর্বস্ব লুট–হাঃ হাঃ হাঃ। দাঁতে দাঁত পিষে বলে সে– দস্যু বনহুর রাজাকে ফকির, ফকিরকে রাজা বানাতে পারে। খোদার নাম স্মরণ করে তোমরা তৈরি হয়ে নাও। যাও রহমান।
.
গভীর রাত।
যতীন্দ্র সেন শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়। কক্ষে পায়চারী করে সে, নির্জন কক্ষে তার নিজের পদশব্দে চমকে ওঠে বারবার, থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকায় নাঃ কই, কেউ নেই তো। গোটা মুখমণ্ডল তার ইস্পাতের মত কঠিন হয়ে উঠেছে। দুচোখে হিংস্র শার্দুলের অগ্নিক্ষুধা। ভাই হয়ে ভাইয়ের বুকের রক্ত শুষে নেবার জন্য উন্মত্ত সে। তার গোপন অনুচরগণ এতক্ষণে হয়তো পাহাড়পুর দুর্গে পৌঁছে গেছে। হয়তো বা মোহন্ত সেনের বুকে ছোরা বসিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলেছে। আজ হতে সে একাই এ রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি। আর কেউ তাকে কোন কাজে বাধা দেবে না। এবার তার বৃদ্ধা বৌদি আর ভাতিজী বাসবী–ওদের সরাতে আর কতক্ষণ।
পাশের ঘরে মোহন্ত সেনের নিদ্রাহীন স্ত্রী মায়াদেবী আর বাসবী ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আজ প্রায় এক মাস হয়ে চললো মোহন্ত সেনকে ফুসলিয়ে মিথ্যা কথা বলে রাজ্যের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল যতীন্দ্র সেন। তারপর যতীন্দ্র সেন একাই ফিরে এসেছিল, বৌদি আর বাসবীকে বলেছিল, দাদা তার এক বন্ধুর বাড়িতে থেকে গেলেন। কয়েক দিন পর আসবেন।
কিন্তু দিনের পর দিন যেতে লাগলো। সপ্তাহ গিয়ে মাস হলো তবু ফিরে এলেন না মোহন্ত সেন। যে লোকটার পাশে মায়ারাণী কিংবা বাসবী এক মুহূর্ত না থাকলে নয়, সেই অসহায় অন্ধলোক কি করে এতদিন বাইরে কাটাচ্ছেন। মায়ারাণী আর বাসবী ভেবে অস্থির হয়ে পড়েছেন। আজকাল যতীন্দ্র সেন বেশ দুর্ব্যবহার শুরু করেছে তাদের সঙ্গে।
মায়ারাণী আর বাসবী যতীন্দ্র সেনের কথাবার্তা ও আচরণে অত্যন্ত আশঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কেমন যেন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা বলে যতীন্দ্র সেন। সন্দেহের ছোঁয়া লাগে মায়ারাণী আর বাসবীর মনে। ভাবে নিশ্চয়ই মোহন্ত সেনের কোন অমঙ্গল ঘটেছে। মায়ারাণী আর বাসবী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সব সময় কাঁদেন ওরা দু’জন। মায়ারাণী কাঁদেন সান্ত্বনা দেয় বাসবী কেঁদোনা মা। তুমিই তো বলো, অসহায়ের সহায় একমাত্র ঈশ্বর। ঈশ্বর আমার বাবাকে রক্ষা করবেন।
মাতা-কন্যা যখন পাশের ঘরে কান্নাকাটি করছেন, ঠিক সেই সময় যতীন্দ্র সেন ঐ কক্ষে প্রবেশ করে।
চমকে ওঠেন মায়ারাণী আর বাসবী।
যতীন্দ্র সেন কর্কশ কঠিন স্বরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে–এখনও তোমরা জেগে আছ?
মায়ারাণী যতীন্দ্র সেনের পা দু’খানা চেপে ধরেন ঠাকুরপো, বলো বলো ঠাকুরপো, তোমার দাদা কোথায়? তুমি তাকে কোথায় রেখেছ?
ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি হেসে বলে যতীন্দ্র সেন–অপেক্ষা কর, একটু পরই জানতে পারবে।
মায়ারাণী যতীন্দ্র সেনের কথায় আতঙ্কে শিউরে ওঠেন। বলেন তিনি–তুমি না বলেছিলে, তোমার দাদা তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেছেন?
যা মনে কর তাই।
না, তোমার কথায় আমার ভয় হচ্ছে যতীন্দ্র। তাঁর কোনো বিপদ ঘটেনি তো? মায়ারাণী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন।
বাসবী এতক্ষণ নিশ্চুপ সব শুনে যাচ্ছিল। সে উচ্চশিক্ষিত জ্ঞানবতী মেয়ে। বুঝতে পারে, তার অন্ধ পিতাকে এই শয়তান কোনো ভয়ঙ্কর অবস্থায় ফেলেছে। আর কোনোদিন তার পিতাকে ফিরে পাবে কিনা, কে জানে! বাসবী নিজকে কঠিন করে নিয়ে বলে–মাগো, তুমি কেন এত বিচলিত হচ্ছে। ন্যায় কোনদিন ধ্বংস হতে পারে না–আর অন্যায় কোনদিন জয়ী হতে পারে না।
ঠিক বলেছিস মা, ঠিক বলেছিস–
মোহন্ত সেনের কণ্ঠস্বরে একসংগে কক্ষের সবাই চমকে ওঠে। ফিরে তাকায় সকলে। কক্ষের উজ্জল আলোতে তারা দেখতে পায় দরজায় দাঁড়িয়ে মোহন্ত সেন, তার পেছনে উদ্যত রিভলভার হাতে একটা জমকালো মূর্তি।
আনন্দে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান মায়ারাণী ও বাসবী, এ কি তারা স্বপ্ন দেখছেন না সত্য ভেবে পান না।
যতীন্দ্র সেনের দু’চোখে ভয় ও বিস্ময়। মোহন্ত সেনকে জীবিত এবং তার পেছনে জমকালো মূর্তিকে লক্ষ্য করে হকচকিয়ে যায় সে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে–এ কি করে সম্ভব। হলো? তার গুপ্ত অনুচর রাঘব আর নন্দীর হাত থেকে কি করে রেহাই পেয়েছে মোহন্ত সেন? সে বুঝতে পারে, জমকালো মূর্তি যেই হউক সে–ই যে মোহন্ত সেনকে উদ্ধার করে এনেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবার পালাবার পথ খুঁজে যতীন্দ্র সেন। কিন্তু জমকালো মূর্তির হাতের উদ্যত রিভলবার লক্ষ্য করে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
অন্ধ রাজা মোহন্ত সেন দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসেন– মা বাসবী, তোরা কোথায়? কোথায় তোরা?
বাসবী পিতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই যে বাবা। এতদিন তুমি কোথায় ছিলে? বাসবী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে একবার তাকালো দরজার মুখে দণ্ডায়মান জমকালো মূর্তিটার দিকে।
মায়ারাণীও এবার ভয়ার্তভাবে তাকালেন জমকালো মূর্তির দিকে। কম্পিত কণ্ঠে বললেন– ঐ শয়তানটাই বুঝি তোমাকে আটক করে রেখেছিল।
