না, আগে বল কেন তুমি হাসলে?
সব কথাই কি তোমার জানা উচিত নূরী?
হুর, আজও আমি তোমার মনের সন্ধান পেলাম না, এ দুঃখ আমার মরলেও যাবে না।
নূরী, এত অবুঝ তুমি।
আমি নই তুমি। একটা নারীর ব্যথা তুমি বুঝ না। নারীর অশ্রু তুমি এত ভালবাস?
হয়তো তাই।
আমি জানি, যে তোমাকে ভালবেসেছে সে–ই কেঁদেছে। জীবনভর কেঁদেছে। কত পাষণ্ড তুমি!
সে কি আমার অপরাধ?
হুর, তুমি কাউকেই কি ধরা দেবে না?
বড্ড ছেলেমানুষ তুমি, দস্যু বনহুরকে যে ভালবাসবে সেই ভুল করবে। দস্যু সে তো মানুষ নামে কলঙ্ক।
না না, তোমাকে আমি কোনদিন ছোট মনে করতে পারবো না। কে বলে, তুমি মানুষ নামে কলঙ্ক– তুমি ফেরেশতা।
বনহুর নূরীর অশ্রুসিক্ত মুখখানা তুলে ধরে। নিজের রুমালে নূরীর চোখ দুটো মুছে দিয়ে বলে–একটা কথা তোমাকে বলবো।
নূরী বনহুরের মুখে হাতচাপা দিলে বলল–না, কোন কথা আমি শুনবো না।
তবে থাক।
আমি চাই শুধু তোমাকে। আর কিছুই চাই না।
আমাকে তুমি মাফ কর নূরী।
না না, আমি তোমার কোন কথা শুনবো না। দুনিয়া ভেসে যাক, আমি কোনদিকে তাকাবো, শুধু তুমি আমার হবে।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে পায়চারী শুরু করে। মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে আসে। ললাটে ফুটে ওঠে গভীর চিন্তারেখা।
নূরী বনহুরের মুখোভাব লক্ষ্য করে ব্যথায় মুষড়ে পড়ে। বুঝতে পারে, বনহুরের মনে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। আজ নতুন নয়, নূরী আরও বহুদিন বনহুরের এমনি ভাব লক্ষ্য করেছে। যখনই সে বনহুরকে নিবিড় করে পেতে চেয়েছে তখনই যে আনমনা হয়ে পড়েছে, নয় তো চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তার কাছ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে তখন নূরী।
আজ নূরী চলে যায় না, স্থিরকণ্ঠে বলে–হুর, আমি জানি, তুমি আমাকে গ্রহণ করতে রাজি নও; কিন্তু মনে রেখ, আমিও তোমায় ছাড়ছি না, আমাকে তোমার বিয়ে করতে হবে….
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বনহুর, বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে ওঠে– বিয়ে!
হ্যাঁ, চমকে উঠলে কেন? ওকি। তোমার মুখ অমন কালো হয়ে উঠলো কেন? বিয়ে তো পবিত্র বাঁধন।
বনহুরের চোখের সামনে ভেসে উঠলো আর একখানা মুখ। চন্দনের তিলক আঁকা নববধুর বেশে সামনে এসে দাঁড়ালো যেন মনিরা, নূরীর রূপ মুছে গিয়ে মনিরার রূপ ধরা দিল বনহুরের চোখে।
বনহুর নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইলো নূরীর দিকে। বিয়ে–এই শব্দটাই সেদিন সে মায়ের মুখে শুনেছে। বিয়ে! দস্যুর আবার বিয়ে। নিছক একটা মিথ্যা অভিনয় হেসেছিল সেদিন বনহুর। আজ আবার নূরীর মুখে সেই ‘বিয়ে’ শব্দটা বনহুরকে কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেললো। নূরীর রূপ মুছে গিয়ে মনিরা ভেসে উঠলো তাঁর চোখে।
বনহুর দেখলো, করুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে মনিরা। দু’ চোখে তার অশ্রু, ব্যথার ছোঁয়া ফুটে উঠেছে চেহারায়। বনহুর আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না। দু’হাত প্রসারিত করে। দিল নূরীর দিকে।
নূরী চোখে অশ্রু মুখে হাসি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বনহুরের বুকে।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নিল।
নূরী ভুলে গেল সমস্ত ব্যথা বেদনা। বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল– হুর, আমি জানি তুমি আমায় কত ভালবাস।
এমন সময়ে দরজার বাইরে পদশব্দ শোনা যায়।
পরক্ষণেই ভেসে আসে একটা কণ্ঠস্বর–সর্দার।
বনহুর নূরীকে মুক্ত করে দিয়ে নিজের শয্যায় গিয়ে বসে।
নূরী বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
বনহুর বলে–এসো মাহবুব।
মাহবুব কক্ষে প্রবেশ করে। কুর্ণিশ জানিয়ে বলে সে– সর্দার, একটা দুঃসংবাদ।
দুঃসংবাদ?
হ্যাঁ সর্দার।
মাহবুব একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে– সর্দার, রাজা মোহন্ত সেনকে তার ছোট ভাই। বন্দী করেছে।
এটাই কি তোমার দুঃসংবাদ? এ খবর আমি পেয়েছি।
সর্দার। আজ রাতে তাকে হত্যা করা হবে।
একথা তুমি কেমন করে জানলে?
আমাদের গুপ্তচর সন্ধান জেনে এসেছে।
ডাকো তাকে।
বেরিয়ে যাচ্ছিলো মাহবুব, বনহুর ডেকে বললো– রহমানকেও ডেকো, কথা আছে।
আচ্ছা সর্দার।
বেরিয়ে যায় মাহবুব।
বনহুরের ভূ কুঞ্চিত হয়। চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে সে। রাজা মোহন্ত সেনকে বনহুর বহুদিন থেকেই জানে, এমন মহৎ ব্যক্তি কমই আছে– ধনী গরিব, দীন-দুঃখী তাঁর কাছে সমান। তিনি মুক্তহস্তে গরিবদের দান করেন। তার অর্থে বহু অনাথ আশ্রম, অনেক দাঁতব্য চিকিৎসালয় তৈরি হয়েছে। এখনও তার অর্থে বহু দীন-দুঃখী শান্তিতে কাল কাটাচ্ছে। এমন লোকের অমঙ্গল আশংকা দস্যু বনহুরের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। দস্যু বনহুর মহত্বের বন্ধু,শয়তানের আজরাইল। যেমন পাষণ্ড, তেমনি কোমল প্রাণ সে। মোহন্ত সেনের বিপদে তার মন চঞ্চল হয়ে উঠলো!
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলো রহমান, মাহবুব আর সেই গুপ্তচরটা যে মোহন্ত সেনের খবরটা এনেছে। গুপ্তচরটার শরীরে দারোয়ানের ড্রেস এখনো রয়েছে।
সর্দারকে কুর্ণিশ জানিয়ে দাঁড়ালো সবাই।
বনহুর গুপ্তচরটাকে লক্ষ্য করে বললো– ভুলু সিং, মাহবুবের নিকটে যা শুনলাম সব সত্য।
হ্যাঁ সর্দার, সব সত্য।
আজ রাতে মোহন্ত সেনকে হত্যা করা হবে, এটাও সত্য?
হ্যাঁ, সত্য। আপনার কথামত আমি কাজ করেছি। সব সময় আমি রাজা যতীন্দ্র সেনের কাছে ছিলাম। মোহন্ত সেনকে বন্দী করেও সে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। তাঁকে হত্যা করে তার রাজ্য আত্মসাৎ করে নেবার অভিসন্ধি এটেছে। তাছাড়া মোহন্ত সেনের কন্যা বাসবীকে একজন দুবৃত্ত মাতালের হাতে তুলে দিয়ে দায়মুক্ত হবার জোগাড় করেছে।
