অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো দস্যু বনহুর– হাঃ হাঃ হাঃ প্রাণের মায়া বড় মায়া, তাই না? শয়তান, আমি সব শুনেছি, সব জেনেছি। তোমার হাতে কত প্রাণ অকালে বিনষ্ট হয়েছে। তার। হিসেব তুমি না রাখলেও আমি রেখেছি। পাষণ্ড, জমিদার হয়ে প্রজাদের ওপর তুমি যা অকথ্য অত্যাচার করেছ তা অতি জঘন্য। কতজনকে তুমি মিথ্যা দেনার দায়ে ফকির করেছ কত জনকে উন্মাদ করে তার সমস্ত কিছু আত্মসাৎ করেছ, কত অসহায় পিতার বুক থেকে কন্যা কেড়ে নিয়ে তাকে … না না, আর নয়…।
কে–কে তুমি? এসব জানলে কি করে—
পাপ কোনদিন গোপন থাকে না শয়তান।
কে তুমি?
আমি যেই হই তোমার প্রাণ নিতে এসেছি। আমার হাত থেকে তোমার রেহাই নেই। শয়তান– বনহুরের রিভলবার গর্জে ওঠে।
একটা তীব্র আর্তনাদ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সুলতান হোসেন। কিছুক্ষণ ছটফট করে নীরব হয়ে যায় তার দেহটা।
দস্যু বনহুর এবার ফিরে তাকায় যুবতীর দিকে। মুখের আবরণ খুলে বাম হাতে তার আঁচলখানা তুলে দেয় গায়ে।
যুবতী দু’হাতে আঁচলখানা শরীরে জড়িয়ে নিয়ে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ কণ্ঠে বলে– কে আপনি, আমাকে এভাবে রক্ষা করলেন।
মৃদু হাসি ফুটে ওঠে দস্যু বনহুরের মুখে, বলে সে–আমি যেই হই, তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী। চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
কিন্তু আমাকে কি আর গ্রহণ করবে?
কে?
আমার স্বামী।
নিশ্চয়ই করবে, চলো।
বনহুরের সঙ্গে যুবতী বের হয়ে আসে কক্ষ থেকে।
তখন পাহারাদারগণ দস্যু বনহুরের অনুচরদের কাছে পরাজিত হয়ে কেউ পালিয়েছে, কেউ নিহত হয়েছে। পথ একেবারে মুক্ত। দস্যু বনহুর যুবতীটাকে নিয়ে তার স্বামীর বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালো। দেখলো একটা যুবক পড়ে রয়েছে দরজার পাশে।
যুবতীটি আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো যুবকের বুকে।
.
দস্যু বনহুর হাঁটু গেড়ে বসে যুবকের হাতখানা তুলে নিল হাতে, হিমশীতল হয়ে গেছে। যুবকের দেহটা। আত্মহত্যা করে স্ত্রীর বিরহ বেদনা থেকে মুক্তি পেয়েছে যুবকটা।
যুবতী বিলাপ করে ওঠে– ওগো, তুমি আমাকে একা ফেলে কোথায় গেলে। কে আমাকে দেখবে বল, কে আমাকে আশ্রয় দেবে!
সেই করুণ দৃশ্য দেখে বনহুরের দমনেও আঘাত লাগলো। যুবতীর করুণ কান্না তার চোখে পানি এনে দিল। বলল সে বোন, তুমি কেঁদো না, আমি তোমায় দেখবো।
কৃতজ্ঞতাভরা চোখে তাকালো যুবতী বনহুরের সুন্দর দীপ্ত মুখখানার দিকে। যদিও অন্ধকার তবু ঝাপসা দেখতে পেল যে, ঐ চোখ দুটি অশ্রু ছলছল হয়ে উঠেছে।
দস্যু বনহুর পকেট থেকে একতোড়া নোট বের করে যুবতীর হাতে গুঁজে দিল, তারপর বলল– দরকার হলে আরও পাবে।
যুবতী টাকার তোড়া হাতে অশ্রুভরা চোখে তাকালো দস্যু বনহুরের মুখে, বলল– কে আপনি,তা তো বললেন না?
দস্যু বনহুর শান্তকণ্ঠে বলল– আমি দস্যু বনহুর।
শিউরে উঠলো যুবতী। হাত থেকে নোটের তোড়াটা পড়ে গেল। অস্ফুট ভীতকণ্ঠেবলল– দস্যু বনহুর।
বনহুর নোটের তোড়াটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে যুবতীর দিকে বাড়িয়ে ধরলো–ভয় নেই, দস্য হলেও সে তোমার কোন ক্ষতি করবে না। তুমি আমার বোন। আসি, খোদা হাফেজ! অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায় দস্যু বনহুর।
একতোড়া নোট হাতে স্তব্ধ হয়ে মৃত স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে যুবতী।
দূরে শোনা যায় অশ্ব পদশব্দ।
সম্বিৎ ফিরে পায় যুবতী। তাড়াতাড়ি নোটের তোড়াটা কাপড়ের নিচে লুকিয়ে আঁচলে অশ্রু মুছে।
.
শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় দস্যু বনহুর। সম্মুখে একটা রেকাবিতে আংগুর ফল সাজানো রয়েছে। আরও নানারকম ফলমূল রয়েছে আর একটা রেকাবিতে। বনহুর গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করছে।
এমন সময় রহমান সেখানে এসে এক পাশে দাঁড়ায়।
একটু কেশে বলে রহমান সর্দার, চাঁদপুরে শান্তি ফিরে এসেছে।
উঃ! কি বললে রহমান? সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর।
চাঁদপুরে শান্তি ফিরে এসেছে। এখন সেখানে লোকজন নিশ্চিন্ত মনে বসবাস করতে পারছে। আবার চাষীগণের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে, মাঠে মাঠে গান গেয়ে তারা ফসল বুনছে। স্ত্রী-কন্যা পুত্র নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে দিন কাটাচ্ছে। চাঁদপুরের জমিদার সুলতান হোসেনের পুত্র মাসুম এখন চাঁদপুরের জমিদার হয়েছে।
ছেলেটা কেমন রহমান?
শুনলাম খুব ভাল।
হা সর্দার।
নতুন জমিদারের সঙ্গে মোলাকাত করতে হয় তাহলে। আচ্ছা রহমান, সেই মেয়েটার খবর কি জান?
জানি সর্দার। সে এখন তার স্বামীর ভিটিতেই সুখে বসবাস করছে। আপনার দয়ায় তার কোন অভাব নেই।
হুঁ, এটাই তো দুনিয়ার রীতি। রহমান, আমি চাঁদপুরে একবার যাব।
মাথা চুলকায় রহমান, বলে সে কিন্তু সেখানে এখন পুলিশ যেভাবে ঘোরাফেরা করছে.. চাঁদপুরের জমিদার নিহত হবার পর গোয়েন্দা বিভাগ খুব সজাগভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে চলেছে। এখন সেখানে যাওয়া কি ঠিক হবে সর্দার?
সে জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না রহমান, আমি একাই যাব।
আমি সে কথা বলছি না সর্দার।
তা জানি, তুমি আমার জন্যই ভাবছ কিন্তু রহমান, তুমি তোমাদের সর্দারের জন্য সব সময় নিশ্চিন্ত থেক।
বনহুর রেকাবি থেকে এক ঝোপা আংগুর তুলে নিয়ে মুখের কাছে ধরলো।
রহমান বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।
বনহুর আংগুর খেতে খেতে হাসতে লাগলো।
এমন সময় নূরী এসে বসলো তার পাশে। অভিমানের সুরে বলল– হুর, কেন হাসছো?
বনহুর আংগুরের ঝোপা থেকে একটা আংগুর ছিঁড়ে নিয়ে নূরীর মুখের কাছে তুলে ধরে– খাও।
