জমিদার সুলতান হোসেন যখন যুবতীটাকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে, ঠিক তখন দস্যু বনহুর দলবল নিয়ে তীরবেগে ছুটে আসছে। প্রতিটি দস্যুর হাতে উদ্যত রাইফেল, শরীরে কালো। ড্রেস। গালে গালপাট্টা বাধা। সকলের আগে রয়েছে দস্যু বনহুর, তার হাতে রিভলবার।
গাঢ় অন্ধকারে বাগানবাড়ির নিকটে এসে ছড়িয়ে পড়লো বনহুরের অনুচরগণ। সবাই প্রস্তুত। হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো–দস্যু বনহুর যখন আদেশ করবে তখন সবাই একসঙ্গে আক্রমণ চালাবে।
দস্যু বনহুর তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো। দেয়াল টপকে বাগানবাড়িতে প্রবেশ করে গোপনে এগিয়ে চললো সামনের দিকে।
গাঢ় অন্ধকারে দস্যু বনহুরের কালো পোশাক মিশে গেল। অনেকগুলো পাহারাদার বাগানবাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে সতর্কভাবে পাহারা দিচ্ছিল। একটা শিকারী কুকুর ছেড়ে রাখা হয়েছে, যেন কোন বিপদের আশংকা থাকে।
নিশ্চিন্ত মনে শয়তান জমিদার তার কুকর্ম সিদ্ধ করে চলেছে। এমন করেই সে দিনের পর দিন তার মনোবাসনা চরিতার্থ করে চলে। বিশ্বস্ত অনুচর আর দুর্দান্ত এলসেসিয়ান কুকুর থাকতে কোন ভয় নেই তার।
অবশ্য এত সাবধানতার প্রয়োজন পূর্বে তার ছিল না। সে জানতো, তার চেয়ে শক্তিশালী এ দুনিয়ায় আর বুঝি কেউ নেই। প্রজারা সবাই তাকে ভয় করে। তার বিরুদ্ধে টু শব্দ করবে, এমন। কেউ নেই। কাজেই সে যা খুশি তাই করে যেত।
কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা আছে। প্রজারা তার এই জঘন্য আচরণ নীরবে সহ্য করে গেলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে উঠেছিল। একদিন সবাই জোট পাকিয়ে আক্রমণ করেছিল জমিদারের বাগানবাড়ি।
শেষ পর্যন্ত জমিদারের পাহারাদার আর অনুচরদের হাতে জীবন দিয়েছিল তারা। নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাদের। যে দু’একজন জীবন নিয়ে পালিয়েছিল তাদেরও পরে ধরে এনে হত্যা করেছিল শয়তান সুলতান হোসেন।
তারপর থেকেই জমিদার তার বাড়ি এবং বাগানবাড়িতে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেছিল। একটা দুর্বলতা যে সুলতান হোসেনের মনে ছিল না তা নয়, ভয় ছিল, হঠাৎ যদি আবার কোন হামলা হয়ে বসে। অবশ্য এমন একটা ভয় সমস্ত দুষ্ট লোকের মনেই লুকিয়ে থাকে। তারা প্রকাশ্যে যত আস্ফালনই করুক না কেন, একটা গোপন ভয় তাদের মনে সর্বদা দানা বেঁধে থাকে।
সুলতান হোসেন তাই এত পাহারার ব্যবস্থা করেও একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। মানুষকে তার বিশ্বাস হত না, তাই সে একটা ভয়ঙ্কর কুকুরের আমদানি করেছিল। কুকুরটা যেমন ছিল ভয়ঙ্কর তেমনি ছিল শক্তিশালী। গোটা দিন তাকে আটক করে রাখা হত অন্ধকার এক ঘরে। তাজা কাঁচা মাংস খেতে দেওয়া হত। আর রাতে ছেড়ে দেয়া হত বাগানবাড়ির মধ্যে। কোন লোক দেখলে যাতে তাকে খণ্ড খণ্ড করে ছিঁড়ে ফেলে হত্যা করে, এটাই ছিল শয়তান জমিদারের উদ্দেশ্য।
দস্যু বনহুরও এই কুকুরের কবল থেকে রক্ষা পেল না। লোকচক্ষু তাকে দেখতে না পারলেও পশুর চক্ষু তাকে ধরে ফেললো, গর্জন করে এগিয়ে এলো তীরবেগে।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে কোমরের বেল্ট থেকে ছোরাখানা খুলে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো।
অন্ধকারে হুংকার ছেড়ে এগিয়ে আসছে কুকুরটা। আগুনের ভাটার মত জ্বলছে ওর চোখ দুটো। ঠিক যেন দুটো টর্চলাইট একসঙ্গে আসছে।
বনহুর প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো।
কুকুরটা ঠিক সেই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার ওপর।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর ছোরাটা বসিয়ে দিল কুকুরটার বুকে। অমনি ভীষণ একটা আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো কুকুরটা।
একটা ঘড় ঘড় শব্দ বের হলো কুকুরটার গলা থেকে, তারপর সব নিস্তব্ধ।
শয়তান সুলতান হোসেন তখন উন্মত্তের ন্যায় যুবতীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে।
পাহারদারগণ লাঠি-শরকি নিয়ে ছুটে এলো।
বনহুর ইংগিতসূচক শব্দ করতেই তার অনুচরগণ আক্রমণ করলো পাহারাদারগণকে।
দস্যু বনহুর বাগানবাড়ির যে কক্ষে সুলতান হোসেন যুবতীর উপর নির্যাতন চালিয়ে চলেছিল, সেই কক্ষের কাঁচের শার্সী ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলো।
মুহূর্তে যুবতাঁকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সুলতান হোসেন। দস্যু বনহুরের অদ্ভুত কালো ড্রেস দেখেই তার দু চোখ ছানাবড়া হল। এত পাহারার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কি করে এই লোকটা তার বাগানবাড়িতে প্রবেশ করলো। মনে মনে ভীত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর। কণ্ঠে বলল সুলতান হোসেনকে তুমি?
দস্যু বনহুর তার বুকের কাছে রিভলবার চেপে ধরে বলল– শয়তানের দমনকারী।
বনহুরের মুখের অর্ধেকটা ঢাকা থাকায় শুধু তার চোখ দুটো আর ড্র দেখা যাচ্ছিল।
সুলতান হোসেন বনহুরের চোখের দিকে তাকালো। চোখ দুটো যেন আগুনের ভাটার মত জ্বলছে। তা দেখে সে ভয়ে দু’পা পিছিয়ে যায়, ঢোক গিলে বলে এখানে তুমি কি করে এলে?
যেমন করে আজরাইল আসে।
হিংস্র জন্তুর কবল থেকে ছাড়া পেয়ে হরিণ-শিশু যেমন কাঁপতে থাকে, তেমনি থরথর করে কাঁপছিল যুবতী। চুলগুলো এলোমেলো, পরিধেয় বসন শিথিল হয়ে খসে পড়েছে মেঝেতে। সে এক করুণ মর্মান্তিক দৃশ্য।
যুবতী একবার শয়তান সুলতান হোসেন আর একবার বনহুরের মুখে তাকাচ্ছিল। বিবর্ণ ফ্যাকাশে তার মুখমণ্ডল।
বনহুর দাঁতে দাঁত পিষে বললো–আজ তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।
সুলতান হোসেনের মুখ দিয়ে একটা ভয়ার্ত অস্ফুট শব্দ বের হল। হাতজোড় করে বলল– তুমি যা চাও তাই দেব, আমাকে প্রাণে মেরো না।
