মনিরা ইচ্ছা করেই সরকার সাহেব ও মামীমাকে নিজের গোপনতা জানালো না। হঠাৎ যদি তারা স্নেহ বশীভূত হয়ে তাকে আদর করে বসেন, বা স্নেহ দেখান তাহলেই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে পড়তে পারে। বড় চাচা এলে তখন নিজকে গোপন রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্ততঃপক্ষে দুটো দিন তাকে কষ্ট করতেই হবে।
এদিকে মরিয়ম বেগম ও সরকার সাহেব মনিরার জন্য অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। মরিয়ম বেগম কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন।
.
চাঁদপুর জমিদার বাড়ি।
কাঁচারী ঘরে বসে তামাক টানছে জমিদার সুলতান হোসেন। বয়স তার পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথার চুলে পাক ধরলেও স্বাস্থ্যের কোন অবনতি ঘটেনি এখনও। বলিষ্ঠ চেহারা, উজ্বল গৌর গায়ের রঙ। চেহারায় সুস্পষ্ট আভিজাত্যের ছাপ। প্রথম দর্শনেই তাকে জমিদার বলে চিনতে ভুল হয় না কারও।
সুলতান হোসেন তাকিয়ায় ঠেক দিয়ে বসেছিল, সামনে এক বৃদ্ধ চাষী দাঁড়িয়ে। মলিন জীর্ণ তালিকাযুক্ত লুঙ্গি আর একটা ছেঁড়া জামা তার শরীরে। কাঁধে মলিন ছেঁড়া গামছা। হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছে সে। একপাশে দণ্ডায়মান দারোয়ান। সুপক্ক তেল-চকচকে লাঠি তার হাতের মুঠায় ধরা রয়েছে।
জমিদারের কয়েকজন পরিষদ বসে রয়েছে একপাশে।
সুলতান হোসেন গর্জন করে ওঠে–বেটা খাজনা দিতে পারো না, এবার সব নিলাম করে নেব।
বৃদ্ধ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল– ঐ সামান্য ভিটেটুকু কেড়ে নিলে আমায় পথে দাঁড়াতে হবে, হুজুর আপনি গরিবের মা– বাপ, আমাকে দয়া করুন হুজুর! আমার মেয়েটাকে আপনি পথে বের করবেন না………
কোন কথা আমি শুনবো না। আর দুদিন সময় দিলাম– যাও, যাও এখান থেকে। সুলতান হোসেন গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলো।
বৃদ্ধ কিছু বলতে যাচ্ছিলো, দারোয়ান গলাধাক্কা দিয়ে তাকে বের করে নিয়ে যায়।
সুলতান হোসেন তার একটা অনুচরের দিকে তাকিয়ে কিছু ইংগিত করে।
পরিষদের দল থেকে একজন অনুচর উঠে বেরিয়ে যায়।
দারোয়ান তখন বৃদ্ধের পিঠে লাঠির গুঁতো দিয়ে ঠেলে নিয়ে চলেছে।
সুলতান হোসেনের অনুচরটা দারোয়ানের কাঁধে হাত রেখে ফিস্ ফিস্ করে কিছু বলল।
দারোয়ান একটু হেসে বৃদ্ধকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালো।
অনুচরটা এবার বৃদ্ধ চাষীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে চাপা কণ্ঠে বললো–বেটা, ঘরে জোয়ান মেয়ে থাকতে এত ভুগছিস কেন, এক পয়সা লাগবে না যদি……
বৃদ্ধের চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠলো। গরিব সে হতে পারে কিন্তু পশু নয়। এটুকু বুঝার মত বুদ্ধি তার আছে, মেয়েকে সে কিছুতেই লম্পট জমিদারের হাতে তুলে দিয়ে দায়মুক্ত হতে পারে না। কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠে সে– ভিটে নিলাম হয়ে যাক, পথে পথে ঘুরে বেড়াব সেও ভালো, তবু তোমাদের দয়া আমি চাই না।
বৃদ্ধের কথায় রাগে, অপমানে সুলতান হোেসনের অনুচরটা গর্জে উঠলো –আচ্ছা, দেখা যাবে।
সব কথা এসে বলল সে সুলতান হোসেনের কাছে।
সুলতান হোসেন হাসলো।
ঐদিন রাত্রে বৃদ্ধ চাষী যখন ঘুমে, তখন তাকে মজবুত করে হাত-পা– মুখ বেঁধে তার মেয়েটাকে তুলে নিয়ে আসা হলো।
কে কোথায় তার মেয়েকে নিয়ে গেল, পাড়া প্রতিবেশীরা কেউ জানলো না।
পরদিন বৃদ্ধ জমিদারের দরবারে হাজির হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো বললো– হুজুর, কাল রাতে আমার মেয়েকে কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। আপনি আমার মা-বাপ, আমাকে বাঁচান, বাঁচান হুজুর। আমার ঐ একটি মাত্র মেয়েটাকে খুঁজে বের করে দিন হুজুর।
কর্কশ কণ্ঠে গর্জে ওঠে সুলতান হোসেন এখান থেকে বেরিয়ে যা হতভাগা। নেকামি করার জায়গা পাওনি। কে না কে তোর মেয়েকে চুরি করে নিয়ে গেছে ঠিক নেই, আমি কোথায় খুঁজতে যাব? দরোয়ানকে ইংগিত করলো ওকে বের করে দিতে।
দারোয়ান গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় চাষীকে।
বৃদ্ধ চাষী হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায়। কপালে করাঘাত করে বিলাপ করতে থাকে।
সুলতান হোসেন এমনি করে দিনের পর দিন চালায় প্রজাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার। কারও মেয়ে, কারও বউ ছিনিয়ে নিয়ে আসে সে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
নির্মম জমিদারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে কেউ বা ফিরে যায় পিতামাতা কাউকে আশ্রয় দেয়, কাউকে দেয় না। তখন সে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, ভিক্ষে করে জীবন বাঁচায়, সমাজে তার কোন স্থান হয় না। আর কেউ বা কলঙ্কিত মুখ নিয়ে আর ফিরে যায় না। পুকুরের পানিতে কিংবা বিষ খেয়ে আত্মবিসর্জন দিয়ে স্বামী, পিতা-মাতাকে রেহাই দিয়ে চলে যায়।
এমনি করে সুলতান হোসেন তার কুকর্ম সমাধা করে চলে।
.
সেদিন বাগানবাড়ির একটা কক্ষে সুলতান হোসেন তার নতুন আমদানি করা একটা যুবতাঁকে নিয়ে আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠেছিল। যুবতী তারই একজন গরিব প্রজা গৃহলক্ষ্মী স্ত্রী।
কিছু টাকার বিনিময়ে সুলতান হোসেন যুবতী বধুটাকে তার স্বামীর নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়েছিল।
স্ত্রীকে দুষ্ট জমিদারের হাতে তুলে দিয়ে তার স্বামী পথের ধারে মাথা ঠুকে কাঁদছিল। স্ত্রী ছাড়া বেচারার এ দুনিয়ায় কেউ ছিল না, বড় ভালবাসতো সে স্ত্রীকে। সেই স্ত্রীকে আজ কত কষ্টে, কত যন্ত্রণায় পড়ে জমিদারের হাতে এনে দিয়েছে কে তার দুঃখ বুঝবে।
রাত বেড়ে আসে।
ঝিমিয়ে পড়ে বসুন্ধরা।
সুলতান হোসেনের বাগানবাড়িতে তখন একটা যুবতীর ওপর চলেছে অকথ্য নির্যাতন। কিছুতেই সুলতান হোসেন মেয়েটাকে বাগে আনতে পারছে না।
