পুলিশমহল তো আগে থেকেই দস্যু বনহুর এবং চৌধুরী পরিবারের উপর ভীষণ খ্যাপা ছিলেন, আসগর আলীর কেস তারা অত্যন্ত আগ্রহে গ্রহণ করলেন।
দু’দিন পর আসগর আলী পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ হারুনকে নিয়ে হাজির হলেন চৌধুরী বাড়িতে।
বেলা তখন গড়িয়ে এসেছে।
সরকার সাহেব বাইরে যাওয়ার জন্য গাড়ি-বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন, এমন সময় আসগর আলী ও ইন্সপেক্টার মিঃ হারুন হাজির হলেন সেখানে।
সরকার সাহেব অবাক চোখে তাকালেন ইন্সপেক্টার মিঃ হারুনের মুখের দিকে। যদিও তিনি আসগর আলীকে তার সঙ্গে দেখে অনুমানে সব বুঝে নিয়েছিলেন, তবু না বুঝার ভান করে বললেন-ইন্সপেক্টার সাহেব যে! ব্যাপার কি?
মিঃ হারুন কোন কথা বলার পূর্বে বলে ওঠেন আসগর আলী-ব্যাপার একটু পরেই জানতে পারবেন। এখন বলুন আমার ভাতিজী মনিরা কোথায়?
মিঃ হারুন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন-চৌধুরী সাহেবের ছেলে দস্যু বনহুর তাকে চুরি করে এখানে এনেছে।
একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন সরকার সাহেব-একথা আপনারা কোথায় শুনলেন? গত পরশু মনিরাকে আসগর আলী সাহেব জোরপূর্বক নিয়ে গেছেন, তারপর আর তার কোনো খোঁজখবর আমরা জানি না। যদিও সরকার সাহেবের মিথ্যা বলতে বাধছিল তবু না বলে উপায় ছিল না।
আসগর আলী বললেন-নিশ্চয়ই মনিরা এখানে আছে। ইন্সপেক্টার, আপনি তল্লাশি নিন।
বৃদ্ধ সরকার সাহেব প্রমাদ গুণলেন, এখন উপায়! মনিরা এখন নিজের ঘরে বসে আছে। এখনই তিনি ধরা পড়ে যাবেন ইন্সপেক্টার মিঃ হারুনের কাছে।
এখানে যখন সরকার সাহেব, আসগর আলী ও মিঃ হারুনের মধ্যে কথা হচ্ছিল তখন মরিয়ম বেগম হলঘর থেকে সব শুনতে পান। তিনি মুহূর্ত বিলম্ব না করে মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে সব খুলে বললেন। একটুও দেরী হলে আবার তাকে তার বড় চাচা ধরে নিয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মামীমার কথায় চমকে উঠলো মনিরা, আতঙ্কে শিউরে উঠলো সে। তাহলে উপায়! পুলিশ ইন্সপেক্টারের চেয়ে বড় চাচাকে বেশি ভয়। কোন বাধাই আজ তাকে রুখতে পারবে না। বড় চাচা তাকে পুলিশের সাহায্যে ধরে নিয়ে যাবেন। বেশিক্ষণ চিন্তা করার সময় তার নেই। মামীমার হাত চেপে ধরে বলে ওঠে মনিরা–মামীমা, তুমি কিছুতেই বলবে না যে, আমি এসেছি।
মিথ্যা কথা আমি বলতে পারবো?
পারতেই হবে, একজনের ভালো করতে গিয়ে মিথ্যা বলতে দোষ নেই। যদি আমাকে পুত্রবধূ বলে গ্রহণ করে থাক তবে আমাকে বাঁচাতেই হবে, বলবে আমি এখানে আসিনি। তোমরা কেউ জানো না আমার সন্ধান, কথা শেষ করে দ্রুত বেরিয়ে যায় মনিরা।
মরিয়ম বেগম ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন।
একটু পরেই সিঁড়িতে ভারী জুতোর শব্দ হয়! মরিয়ম বেগম নিজকে কঠিন করে নেন।
অল্পক্ষণের মধ্যে সরকার সাহেব, আসগর আলী ও পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ হারুন এসে দাঁড়ান তার সামনে!
আসগর আলীর দু’চোখে যেন আগুন ঝরে পড়েছে। গম্ভীর কঠিন কণ্ঠে বললেন– মনিরা কোথায়?
মরিয়ম বেগম দৃঢ়কণ্ঠে বললেন– জানি না।
মিঃ হারুন বললেন– মনিরাকে আপনার ছেলে দস্যু বনহুর ওর চাচার বাড়ি থেকে চুরি করে এনেছে। কোথায় সে বলুন।
বললাম তো জানি না।
মিঃ হারুন বললেন– আপনার বাড়ি খুঁজে দেখতে চাই।
দেখুন। গম্ভীর গলায় বললেন মরিয়ম বেগম।
সরকার সাহেব ঢোক গিললেন।
আসগর আলী সাহেব, মিঃ হারুন ও কয়েকজন পুলিশ গোটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজা শুরু করলেন।
ওদিকে মনিরা ততক্ষণে ঝি দুখিনার কাপড় পরে নিয়ে কলতলায় এটো থালা বাসন পরিষ্কার করতে বসে গেছে। দুখিনা কল থেকে পানি তুলছে।
দুখিনার বেশে মনিরাকে চিনার কোন উপায় ছিল না! ছাই-কালি দিয়ে তার হাত দু’খানা অপরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। চুলগুলো এলোমেলো, পরনে অপরিষ্কার অল্পদামী কাপড়।
আসগর আলী, মিঃ হারুন ও পুলিশরা মনিরাকে খুঁজে ফিরতে লাগলো। না, কোথাও মনিরা নেই।
মিঃ হারুন নিজে মনিরার পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে লক্ষ্য করলেন।
ভয়ে শিউরে উঠলো মনিরা। মনে মনে খোদার নাম স্মরণ করতে লাগলো। খোদার মহিমা অপার! কেউ দুখিনার বেশে মনিরাকে চিনতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে আসগর আলী ও পুলিশের দল বিদায় নিল।
আসগর আলী মনে মনে ভাবলেন, বনহুর মনিরাকে চুরি করে কোন গহন বনে লুকিয়ে পড়েছে। বিদায়কালে আবার আসব বলে মরিয়ম বেগমকে জানিয়ে গেলেন আসগর আলী।
আসগর আলী দলবল নিলে চলে যেতেই মরিয়ম বেগম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন, মনিরা তাহলে গোল কোথায়। দিনের আলোতে কোথায়ই বা লুকালো সে। মনিরার জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন তিনি।
সরকার সাহেবও ব্যস্ত হয়ে এ বাড়ি ও-বাড়ি সন্ধান নিতে শুরু করলেন।
মনিরা নিজেদের বাড়ির মধ্যেই দিব্যি আরামে সকলের চোখের সামনে রয়েছে, এটা কেউ জানতে পারেনি।
গোটা দিন চলে গেল।
মরিয়ম বেগমের মনে অশান্তির কালো ছায়া ঘনিয়ে এলো। সরকার সাহেব ও বাড়ির সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
মনিরা দুখিনার ছদ্মবেশে থেকে মামীমার ব্যস্ততা লক্ষ্য করলো কিন্তু চট করে নিজেকে প্রকাশ করলো না। ভয় হলো, আবার যদি তার শয়তান বড় চাচা এসে হানা দেয়। তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। কাজেই আত্মগোপন করে মনিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
একমাত্র দুখিনা জানতো আর জানতো নকীব। মনিরা ঝি-এর বেশে রান্নাঘরের মধ্যে নিজেকে গোপন রাখলেও এদের দুজনের সাহায্য তার নিতান্ত প্রয়োজন ছিল।
