নূরী বনহুরের চোখে চোখ রেখে বুঝতে চেষ্টা করে কি বলতে চায় সে। ভয় হয়, এমন কোনো কথা তাকে শুনতে না হয় যা তার জীবনটাকে এলোমেলো করে দেয়। ব্যথাভরা গলায় বলে নূরী–হুর, যে কথা আমি সহ্য করতে পারবো না, তেমন কথা তুমি যেন আমাকে বল না! বল না হুর! আমি তোমার বিরহ সইতে পারবো না।
নূরী, না বলে যে উপায় নেই।
আজ নয় হুর, পরে বল–থাক।
নূরী।
না,আমি কোনো কথাই শুনতে চাই না………..ছুটে চলে যায় নূরী।
বনহুর নূরীর চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নূরীকে বনহুর ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে, একসঙ্গে খেলা করেছে ওরা দুজন। বনে বনে ঘুরে বেড়ানো, তীর-ধনুক নিয়ে বন্য পশু শিকার করা, নদীতে সাঁতার কাটা, গাছের আড়ালে লুকোচুরি খেলা, ঘোড়ার চড়া সব একসঙ্গে করেছে ওরা। সব সময় বনহুর নূরীকে তার ছায়ার মতই পাশে পাশে দেখেছে– আজ সেই নূরী কি করে দূরে সরে যাবে,কি করে নূরী তাকে ভুলবে–
হঠাৎ বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ে, রহমান এসে দাঁড়ায় তার সামনে– সর্দার, সমস্ত অনুচর দরবারকক্ষে এসে গেছে।
সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর– চলো।
বেরিয়ে যায় বনহুর। তাকে অনুসরণ করে রহমান।
দরবারকক্ষ।
বনহুর তার সুউচ্চ আসনে পা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। অন্যান্য অনুচর দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই প্রতীক্ষা করছে সর্দারের আদেশের।
বনহুর তার অনুচরগণের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে তোমরা জানো, পুলিশবাহিনী আমার সন্ধানে ছুটাছুটি করছে। কিন্তু তারা কোনদিনই দস্যু বনহুরের সন্ধান পাবে na। আমার পাতালপুরীর এই আস্তানা কেউ কোনরকমে খুঁজে পাবে না। আমি আমার কাজ এখান। থেকেই চালাবো। রহমান আজ তোমরা প্রস্তুত থেক আমি চাঁদপুরের জমিদারবাড়িতে হানা দেব।
রহমান বিনীত কণ্ঠে বলে–সর্দার চারদিকে পুলিশ তন্নতন্ন করে সন্ধান চালাচ্ছে, এই অবস্থায় ..
গর্জে ওঠে দস্যু বনহুর–সাধ্য কি পুলিশ দস্যু বনহুরের কাজে বাধা দেয়। রহমান, জানো না চাঁদপুরের জমিদার কত ভয়ঙ্কর, কত পাষণ্ড! প্রজাদের ওপর সে যে অনাচার চালিয়েছে তা অতি জঘন্য। আজ পর পর তিন বছর চাঁদপুরের মাটিতে ফসল জন্মেনি। সেখানে লোকজন না খেয়ে অনাহারে শুকিয়ে মরছে। এমন কি ক্ষুধার জ্বালায় তারা আত্মহত্যা করছে। কিন্তু নির্মম জমিদারের কোনদিকে লক্ষ্য নেই। সে প্রজাদের গায়ের রক্ত চুষে নিংড়ে খাজনা আদায় করে নিচ্ছে।
রহমান বলে ওঠে–সর্দার, শুধু তাই নয়, যারা কর দিতে না পারছে, চাঁদপুরের জমিদার সুলতান হোসেন তাদের স্ত্রী ও যুবতী কন্যাকে কেড়ে নিয়ে আসছে। কত লোক ভয়ে মাতাল জমিদারের হাতে স্ত্রী-কন্যাকে সমর্পণ করে দায়মুক্ত হচ্ছে।
এ কথা এতদিন আমাকে জানাওনি কেন রহমান। বনহুরের দু’চোখে যেন সহসা ধক করে জ্বলে ওঠে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে– সুলতান হোসেনের এই জঘন্য আচরণ সহ্য করা যায় না। তাকে উচিত শাস্তি দেব রহমান, কোন বাধাই আমি মানতে রাজি নই। যাও, তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও।
বনহুর দরবারকক্ষ থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
রহমান অনুচরগণকে বললো– তোমরা সব সময় তৈরি থেক, সর্দারের হুকুম হলেই ছুটতে হবে।
আমরা সবাই প্রস্তুত।
রহমান ও দলবল দরবারকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে।
অন্যান্য অনুচর চলে যেতেই সামনে এসে দাঁড়ায় নূরী, রহমানকে লক্ষ্য করে বলে– রহমান, হুর আবার কোথায় যাবার জন্য তোমাদের তৈরি হবার নির্দেশ দিল?
চাদুপুর।
সেখানে কেন?
তার যা কাজ, সেই কাজের জন্য।
পুলিশবাহিনী হুরের সন্ধানে গোটা দেশ চষে ফিরছে, এমনকি..
আজ তো নতুন নয় নূরী। সর্দারকে তুমি ভালভাবেই জানো। কোন বাধাই তাকে ক্ষান্ত করতে পারবে না।
জানি, তবু তাকে যেমন করে হউক রুখতে হবেই।
সশস্ত্র পুলিশবাহিনী, তাদের হাতের উদ্যত রাইফেল কোনোটাই সর্দারকে রুখতে সক্ষম হবে না নূরী।
আমি তাকে রুখবো, কিছুতেই আমি এসময় তাকে চাঁদপুর যেতে দেব না।
বেশ, চেষ্টা করে দেখ যদি সক্ষম হও। কিন্তু মনে রেখ নূরী, চাঁদপুরের লোকজন আজ যে অবস্থায় রয়েছে তাতে সর্দারকে কিছুতেই তুমি ধরে রাখতে পারবে না।
আচ্ছা, আমি দেখবো। নূরী চলে গেল সেখান থেকে।
রহমান হাসলো। তার হাসির মধ্যে ফুটে উঠলো একটা ব্যথার আভাস। মনে মনে বলল সে–নূরী, যার জন্য তুমি উদগ্রীব, সে কি তোমার জন্য এতটুকু ভাবে– কেন তুমি আলেয়ার আলোর পেছনে ছুটছে।
.
বিয়ের আসর থেকে মনিরা নিখোঁজ হওয়ায় মনিরার বড় চাচা আসগর আলী সাহেব বড়ই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তার সমস্ত আশা ভরসা পণ্ড হয়ে গেল। এত ধন-সম্পদ হাতে পেয়েও পেলেন না। মনিরাকে কোনোরকমে পুত্রবধূ করে নিতে পারলেই তার মনোবাসনা পূর্ণ হত। ছোট ভাইয়ের বিপুল ঐশ্বর্য তার হাতে চলে আসতো।
ক্ষোভে-দুঃখে মরিয়া হয়ে উঠলেন আসগর আলী। তাঁর বুঝার কিছুই বাকি রইলো না, নিশ্চয়ই সেই দস্যু বদমাইশটা মনিরাকে চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে। তাঁর সমস্ত পরিশ্রম পণ্ড করে দিয়েছে। অধর দংশন করতে লাগলেন আসগর আলী। যত রাগ হলো মনিরার মামীমার উপর। এত সাহস দস্যুটার যে, মনিরাকে বিয়ের আসর থেকে চুরি করে নিয়ে গেল!
আসগর আলী শহরে গিয়ে থানায় ডায়েরী করলেন। দস্যু বনহুর তার ভাতিজীকে চুরি করে নিয়ে গেছে এবং এই চুরির ব্যাপারে চৌধুরী গৃহিণী মরিয়মের গোপন ইংগিত রয়েছে। মনিরা তার ভাতিজী, কাজেই মনিরার ওপর তার মামা-মামীমার চেয়ে তার অধিকার অনেক বেশি।
