মিঃ হারুন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন– মিঃ রাও, এবার সঠিক বন্ধুকে পেয়েছেন তো?
হ্যাঁ, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মিঃ হোসেন বলে উঠেন– কি আশ্চর্য, সেই মিঃ আলম আর এই মিঃ আলমে হুবহু মিল রয়েছে।
মিঃ শঙ্কর রাও বললেন–সেই কারণেই আমারও ভুল হয়ে গিয়েছিল, যে ভুলের জন্য আমি দস্যু বনহুরকে বন্ধু বলে গ্রহণ করেছিলাম।
মিঃ আলম, মিঃ রাও এর বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন– দস্যু বনহুরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা কোন কলঙ্কের বা লজ্জার কথা নয়, বরং তাকে বন্ধুরূপে পাওয়া পরম ভাগ্য।
পুলিশ অফিসের সকলে অবাক হয়ে তাকান মিঃ আলমের মুখের দিকে। মিঃ শঙ্কর রাও বললেন– আপনি দেখছি দস্যু বনহুরের খুব ভক্ত হয়ে গেছেন। যাক বলুন, আসল ব্যাপারটা কি?
মিঃ আলম বললেন– আপনি বসুন, আমি সমস্ত ঘটনাটা বলছি।
মিঃ শঙ্কর রাও আসন গ্রহণ করেন।
মিঃ আলম এবার ধীরে ধীরে সমস্ত ঘটনা বলে যান। বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে সকলে শুনছেন তার কথাগুলো। এতদিন সত্যিকারের মিঃ আলম দস্যু বনহুরের পাতালপুরী আস্তানার গোপন কক্ষে বন্দী ছিলেন জেনে পুলিশ অফিসারগণ হতবাক হয়ে যান। এতক্ষণে তাদের মনের সন্দেহ দূর হল।
মিঃ আলম বললেন–দস্যু বনহুরের যে পরিচয় আমি পেয়েছি তা সত্যি প্রশংসনীয়। আমি আশ্চর্য হয়েছি, আজ একটা বছর সে আমাকে তার গোপন কক্ষে বন্দী করে রেখেছিল বটে, কিন্তু আমাকে সে এতটুকু কষ্ট দেয় নি। আমার যখন যা প্রয়োজন তা পেয়েছি। এমন কি বাইরের। খবরাখবর যাতে জানতে পারি সেজন্য দৈনিক পত্রিকায় ব্যবস্থাও ছিল সেখানে।
হেসে বললেন মিঃ হারুন–দস্যু বনহুর দেখছি আপনাকে জামাই আদরে রেখেছিলো?
হ্যাঁ, তার চেয়েও বেশি।
হেসে বলেন শঙ্কর রাও কিন্তু দস্যু বনহুর আপনার সঙ্গে যতই সৎ এবং মহৎ ব্যবহার করুক তাকে আমরা গ্রেফতার করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত।
হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে আমরা পুলিশবাহিনী সম্পূর্ণ একমত– বললেন মিঃ হারুন।
.
মিঃ আলমকে দস্যু বনহুর বন্দী করে রেখেছিল–কথাটা মিঃ জাফরীর কানে যেতে তিনি সিংহের ন্যায় গর্জে উঠলেন। দু’চোখে তার আগুন ঠিকরে বের হলো, তিনি পুলিশবাহিনীর ওপর কড়া হুকুম দিলেন–যে কোনোভাবেই হউক দস্যু বনহুরকে গ্রেফতার করতেই হবে। একজন সুদক্ষ গোয়েন্দাকে সে এভাবে আটক করে রেখে গোয়েন্দা বিভাগকে অপদস্ত করেছে।
মিঃ জাফরীর কঠিন আদেশে আবার পুলিশমহলে সাড়া পড়ে গেল। এবার পুলিশবাহিনী দস্যু বনহুরকে গ্রেফতারের জন্য উঠে পড়ে লাগলো।
পথে-ঘাটে-মাঠে সর্বত্র পুলিশ গোপনে অনুসন্ধান চালালো। গোয়েন্দা বিভাগের লোক ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। আহার নিদ্রা ত্যাগ করে পুলিশ অফিসারগণ ছুটাছুটি শুরু করলেন।
মিঃ জাফরী ভেবেছিলেন দস্যু বনহুরের আস্তানা বিনষ্ট করে দিয়ে তার বিশেষ ক্ষতি করেছেন। আর সে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। এবার সে এদেশ ত্যাগ করে চলে যাবে। কিন্তু তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
মিঃ জাফরী সশস্ত্র পুলিশবাহিনী নিয়ে গহন বনে যেখানে দস্যু বনহুরের আস্তানা ছিল সেই জায়গায় অনুসন্ধান চালাতে লাগলেন।
মিঃ জাফরীর দলবলের হাতে অনেক বন্য পশু নিহত হলো। অনেক আহত হয়ে আত্মগোপন করলো বনের মধ্যে। গোটা বন চষে ফিরলো পুলিশবাহিনী। এমন কি তারা রাতেও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দস্যু বনহুরের সন্ধান করতে লাগলো।
পুলিশবাহিনীর মশালের আলোতে গোটা বনভূমি আলোকিত হয়ে উঠলো। বন্য জীবজন্তু সব ছুটে পালাতে লাগলো এদিকে ওদিকে। গাছের পাখি সব নীড় ছেড়ে আকাশে উড়ে উঠলো। সে এক মহা হুলস্থুল কাণ্ড।
দস্যু বনহুর তার পাতালপুরীর গোপন আস্তানায় একটা কক্ষে পায়চারী করছে।
এমন সময় রহমান এসে দাঁড়ালো।
বনহুর পায়চারী বন্ধ করে তাকায় রহমানের মুখের দিকে, গম্ভীর কণ্ঠে বলে সে কি খবর রহমান?
সর্দার, ওরা এখনও বনে বনে অনুসন্ধান চালিয়ে চলেছে।
হঠাৎ অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠে দস্যু বনহুর–হাঃ হাঃ হাঃ…হাঃ হাঃ হাঃ তারপর হাসি থামিয়ে বলে পুলিশবাহিনী দস্যু বনহুরের সন্ধানে আজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে– কিন্তু জানে না তারা, দস্যু বনহুরকে খুঁজে বের করা তাদের অসাধ্য। রহমান, আমার অসুস্থ অনুচরগণ কি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে?
তিনজন ছাড়া আর সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ সর্দার।
যাও, সবাইকে আসতে বল।
রহমান বেরিয়ে যায়।
দস্যু বনহুর সামনের টেবিল থেকে রিভলভারখানা হাতে তুলে নিয়ে ফিরে দাঁড়াইতেই দেখতে পায় নূরী দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বনহুর প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে তাকায় তার মুখের দিকে।
এগিয়ে আসে নূরী, মুখমণ্ডল তার বিষণ্ণ মলিন। বনহুরের সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু মুখ। তুলে চাইতে পারে না।
বনহুর নূরীর মুখখানা তুলে ধরে মৃদু হেসে বলে–কি হয়েছে নূরী?
একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে যায় নূরী, তারপর বলে–কিছু না।
বনহুর আরও ঘনিষ্ঠহয়ে দাঁড়ায়– নূরী, তুমি যেন কেমন হয়ে গেছ।
এবার মুখ তুলে তাকায় নূরী, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে– আমি নই– তুমি হুর, তুমি একি হলে!
নূরী!
হ্যাঁ, আজ কতদিন হলো আমি লক্ষ্য করছি, তুমি সব সময় আমাকে যেন এড়িয়ে চলতে চাও। জানি না কি হয়েছে তোমার।
বনহুর আনমনা হয়ে যায়, নূরীকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কি যেন গভীরভাবে চিন্তা করে, তারপর বলে– নূরী, একটা কথা তোমাকে বলবো?
