জানাযা শেষ হয়ে যায়। কখন যে চৌধুরী সাহেবের লাশ নিয়ে চলে গেছে খেয়ালও নেই ওর। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পায়, কঠিন পাথরের মত শক্ত হয়ে ওঠে তার মুখমন্ডল! দাঁতে অধর দংশন করে সে। দক্ষিণ হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হয়– চৌধুরী সাহেবের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে এর উপযুক্ত সাজা সে নিজ হাতে দেবে।
যেমন সকলের অলক্ষ্যে একপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সে, তেমনি সকলের অজ্ঞাতে বাগান থেকে বেরিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে অদৃশ্য হল। শুধু একটা তৃপ্ত নিঃশ্বাস ঘুরপাক খেয়ে ঘুরতে লাগল বাগানটার মধ্যে।
গভীর রাত।
জনমুখর নগরী সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে। যানবাহন চলাচল একরকম প্রায় থেমে এসেছে। মাঝে মধ্যে দু’একটা মোটরকার এদিক থেকে সেদিকে ছুটে চলে যাচ্ছে।
রাস্তার দু’পাশে গাড়িগুলো নিঝুম পুরীর মত ঝিমিয়ে পড়েছে। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। দু’একজন ক্কচিৎ পথ চলছে।
এমন সময় একটি শব্দবিহীন মোটরকার এসে থামল চৌধুরী বাড়ির গেটে।
পাহারাদার বারান্দায় বসে বসে ঝিমুচ্ছিল। গাড়ির শব্দ পেয়ে পাহারাদার সজাগ হয়ে উঠল, ছুটে এলো সে। এতরাতে গাড়ি এলো কোথা হতে।
দারোয়ান কিছু জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই গাড়ির চালক একটি কার্ড বের করে দারোয়ানের হাতে দিয়ে বলল–বিবি সাহেবকে ডেকে দাও।
তিনি এখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।
ঘুমাননি, তুমি যাও।
দারোয়ান বলল– তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন, তাছাড়া তিনি এত রাতে কারও সঙ্গে দেখা করেন। দারোয়ান জোর গলায় কথাটা বলে উঠে।
যাবে না তুমি?
না।
তবে গেট খুলে দাও।
হুকুম নেই। গেট আমি খুলব না।
বেশ। চালক ফিরে যাবার জন্য পা বাড়ায় গাড়ির দিকে। দারোয়ানও ফিরে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায় অমনি চালক পেছন থেকে ওকে জাপটে ধরে, তারপর মুখের মধ্যে একটা রুমাল খুঁজে দিয়ে টেনে তুলে ফেলে গাড়ির মধ্যে।
দারোয়ানের হাতে ছিল গুলীভরা বন্দুক, তবু সে একটু নড়তে পারল না বা টু শব্দ করতে সক্ষম হলো না। চালক ওকে একটা দড়ি দিয়ে মজবুত করে বেঁধে গাড়ির মেঝেতে শুইয়ে রাখল, তারপর দারোয়ানের পকেট থেকে গেটের চাবি নিয়ে গেট খুলে ফেলল।
গাড়ি-বারান্দায়, গাড়ি রেখে চালক নেমে পড়লো। নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে। পাহারাদার এবং চাকর-বাকর সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
শোকাতুরা মরিয়ম বেগম কেঁদে কেঁদে এখন মৃতের ন্যায় অসাড় হয়ে পড়েছেন। শিয়রে বসে। মনিরা তখনও জেগে নীরবে চোখের পানি ফেলেছে। কতদিনের কত কথা আর কত স্মৃতি মনে উদয় হচ্ছে। পিতৃসমতুল্য চৌধুরী সাহেবের মৃত্যু তাঁর সমস্ত হৃদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। সংসারে আপনজন বলতে তার ঐ মামুজান আর মামীমা ছাড়া আর কেউ নেই।
যতই মনিরা চৌধুরী সাহেবের কথা স্মরণ করছে, ততই ব্যথায় মুষড়ে পড়ছে। দু’চোখে পানি আজ বাঁধভাঙা স্রোতের মত হু হু করে নেমে আসছে। অথৈ সাগরে ভেসে চলেছে ওরা। মনিরা মামীমার চুলে হাত বুলিয়ে নীরবে কাঁদছিল।
হঠাৎ কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই চমকে মুখ তুলল মনিরা। এতো দুঃখ আর ব্যথার মধ্যেও চোখ দুটো তার উজ্জল দীপ্ত হয়ে উঠল। অস্ফুট কণ্ঠে বলল– এসেছ। এতোক্ষণে এসেছ তুমি…বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো মনিরার কণ্ঠ।
দস্যু বনহুররের চোখে আজ অশ্রু। একটু পূর্বে বনহুরই শব্দবিহীন গাড়ি নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করেছিল।
মনিরার কথায় কোন জবাব দিতে পারে না, বনহুর। শুধু ঠোঁট দুখানা একটু কেঁপে উঠে।
মনিরা ডাকে–মামীমা উঠো, দেখ কে এসেছে!
মরিয়ম বেগম তন্দ্রাচ্ছন্নভাব মুহূর্তে ছুটে যায়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকান তিনি।
মনিরকে এখন চিনতে তাঁর দেরী হয় না। কারণ, ইতোপূর্বে মাতা-পুত্রের মিলন ঘটেছিল।
মরিয়ম বেগম পুত্রের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠেন। উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন– ওরে আজ তুই এলি? তোর আব্বা যে আর এ দুনিয়ায় নেই। কাকে দেখতে এলি তুই! ওরে কাকে দেখতে এলি……
অস্ফুট ধ্বনি করে ওঠে বনহুর–আম্মা!
মনির, তোর আব্বার তুই যে ছিলি নয়নের মনি। হৃদয়ের ধন…
আম্মা আমি পারলাম না তার একটু সেবা করতে, আমার জন্য তিনি জীবনে শুধু অশান্তিই ভোগ করে গেলেন। আমি তাঁর কিছু করতে পারলাম না আম্মা, আব্বার আত্মা আমাকে অভিসম্পাত করবে চিরদিন, আমি সে অভিসম্পাত আগুনে জ্বলেপুড়ে মরবো…….
না না, তোকে তিনি অভিসম্পাত করতে পারবেন না। তিনি যে তোকে বড় ভালবাসতেন! ওরে, তিনি যে তোকে বড় ভালবাসতেন!
আম্মা!
আমার! বাবা মনির–
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়িতে দ্রুত জুতোর শব্দ শুনা যায়।
বনহুর হঠাৎ চমকে উঠে।
মনিরাও সচকিত হয়ে বলে উঠে–এভোরাতে কারা এলো?
দরজার পাশে গিয়ে সিঁড়ির দিকে উঁকি দেয়, সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে বলে– মনির, পুলিশ।
মরিয়ম বেগম হতভম্ভের মত বলেন–পুলিশ!
বনহুর একবার মা আর মনিরার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পিছনের জানালা পথে পাইপ বেয়ে নেমে যায় নিচে।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করেন মিঃ হারুন ও রায়, সঙ্গে মিঃ জাফরী। পিছনে কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ।
মিঃ হারুন বিনীত কণ্ঠে বলে উঠেন– মাফ করবেন, যদিও আপনারা আজ অত্যন্ত শোকাতুরা তবু আপনাদের বিরক্ত করতে বাধ্য হচ্ছি। এখানে আপনার পুত্র দস্যু বনহুর এসেছে। বলুন সে কোথায়?
