জবাব দেয় মনিরা–এসেছিল, কিন্তু এখন নেই।
মিস্ মনিরা অযথা মিথ্যা বলে…
না, আমি মিথ্যা বলিনি। … আপনার আমাদের সমস্ত বাড়ি খুঁজে দেখতে পারেন।
মিঃ জাফরী পুলিশদের লক্ষ্য করে বলেন–তোমরা খুঁজে দেখো। তারপর মরিয়ম বেগমকে লক্ষ্য করে বলেন–দেখুন মিসেস চৌধুরী, আপনি আজ শোকাতুরা, আপনাকে বিরক্ত করা আমাদের মোটেই উচিত নয়। কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে বিরক্ত করতে হচ্ছে। আপনার স্বামী এবং আপনি অতি মহান এবং মহঞ্জন, এ কথা আমি শুনেছি, কিন্তু আপনাদের পুত্র দস্যু বনহুর অতি জঘন্য….।
না, সে জঘন্য নয়, ফুলের মত নিষ্পাপ। মরিয়ম বেগম দ্বীপ্ত কণ্ঠে কথাটা বলেন?
মিঃ জাফরী হেসে উঠেন– মায়ের কাছে সন্তান ফুলের মতোই নিষ্পাপ হয়। মিসেস্ চৌধুরী–দস্যু বনহুর শুধু ডাকু নয়, সে নর হত্যাকারী।
না না, আমার মনির নরহত্যা করতে পারে না, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। না না, কিছুতেই না–
অসম্ভব! ইন্সপেক্টার সাহেব, আপনি দস্যু বনহুরের নাম শুনেছেন। তার কার্যকলাপ সম্বন্ধে পুলিশের ডায়েরী থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু দস্যু বনহুরের অপর দিকটা কি তা হয়ত এখনও আপনার জানা হয় নি। কিন্তু সে হতে পারে–নরহত্যাও সে করতে পারে, কিন্তু তাই বলে সে এতোখানি হীন নয় যে, তার পিতাকে হত্যা করে তার ঐশ্বর্য হস্তগত করবে।
মিস্ মনিরা আপনি জানেন–চোর ডাকু কোনদিন সৎ বা মহৎ হতে পারে না। অর্থের লোভে তারা সব পারে।
না, সে লোভী নয়। পিতার ঐশ্বর্য তো দূরের কথা, সে কারও ঐশ্বর্য চায় না।
হেসে উঠেন মিঃ হারুন–তাহলে সে দস্যুবৃত্তি করে কেন?
সেটা তার নেশা পেশা নয়। অর্থের লোভে বনহুর কোন নরহত্যা করে না।
কিন্তু তার ভাল দিকটা একবারও ভেবে দেখবেন না? ইন্সপেক্টর সাহেব, আপনি এরি মধ্যে ভুলে গেছেন দেশবাসীর প্রতি তার কত বড় আত্মত্যাগ! কিছুদিন পূর্বে বিদেশীর কবলে দেশ যখন মুহুর্মুহ আশঙ্কায় আশঙ্কিত, তখন দস্যু বনহুর কি আপনাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো না?
ছিলো! এ দেশ রক্ষা না হলে তারও যে বিপদ ছিলো এ– ও ঠিক।
না, তার বিপদ এখনও যেমন, ঠিক তখনও তেমন থাকত। শুধু মাতৃভূমির আকুল আহ্বানে সে সাড়া না দিয়ে পারেনি। ছুটে গিয়েছিল সে রণাঙ্গনে প্রাণের মায়া বিসর্জন দিয়ে, সে দেশ আর দেশবাসীকে করেছিল রক্ষা। আজ প্রতিটি দেশবাসীর কর্তব্য দস্যু বনহুরের নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা।
মিঃ জাফরী গর্জন করে উঠেন–মিঃ হারুন, একেও এরেস্ট করা দরকার। কেন এতোদিন, আপনারা একে মুক্ত করে রেখেছেন?
মিঃ হারুন মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন– উত্তেজনার বশে এসব বলছে স্যার। আসলে এদের কোন দোষ নেই। চৌধুরী সাহেব অতি মহৎ ব্যক্তি ছিলেন। ওনার স্ত্রী মিসেস চৌধুরীও তেমনি অতি ভদ্র এবং নম্র। এ মেয়েটি অবশ্য একটু উগ্র স্বভাব, কিন্তু আসলে কিছু নয়। আমাদের অন্যভাবে এসব অনুসন্ধান নিতে হবে..।
ওদিকে পুলিশগণ সমস্ত কক্ষ তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরে এলোনা স্যার, কোথাও কেউ। নেই।
মিঃ হারুন নিজেও একবার খুঁজে দেখলেন, কিন্তু তাদের সমস্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হল।
মিঃ জাফরী কিন্তু মনে মনে ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন, গর্জন করে বললেন– অযথা আপনি না জেনে এভাবে এলেন কেন?
স্যার, দস্যু বনহুর যে এখানে এসেছিল এ কথা সত্য। কারণ গেটের বাইরে যে গাড়িখানা আমরা দেখলাম, সেটাই দস্যু বনহুরের গাড়ি এবং বন্দী দারোয়ান যা বলল তাতেও ঐ রকমই। বুঝা যায়।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ হারুন ও পুলিশগণ মিলে যখন ফিরে চললেন, তখন ভোরের আলোতে পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে।
.
পুলিশ অফিসে পাশাপাশি বসে আলাপ করছিলেন মিঃ জাফরী, মিঃ হারুন এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার।
মিঃ হারুন বলেন–স্যার, দস্যু বনহুরকে গ্রেফতারের পূর্বে আমাদের কর্তব্য চৌধুরী সাহেবের হত্যারহস্য উদঘাটন করা।
হ্যাঁ, আমার ইচ্ছাও তাই। আপনি এ ব্যাপারে জোর তদন্ত শুরু করুন। কেসটা অত্যন্ত জটিল এবং ঘোরালো বলে মনে হচ্ছে।
ইয়েস স্যার, চৌধুরী সাহেবের হত্যার পিছনে একটা গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে।
সে রহস্যই উদঘাটন করতে হবে। কথাটা বলতে বলতে কক্ষে প্রবেশ করেন ভগবৎ সিং।
মিঃ হারুন ভগবৎ সিংকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। যতক্ষণ না আসল খুনী ধরা পড়ছে ততক্ষণ তো কারো উপরে অসৎ ব্যবহার করা চলে না।
হ্যাণ্ডশেক করার জন্য মিঃ জাফরীর দিকে হাত বাড়ালেন ভগবৎ সিং।
মিঃ জাফরী হাত তুলে একটু আদাব জানালেন মাত্র।
ভগবৎ সিং আসন গ্রহণ করে বলেন–দেখুন ইনসপেক্টর সাহেব, কাল থেকে আমার মনে এতটুকু শান্তি নেই। কারণ, চৌধুরী সাহেব আমার বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেছেন। একটু থেমে পুনরায় বলেন–যতক্ষণ না এ হত্যারহস্য প্রকাশ না পাবে ততক্ষণ আমার এ অশান্তি যাবে না।
মিঃ হারুনই জবাব দেন–আমরা হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা নিচ্ছি।
মাথা চুলকে বলেন ভগবৎ সিং–ভয় হয় আমার ঘাড়ে না আবার কোন দোষ চেপে বসে।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন সিং বাহাদুর। আমরা নির্দোষীর ঘাড়ে কোন সময় দোষ চাপাবো না। মিঃ হারুন মৃদু হেসে কথাটা বলেন।
মিঃ জাফরী গভীর কণ্ঠে বলে উঠেন–আপনার বাড়িতে যখন হত্যাকাণ্ডটা ঘটেছে, তখন। আপনাকে একটু কষ্ট ভোগ করতে হবে বৈকি। তাছাড়া যতক্ষণ আসল হত্যাকারী আবিস্কার না হয়েছে ততক্ষণ আপনি সম্পূর্ণ নির্দোষ হতে পারছেন না।
