ডাক্তার জয়ন্ত সেন চৌধুরী সাহেবের পাশেই বসে খাচ্ছিলেন। তিনি হাতখানা তাড়াহুড়ো করে পরিষ্কার করে নিয়ে চৌধুরী সাহেবের পাশে বসে পড়লেন। চৌধুরী সাহেবের হাতখানা হাতে তুলে নিয়ে নাড়ী পরীক্ষা করতে লাগলেন।
মিঃ আলম একবার ডাক্তার জয়ন্ত সেনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলেন। চৌধুরী সাহেবের মুখ দিয়ে তখন ফেনাযুক্ত লালা গড়িয়ে পড়ছে।
মিঃ হারুন ঝুঁকে পড়ে বললেন– একি হল? হঠাৎ চৌধুরী সাহেবের হল কি!
ভগবৎ সিং তো হায় হায় করতে শুরু করলেন। তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে ডাক্তার জয়ন্ত সেনকে লক্ষ্য করে বলেন– ডাক্তার বাবু, দেখুন। আপনি একটু ভাল করে দেখুন ভদ্রলোকের হল কি!
মিঃ আলমের মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে পড়েছে, কঠিন কণ্ঠে বলেন– চৌধুরী সাহেবকে বিষ পান করানো হয়েছে।
অদ্ভুদ শব্দ করে উঠলেন মিঃ হারুন– বিষ!
মিঃ হোসেন বললেন– দেখছেন না চৌধুরী সাহেবের মুখ দিয়ে কেমন ফেনাযুক্ত লালা গড়িয়ে পড়ছে। বিষ ছাড়া কিছু নয়।
কিন্তু এ বিষ তার খাবারে কেমন করে এলো। কথাটা বলেন মিঃ শঙ্কর রাও।
মিঃ জাফরী কটমট করে তাকালেন ভগবৎ সিং-এর দিকে। তারপর গর্জন করে উঠলেন সিং বাহাদুর, আপনার বাড়িতে খাবার খেতে এসে চৌধুরী সাহেবের এ অবস্থা। কাজেই এজন্য আমি আপনাকে দোষী সাবাস্ত করছি।
ডাক্তার জয়ন্ত সেন বললেন– না না, উনার কোন দোষ নেই। চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে একই খাবার আমরা কয়েকজন মিলে এক টেবিলে খাচ্ছিলাম। খাবারে বিষ মেশানো থাকলে আমাদের কয়েকজনের অবস্থা এতক্ষণ চৌধুরী সাহেবের মতই হত।
তাহলে চৌধুরী সাহেবের খাবারে বিষ এলো কোথা থেকে।
পুনরায় মিঃ জাফরী হুঙ্কার ছাড়লেন।
সমস্ত হলঘরে একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। কার মুখে কথা সরছে না। হতভম্ভের মত তাকাচ্ছেন পুলিশ অফিসারদের মুখের দিকে।
শেষ পর্যন্ত সবাই একবাক্যে বললেন ভগবৎ সিং চৌধুরী সাহেবকে বিষ প্রয়োগের ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। তিনি এসবের কিছুই জানেন না।
এদিকে কয়েকজন ভদ্রলোক ডাক্তার ডাকতে ছুটলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যেই শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ডাক্তার এসে উপস্থিত হলেন। চৌধুরী তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন।
ডাক্তারগণ প্রাণপণে চৌধুরী সাহেবকে আরোগ্য করার চেষ্টা করতে লাগলেন।
কিন্তু সকল আশা বিফল হল। ডাক্তারদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় ভরে উঠল। চৌধুরী সাহেব মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।
সবাই যখন চৌধুরী সাহেবের লাশ ঘিরে ধরে নানারকম আলোচনা করছেন, তখন সকলের অলক্ষ্যে মিঃ আলম বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে।
খবর পেয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে চৌধুরী বাড়ি থেকে ছুটে এলেন সরকার সাহেব এবং মরিয়ম বেগম। মনিরাও এলো তাদের সঙ্গে।
কিছুক্ষণ পূর্বে যে কক্ষে একটা আনন্দের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, এক্ষণে সে কক্ষে কান্নার রোল উঠল। মরিয়ম বেগম স্বামীর বুকে আছাড় খেয়ে পড়লেন।
মনিরা তো মামুজানের মুখে-বুকে হাত বুলিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। পিতামাতাকে হারানোর পর এই মামা-মামীই ছিল তার সম্বল। মামাকে হারিয়ে মনিরা আজ চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগল।
বৃদ্ধ সরকার সাহেব এ দৃশ্য সহ্য করতে পারছিলেন না।
তিনি চৌধুরী সাহেবের শিহরে দাঁড়িয়ে রুমালে চোখ ঢেকে ছোট্ট বালকের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
সরকার সাহেব আজ ত্রিশ বছর পর্যন্ত চৌধুরী বাড়িতে হিসাব নিকাশের কাজ করে আসছেন। চৌধুরী সাহেবের অত্যন্ত বিশ্বাসী লোক তিনি। সরকার সাহেবই চৌধুরীবাড়ির সর্বক্ষণ দেখাশোনা করতেন। এমনকি বাজারের হিসাবটাও ছিল সরকার সাহেবের হাতে। চৌধুরী সাহেব ভুলেও কোনদিন সরকার সাহেবের নিকট হতে কোনো হিসাব-নিকাশ নিতেন না। তার উপরেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন চৌধুরী সাহেব।
সরকার সাহেবও চৌধুরী সাহেবকে নিজ বড় ভাইয়ের মতই মনে করতেন। চৌধুরী সাহেবের অজ্ঞাতে তিনি কোনদিন একটা পয়সাও নিজের জন্য ব্যয় করতেন না।
এসব কারণেই উভয়ের মধ্যে ছিল একটা নিগুঢ় ভ্রাতৃসম্বন্ধ। চৌধুরী সাহেবের মৃত্যু সরকার সাহেবের অস্থির্পাঁজর যেন চূর্ণ করে দিয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত মিঃ জাফরী লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন এবং যতক্ষণ আসল দোষী ধরা না পড়ে ততক্ষণ ভগবৎ সিং এর উপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিলেন।
.
শোকাতুরা মরিয়ম বেগম এবং মনিরা অসহায়ের মত আকুল হয়ে কাঁদছেন। আজ তারা বড়ই নিরুপায়? একমাত্র তাদের সম্বল ছিলেন চৌধুরী সাহেব। তিনিই আজ চলে গেছেন–শুধু গেছেন নয়, চিরতরে বিদায় নিয়ে গেছেন। আর কোনদিন ফিরে আসবেন না।
মরিয়ম বেগম আর মনিরা চৌধুরী সাহেবের শোকে এতই কাতর হয়ে পড়েন যে, সরকার সাহেব এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন সান্ত্বনা দিয়েও তাদের দুজনকে এতটুকুও শান্ত পর্যন্ত করতে পারলেন না।
দূর-দূরান্ত থেকে বহু লোকজন এলেন চৌধুরী সাহেবের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। সবাই চৌধুরী সাহেবের মৃত্যুশোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন। কারও চোখ শুষ্ক রইল না। চৌধুরী সাহেবের এ আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা শহরে একটা শোকের ছায়া পড়ল লোকের মুখে মুখে কাগজে কাগজে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল কথাটা।
চৌধুরী সাহেবের লাশ যখন জানাযার জন্য বাড়ির সম্মুখস্থ বাগানে রাখা হলো, তখন অসংখ্য লোকের মধ্যে সকলের অলক্ষ্যে আর একজন এসে দাঁড়াল গোলাপঝাড়ের পাশে চৌধুরী সাহেবের শিয়রে! নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে চলেছিল সে।
