চিঠিখানা পড়া শেষ করে ভাজ করতে করতে বললো বনহুর রাজা মঙ্গলসিংহের বিধবা পত্নী হেমাঙ্গিনী এর আসল পরিচয়, রাজা মঙ্গলসিংহ হঠাৎ শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হন, বহু সন্ধান করেও তাকে আর পাওয়া যায়নি। মঙ্গল সিংহের প্রথমা পত্নীর গর্ভজাত সন্তান রানা বিজয় সিংহের বয়স তখন কিছু কমছিলো, তাই সে পিতার সন্ধান ঠিক ভাবে করতে পারেনি। কয়েক বছর পর রানা বিজয় সিংহ পিতার নিরুদ্দেশ ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করলো এবং সন্ধান করতে লাগলো। বিমাতা হেমাঙ্গিনী তাকে আদর দিয়ে বলেছিলো, তোমার বাবা মঙ্গল সিংহকে সিংহ ভক্ষণ করেছিলো। তাই তাকে আমরা খুঁজে পাইনি। তুমিও পাবেনা কোনদিন।
মা হারা বিজয় সিংহ পিতার নির্মম পরিণতির কথা ভেবে মুষড়ে পড়লো।
বিমাতা হেমাঙ্গিনী বিজয় সিংহের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলো, যে যাবার চলে গেছে তার জন্য দুঃখ করোনা বিজয়। আমি তো আছি, কোন চিন্তা করোনা। বিজয় সিংহকে মুখে সান্তনা দিলেও ভিতরে ভিতরে বিজয় সিংহকে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে চললো এই হেমাঙ্গিনী। রাজা মঙ্গল সিংহের মন্ত্রিবর অনাথ সেন, বুঝতে পারলো রাণী হেমাঙ্গিনীর মনের কথা। তার গোপন বাসনা আর কেউ না বুঝলেও বুঝলো সে, তাই অনাথ সেন, রাজা মঙ্গল সিংহের বংশ রক্ষার্থে সর্বক্ষণ পিতৃ মাতৃহারা বিজয় সিংহকে আগলে রাখলো। আর সে কারণেই বিজয় সিংহকে হত্যা করার চেষ্টা ব্যর্থ হলো রানী হেমাঙ্গিনীর।
নূরী বললো–রাক্ষসী রানী এই হেমাঙ্গিনী।
ঠিকই বলেছো নূরী। রাক্ষসীই বটে…
তুমি এতো সন্ধান জানলে কি করে হুর?
মৃদু হাসলো বনহুর।
বললো নূরী-জানি তোমার অজানা কিছু থাকেনা তবু ভাবছি হেমাঙ্গিনীর এতো খোঁজ তুমি পেলে কার কাছে?
মন্ত্রিবর অনাথ সেনের কাছে।
এ নামটা আমি শুনিনি কোনদিন। অনাথ সেন..
হাঁ, বৃদ্ধ অনাথ সেন, অনাথই বটে। নূরী অনাথ সেনের জীবন কাহিনী বিস্ময়কর বটে।
তার জীবন কাহিনীও তুমি জানো নাকি?
বললাম তো রাজা মঙ্গল সিংহের অনাথ মন্ত্রির সঙ্গে দেখা হয়ে ছিলো আমার এবং তার মুখেই অনেক কথা জানতে পারি সেদিন।
আমারও বড় জানতে ইচ্ছা হচ্ছে এই রাজা মঙ্গল সিংহের রাজ পরিবারের কাহিনী সত্যিই রহস্যময়।
হাঁ নূরী, রহস্যময়ই বটে।
বলবে হুর, আজ বহুদিন পর নিভৃতে পেয়েছি তোমাকে বলবো। মন্থনা থেকে ফিরে এসে কান্দাই প্রবেশ পথে একটি বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হলো আমার। তাও আশ্চর্য ভাবে।
কি রকম? বললো নূরী।
আমার কান্দাই শহরের আস্তানার প্রবেশ মুখে একটি কুকুর বসে বসে হাঁপাচ্ছিলো। আমি অশ্ব থেকে নামতেই কুকুরটা আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। দেখলাম তার গলার বেল্টে একটি কাগজের টুকরা।
আমি কুকুরটির মাথায় হাত বুলোতেই সে লেজ নেড়ে কিছু বলতে চাইলো, আমি বুঝলাম তার গলার বেল্টের কাগজ খানার কথাই সে বলতে চাইছে। আমি তার গলার বেল্ট থেকে কাগজের টুকরাটা খুলে নিয়ে পড়লাম, তাতে লিখা আছে
দস্যুসম্রাট আমার অভিবাদন গ্রহণ করো। আমি রাজা মঙ্গল সিংহের মন্ত্রি অনাথ সেন। একটা ভীষণ বিপদে পড়ে তোমার সাহায্য ভিক্ষা করতে এসেছি। তুমি ছাড়া কেউ পারবেনা। এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। যদি সাক্ষাতের অনুমতি দাও তবে ধন্য হবো।
–অনাথ
চিঠিখানা পড়ে কুকুরকে বললাম-যাও নিয়ে এসো তাকে।
আর তুমি?
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।
একটু পর কুকুরের পিছনে পিছনে এলো এক বৃদ্ধ তার শরীরে ছিন্ন ভিন্ন বস্ত্র হাতে লাঠি। আমার সম্মুখে এসে দু’হাত জড়ো করে প্রণাম করলো।
আমি তাকে এবং তার কুকুরটিকে সঙ্গে করে গোপন সুড়ঙ্গ পথ ধরে নিয়ে গেলাম ভূগর্ভ আস্তানায়। অনাথ সেন আসন গ্রহণ করলো, তার পাশে বসে পড়লো তার বিশ্বস্ত কুকুরটা, যেন সেও একজন অতিথি।
অনাথ সেনের মুখ মন্ডলে বিষণ্ণতার ছাপ বিদ্যমান, ঘোলাটে চোখে একটা ভীত ভাব ফুটে উঠেছে যেন। এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো সে। আমি বললাম-বলুন যা বলতে চান?
অনাথ সেন বললো–আমি যা বলবো ধৈর্য সহকারে শুনতে হবে। আমি জানি তুমি মানুষের মঙ্গল চিন্তা করো আর সে জন্যই ঈশ্বর আমাকে তোমার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
বলুন কি আপনার বিপদ? যদি আমার কিছু করণীয় থাকে করবো।
আমার কথায় কতকটা আশ্বস্ত হলো অনাথ সেন এবং বললো–বিপদ ঠিক আমার নয় রাজকুমার বিজয় সিংহের।
আমি অবাক হয়ে বললাম-নিজের কান্না না কেঁদে আপনি অপরের জন্য কাঁদতে এসেছেন?
বললো অনাথ সেন সত্যি দস্যু সম্রাট তুমি ঠিকই বলেছো। রাজ কুমার বিজয়সিংহ আমার কেউ নয়। তবে কেনো আমার মন তার জন্য কাঁদে। একটু থেমে চোখ দুটো হাতের পিঠে মুছে নিয়ে বললো পিতৃ মাতৃ হারা এই ছেলেটি আমার মতই অনাথ। আমার যেমন কেউ নেই, রাজকুমার বিজয় সিংহেরও কেউ নেই। রাজা মঙ্গল। সিংহের একমাত্র সন্তান বিজয় সিংহ। হিন্দল রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী বিজয় সিংহকে তারই বিমাতা রাণী হেমাঙ্গিনী এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে।
অনাথ সেন আবার থামলো তারপর নিজকে সামলে নিয়ে গলার স্বর স্বাভাবিক করে বলতে শুরু করলো-আমি যখনই বুঝতে পারলাম রাণী হেমাঙ্গিনী এই শিশু পুত্রটিকে হত্যার চেষ্টা করছে তখন থেকেই আমি তাকে নিজের কাছে কাছে রেখে সাবধানে তার উপরে খেয়াল রাখলাম। ইতি পূর্বে রাণী হেমাঙ্গিনী রাজা মঙ্গল সিংহকে শিকারে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করেছে। শিকার থেকে ফিরে এসে হেমাঙ্গিনী ও তার সহকারীগণ প্রচার করেছিলো রাজা মঙ্গল সিং হিংস্র জন্তুর কবলে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু আসলে তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। পরে আমি জানতে পারি রাণী হেমাঙ্গিনী, জলের সঙ্গে অজ্ঞানের ঔষধ মিশিয়ে রাজাকে খেতে দেয়। রাজা বিনা দ্বিধায় সেই জল পান করে এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন হেমাঙ্গিনী তার প্রধান সহচর রথীন্দ্রকে অর্পণ করে রাজাকে কোন গোপনস্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে। রথীন্দ্র রাণী হেমাঙ্গিনীর নির্দেশ পালনে রাজা মঙ্গল সিংহকে সরিয়ে নিয়ে গেলো।
