রাণী হেমাঙ্গিনী অন্যান্য অনুচর সহ ফিরে এলো হিন্দলে। রাজা মঙ্গল সিংহ শিকারে গিয়ে হিংস্র জন্তর কবলে প্রাণ হারিয়েছেন এ কথা রাজ্যময় প্রচার হলো।
গোটা রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এলো। রাণী হেমাঙ্গিনী বিধবার ড্রেস পরিধান করে অন্তপুরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করলো সে। আমি নিজেও মর্মাহত হয়ে পড়লাম, রাজা মঙ্গল সিংহ আমাকে ভাল বাসতেন, বিশ্বাস করতেন। তার মৃত্যু আমার হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলো। সেদিন বুঝিনি বা বুঝতে পারিনি রাণীর এ কান্না সত্যি কারের কান্না নয়, এটা তার অভিনয়। সুদীর্ঘ সময় কেটে গেলো। হেমাঙ্গিনী নিজে রাজ্য পরিচালনা করে চললো। তার খেয়াল খুশিমত কাজ করে চললো, প্রজাগণ রাণী হেমাঙ্গিনীর আচরণে সন্তুষ্ট হলো না। এমন কি সকলের সঙ্গেই রানী অসৎ আচরণ করে চললো, রাজ কর্মচারীদের সঙ্গেও তার বিরুপ মনোভাব প্রকাশ পেলো।
আমার বয়স হয়েছিলো তাই আমাকে কিছুটা সমীহ করে চলতো। অবশ্য কারণ ছিলো বিজয় সিংহের সমস্ত দায়িত্ব ভার আমিই গ্রহণ করেছিলাম, বিজয় সিংহকে রাণী কোন মুহূর্তে কাছে পেতোনা। তাই কিছুটা আমাকে ভয় করতো ভিতরে ভিতরে।
দিন যায়, কুমার বিজয় সিংহ এখন তরুন। তার বোঝার মত ক্ষমতা হয়েছে। অনেক কিছুই বোঝে সে, আর বোঝে বলেই আমি তাকে অনেক গোপন কথা বলেছি। তাই সে নিজের ব্যাপারে সজাগ। বনহুর আমি একদিন জানতে পারি রাজা মঙ্গল সিংহকে হত্যা করা হলেও আসলে তাকে হত্যা করা হয়নি। তাকে কোন গোপন গুহায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। রথীন্দ্র সেদিন রাণী হেমাঙ্গিনীর নির্দেশ পালনে রাজাকে হত্যার জন্য অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেলেও হত্যা করতে পারেনি, তাকে সকলের অলক্ষে একটি পর্বতের গুহায় আবদ্ধ করে রেখেছিলো। সুদীর্ঘ বারোটি বছর রাজা মঙ্গল সিংহ আটক আছে সেই গুহায়। আজ রথীন্দ্র বৃদ্ধ, সে রাজ দরবারে কাজ করে এবং গভীর রাতে সেই গুহায় প্রবেশ করে রাজা মঙ্গল সিংহকে যৎ সামান্য খাবার খাইয়ে দিয়ে আসে।
অনাথ সেন বলেই চলেছে-রাণী হেমাঙ্গিনী রথীন্দ্রর সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করতো, তাই সে একদিন সব গোপন কথা আমার কাছে ব্যক্তি করলো। সেদিন আমি খুব খুশি হলাম, রথীন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম তুমি যে কাজ করেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন। রাজা বাহাদুরকে তুমি হত্যা না করে জীবিত রেখে তাকে সুদীর্ঘ সময় খাদ্যদান করে রক্ষা করে এসেছো এটা মহা পূণ্যের কাজ করেছো ভাই। তখন রথীন্দ্রই আমাকে পরামর্শ দিলো, রাণী হেমাঙ্গিনী যদি জানতে পারে মহারাজ মঙ্গল সিংহকে আমি হত্যা না করে জীবিত রেখেছি তা হলে সে ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে হত্যা করবে এবং রাজাকেও সে জীবিত রাখবেনা। রথীন্দ্রকে আমি বলেছিলাম, তাহলে রাজা মঙ্গল সিংহ কি চিরদিনের জন্য সবার কাছে মৃতই থেকে যাবেন? রথীন্দ্র তখন আমাকে বলেছিলো, রাণী হেমাঙ্গিনী হিন্দলের রাজসিংহাসনের অধিকারিণী এবং তার একটি গুপ্ত গুহা আছে সেখানে তার শতাধিক সহকর্মী আছে যারা তার অপকর্মে সর্বক্ষণ সহায়তা করে চলেছে। তাদের সহযোগীতায় রাণী হেমাঙ্গিনী একটি স্বর্ণসিংহাসন তৈরি করছে যে স্বর্ণসিংহাসন পৃথিবীর কোন রাজা মহারাজা তৈরি করতে পারেনি। এ সব দেশে থেকে স্বর্ণ নিয়ে গিয়ে অন্যদেশ দেশান্তর থেকে খাঁটি স্বর্ণ নিয়ে এসে এই সিংহাসন তৈরি হচ্ছে। এই পৃথিবীর সব চেয়ে বড় দামী দামী কারিগর দ্বারা এই সিংহাসন তৈরি হচ্ছে। এই হেমাঙ্গিনীকে একমাত্র ব্যক্তি আছে সেই পারবে কাবু করতে সে হলো দস্যু বনহুর। তাই অনেক দিনের প্রচেষ্টার পর আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি এটা ঈশ্বরের দোয়া। রথীন্দ্র যদিও তোমার সন্ধান দিয়েছে কিন্তু পথ দেখিয়ে দিয়েছেন পরম করুণাময়। এই কুকুরই আমার পথ প্রদর্শক…কথাটা বলে অনাথ সেন কুকুরের মাথায় পিঠে সঙ্গে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
নূরী স্বামীর মুখে এই বিস্ময়কর কাহিনী শুনছিলো, এবার বললো–তুমি হেমাঙ্গিনীর এ চিঠি কোথায় পেলে?
সেই কুকুর, বুঝলে নূরী সেই কুকুর এই চিঠিখানা বহন করে এনেছে। তবে আমার শহরের আস্তানায় এ চিঠিখানা পৌঁছে দিয়েছে সে। চিঠিখানা হেমাঙ্গিনীর লিখা কিন্তু অনাথ সেনের কুকুর এ চিঠি নিয়ে এলো কেন? আমি এ চিঠি খানা এবং কুকুরটিকে নিয়ে ভাবছি।
নূরী বললো–হাঁ, রহস্যময় বটে। তবে কি অনাথ সেনের কোন দূরভিসন্ধি আছে এ সবের পিছনে?
বনহুর কি যেন গভীর মনযোগ সহকারে ভাবছিলো, নূরীর কথার কোন জবাব দিলোনা সে।
এ কুকুরটি তবে কার, রাণী হেমাঙ্গিনীর না অনাথ সেনের।
বনহুর বললো এবার-নূরী কুকুরটি যে অনাথ সেনের সঙ্গে আমার শহরের আস্তানায় এসেছিলো তা হেমাঙ্গিনী টের পেয়ে গেছে। অনাথ সেনকেও হয় হত্যা নয় বন্দী করে রেখে কুকুরটিকে হেমাঙ্গিনী ব্যবহার করেছে।
হাঁ, তোমার অনুমান সত্য হতে পারে। কুকুরটিকে তুমি ছেড়ে দিয়ে ভুল করেছে।
না ভুল করিনি নূরী বরং তাকে ছেড়ে দিয়ে আমি গোপনে তাকে অনুসরণ করে। পথের সন্ধান পেয়েছি। কুকুরটি সোজা সেই পর্বতের দিকে চলে গেলো, যেখানে রাণী হেমাঙ্গিনী তার দলবল নিয়ে একটি আড্ডাখানা বা আস্তানা তৈরি করে নিয়েছে। আমি আর এগুনি, কারণ আমি হেমাঙ্গিনীকে এ ভাবে জানাতে চাইনা যে সে জানুক আমি কুকুরটিকে ফলো করেছি হাঁ, পরে সব জানবে নূরী। তারপর আপন মনে বলে বনহুর–অনেক কিছু জানার এবং করার বাকি আছে। সেই পর্বতের কোন স্থানে রয়েছে হেমাঙ্গিনীর আস্তানা, কোন জায়গায় অনাথ সেনকে বন্দী বা নিহত অবস্থায় রাখা হয়েছে আর কোথায় বা বন্দী অবস্থায় আছেন রাজা মঙ্গল সিংহ। তারপর রাজা মঙ্গল সিংহের পুত্র বিজয় সিংহই বা কি অবস্থায় কেমন ভাবে আছে…
