মনিরা বনহুরের জামাটা চেপেধরে ভীতভাবে বলে উঠলো—না না, আর এগুবে না। ফিরে চলল, ফিরে চল তুমি…
বনহুর মনিরার কথায় কান না দিয়ে বললোজনহীন দ্বীপে মনুষ্য কংকাল, আশ্চর্য বটে…
[পরবর্তী বই বিস্ময়কর গুহা]
রনজিৎ বর্মার রক্তাক্ত দেহ ভূতলে পড়ে রইল। ছোরাখানা রনজিৎ বর্মার বুক থেকে টেনে তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে মেঝের কার্পেট খানা সিক্ত হয়ে উঠলো।
মায়াবতী বিস্ময় নিয়ে বললো–কে আপনি! আপনি না এলে ও আমার সর্বনাশ করতো…বলুন কে আপনি?
হেসে বললো বনহুর–যে আপনার স্বামীকে পঙ্গু আর অন্ধ করে দিয়েছে আমি সেই ব্যক্তি। আর আপনার কোন ভয় নেই। এ বাড়ি নিলামে উঠবেনা। আপনার এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে হবেনা।
কিন্তু আপনি কে?
আমাকে দেখে এবং আমি আপনার স্বামীর এতোবড় ক্ষতি করেছি জেনেও আমার পরিচয় সহজ ভাবে জানতে চাইছেন?
হাঁ, জানতে চাই…আপনি যেই হোন আমি বলবো-আপনি দেবতা। নারীর সবচেয়ে বড় সম্পদ ইজ্জৎ, সেই সম্পদ আপনি রক্ষা করেছেন। আমার স্বামীর কর্মের উপযুক্ত শাস্তি আপনি দিয়েছেন। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি সত্য, কিন্তু আপনার উপর আমার কোন রাগ হয়নি।
এমন সময় রাজাসিংহ হাতড়াতে হাতড়াতে এ ঘরে প্রবেশ করে আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো।
রানীমাতা স্বামীকে তুলে ধরে দাঁড় করিয়ে বললো–ওগো আমাদের চরম শত্রু রনজিত্বৰ্মা নিপাত হয়েছে…আমাদের শত্রু সেই বাড়ি নিলামে ডেকে নেবার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলো তারই চক্রান্তে আমরা আজ নিঃস্ব এই দেখো কে এসেছে……ফিরে তাকাতেই দেখলো রাণীমাতা জমকালো পোশাক পরিহিত সে আর নেই, যে পথে এসেছিলো সেই পথে বেরিয়ে গেছে।
*
বনহুর তার বিশ্রামাগারে অর্ধ শায়িত অবস্থায় রিভলভারটা নাড়া-চাড়া করে দেখছিলো। তার সুন্দর মুখমন্ডলে একটা দুঃচিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। বসে থাকার বা বিশ্রাম করার মানুষ বনহুর নয়। আজ সে শান্ত মানুষটির মত শয্যায় অর্ধশায়ীত অবস্থায় কি যেন গভীর মনোযোগ সহকারে ভাবছিলো।
এমন সময় নূরী এলো তার পাশে, একটু হেসে বললো–এতো কি ভাবছে দস্যরাজ?
তোমাকে বলা যাবেনা।
কেন আমার কি অপরাধ?
বাধা হানবে আমার শুভ যাত্রায়।
শুভ যাত্রা!
হাঁ, শুভ যাত্রাই বটে……একটি চিঠি বের করে নূরীর হাতে দেয় বনহুর।
নূরী বলে-আমি কি পড়তে পারি। তুমিই পড়ো।
বনহুর নূরীর হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে পড়তে লাগলো–
বনহুর, আমি কে বা আমার কি পরিচয় তুমি জানোনা তুমি আমাকে দেখোনি কোন দিন। আমি তোমাকে দেখেছি। তোমার পৌরুষদীপ্ত চেহারা আমাকে অভিভূত করেছিলো। আর সেই কারণেই আমি তোমাকে খুঁজেছিলাম, তোমাকে পেয়েওছিলাম কাছাকাছি কিন্তু আমার ব্যক্তিত্ব তোমার কাছ থেকে আমাকে সরিয়ে নিয়েছিল, সরে গিয়েছিলাম দূরে। কোন এক স্থানে। আমার আস্তানা। আস্তানায় ফিরেও মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পাইনি তোমাকে নিজের অজ্ঞাতে ভালবেসে ফেলেছিলাম……..।
থাক আর শুনতে চাইনা। অমন কত নারীই না তোমাকে ভালবেসে জীবন। বিসর্জন দিয়েছে। নূরী মুখ খানা ফিরিয়ে নিলো।
বনহুর বললো—বসো নূরী শেষ অংশটা শুনবেনা।
না আমি আর শুনতে চাইনা। গম্ভীর কণ্ঠে বললো নূরী
। হেসে বললো বনহুর–মেয়েরা মিছামিছি একটুতেই অভিমান করে। অযথা অভিমান করা। আমি তো আর কাউকে ভাল বাসতে যাইনি। শোনই না সবটুকু।
পড়ো তবে ভালবাসার কথা আর শুনতে চাইনা।
বনহুর নূরীর হাত ধরে পাশে বসিয়ে দিয়ে বললো–বসো শোন, এরপর কি লিখেছে। চিঠিখানা পড়তে শুরু করে বনহুর।
কিন্তু আজ আমার প্রধান শত্রু তুমি, তোমার নাম শুনলে শরীরে আমার আগুন ধরে যায়। আমার বিশ্বস্ত অনুচর হামরাকে তুমি হত্যা করেছো বনহুর। হামরা ছিলো আমার প্রিয় অনুচর।
আনমনা হয়ে যায় বনহুর, আপন মনে বলে-হারা। হাঁ হামরা নামক একব্যক্তি-ব্যক্তিকে আমি হত্যা করেছিলাম…..
নূরী বললো–কে সে হামরা? কি করেছিলো সে?
হামরা নামক লোকটি জাহাজ উল্কার চালক হিসাবে কাজ করতো। আমরা জানতামনা হারা কোন চোরাকারবারীর সঙ্গে জড়িত ছিলো। বেশ কিছুদিন সে উল্কাতে নাবিক হিসাবে কাজ করে বিশ্বাস এনেছিলো আমাদের মনে। গোপনে আমারই জাহাজের খোলের মধ্যে সোনা ভরে পাচার করতো সে। না, আমি তাকে ক্ষমা করিনি, জানার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা কারে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেছিলাম তার প্রাণহীন দেহ। সেদিন জানতামনা তার নাম হামরা, সে ছদ্ম নামে আমার এখানে নাবিক হিসাবে কাজ করতো…
কি নির্দয় তুমি!
অট্টহাসি হেসে বললো বনহুর–অন্যায় কারী যেই হোক তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া আমার কাজ।
তুমি তাতে জয়যুক্ত হতে পেরেছে হুর?
জয় যুক্ত হতে পারিনি তবে কিছু কিছু সফল কাম হয়েছি।
তুমি চিঠিখানা এবার শেষ করে ফেলো। বললো নূরী।
বনহুর চিঠিখানা ভাল ভাবে চোখের সম্মুখে মেলে ধরে বললো–কয়েক বার শেষ করেছি চিঠিখানা। তবে শোন…
হামরাকে আমিই পাঠিয়ে ছিলাম এবং সুকৌশলে সে তোমার উল্কায় স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছিলো। আমি যে খানে বাস করি সেখানে কেউ কোন দিন প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু মনে রেখো বনহুর তুমি হাম্রাকে হত্যা করে। রেহাই পাবেনা। আমার হাতে তোমার নিস্তার নাই, আমার অনুচর হাম্রাকে হত্যার প্রতিশোধ আমি নেবো। আমার স্বর্ণ সিংহাসন তোমার রক্তে রঞ্জিত করবোই করবো।
—রানী হেমাঙ্গিনী
