বনহুর হেসে বললো–বড় ঘাবড়ে গেছে মনিরা! জানো আমরা এখন এমন এক দ্বীপের দিকে অগ্রসর হচ্ছি যে দ্বীপে কোনো সময় কোনো মানুষ পৌঁছতে পারেনি।
মনিরা বললো—জানি না তুমি কোথায় চলেছো? জানি না কোন সে দ্বীপ? চলো বিশ্রাম করবে চলো। ইঞ্জিনের ধোয়া আর গরমে তোমার চেহারা কি হয়েছে।
সর্দার, আপনি যান। আমি আছি জনের পাশে। তাছাড়া মাহবুব, মরিং রুসো এরাও আছে।
বনহুর বললো—চলো মনিরা।
*
স্বামীসহ ফিরে এলো মনিরা ডুবু জাহাজের বিশ্রাম ক্যাবিনে।
স্বামীর হাত ধরে বসিয়ে দিলো সে তাকে বিছানার একপাশে! আঁচলে ওর ললাটের ঘাম মুছিয়ে দিয়ে বললোতোমার দেহ কি লোহা দিয়ে তৈরি তোমার এতোটুকু ক্লান্তি-অবসাদ
না। না মনিরা। ক্লান্তি অবসাদ আজও আমাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। তাছাড়া তুমি তো আমাকে কোনো সময় অবসাদগ্রস্ত দেখতে চাওনি মনিরা?
হাঁ, চাই না তাই বলে তুমি.
থাক অনেক বলেছো, আর নয়! বনহুর মনিরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। তারপর একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বললোমনিরা, এমন করে তোমাকে পাবো এ যে আমার কল্পনার অতীত। এখন আমরা খুব সুখী, তাইনা?
মোটেই তুমি সুখী নও, আমি সুখী। কারণ তোমাকে পাশে পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত যদিও একটা ভয় সর্বক্ষণ আমাকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
তুমি মিছামিছি আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছে মনিরা।
মনিরা স্বামীর বুকে মাথা রাখলো।
*
রাতদিন একটানা চলার পর ডুবু জাহাজখানা মাথুন দ্বীপের কাছাকাছি এসে পৌঁছলো।
রহমান এসে জানালে তারা আজকেই মাথুনকে অবতরণ করতে সক্ষম হবে।
ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের জাহাজ যে পাশে অবস্থান করছিলো তার অপর পাশে বনহুরের ডুবু জাহাজখানা এসে থামলো। গভীর জলের তলদেশে। বনহুর এবং তার সঙ্গীদের ধারণা এ দ্বীপে আজও কোনো মানুষ পদার্পণ করে নি।
বনহুর রহমানকে নির্দেশ দিলো ডুবু জাহাজখানাকে সমুদ্র তলদেশ হতে কিছুটা উপরে তুলে নেওয়ার জন্য। টেলিভিশন ক্যামেরা চালু করে দেওয়া হলো।
বনহুর এসে বললো টেলিভিশন পর্দার সামনে।
মাথুন দ্বীপের সমস্ত অংশ ক্যামেরায় ধরা না পড়লেও কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। বনহুর আনন্দধ্বনি করে উঠলো, রহমান দেখো দেখো মাথুন দ্বীপের উঁচু নীচু টিলাগুলো স্বর্ণকণিকা দ্বারা ভরে রয়েছে। উজ্জলতারকা খচিত মনে হচ্ছে মাথুন দ্বীপের স্তরগুলো…
হাঁ সর্দার। বললো রহমান।
সকলের দৃষ্টি টেলিভিশন পর্দায়।
এমন কি মনিরাও আছে সেখানে। সকলেরই চোখেমুখে খুশির উচ্ছ্বাস।
মাহবুব বলে ওঠে-সর্দার, বহু দ্বীপ আমরা দেখেছি কিন্তু এমন মনি মানিক-খচিত স্বর্ণদ্বীপ আমরা দেখিনি।
রহমান বললো–বিলম্ব না করে নেমেপড়া সমচীন সর্দার।
হাঁ, আমারও তাই মনে হয়। বললো বনহুর।
ডুবুজাহাজখানাকে আরও কিছুটা এগিয়ে নেওয়া হলো।
এবার সাবমেরিন ধরনের ছোট ছোট কয়েকটি জলযান বের করে নেওয়া হলো ডুবু জাহাজ থেকে। তারপর সবাই মিলে এসে হাজির হলো মাথুন দ্বীপে।
বনহুর আর মনিরা একটি যানে।
মাটিতে পা রেখে আনন্দে আত্মহারা হলো মনিরা। দু’হাতে স্বামীর হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বললো—উঃ! কি সুন্দর! মুক্ত আকাশের তলে, মুক্ত বাতাসে-সোনালী সূর্যের আলো আমার বড় ভাল লাগছে…
সত্যি মনিরা, আমারও খুব ভাল লাগছে। বললো বনহুর।
মনিরা হেসে বললো—তোমার আবার বোধশক্তি আছে নাকি?
তুমি আমাকে একটি পাথরের সঙ্গে তুলনা করছো মনিরা?
হাঁ, কতকটা তাই। তোমার মধ্যে যদি প্রাণ থাকতো, তোমার যদি বোধ শক্তি থাকতো তাহলে তুমি অমন পাষাণের মত….
মনিরার কথা শেষ হয় না, রহমান আর মাহবুব মুঠায় বালু আর মাটি নিয়ে এগিয়ে এসে ব্যস্তকণ্ঠে বলে–সর্দার, দেখুন মাটি আর বালুর সঙ্গে সোনা!
এতোক্ষণ বনহুর আর মনিরা অন্যমনস্ক ছিলো, এবার তারা মাহবুব আর রহমানের হাতের মুঠার বালু মাটির দিকে তাকালো। সত্যি বিস্মিত হলো বনহুর আর মনিরা। তারা পায়ের তলায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আনন্দধ্বনি করে উঠলো! অদ্ভুত আর সুন্দর এই মাটি। মাথুন দ্বীপ সবার চোখে রাশি রাশি বিস্ময় ছড়িয়ে দেয়।
মনিরা দু’হাতে সোনা মেশানো মাটি তুলে নিয়ে আঁচলে রাখছে। আরও নিচ্ছে সে আঁচলভরে।
বনহুর হেসে বললো—কত নেবে মনিরা? এ দ্বীপের সমস্ত মাটিতে সোনা আর সোনা ছড়িয়ে আছে, দেখছোনা কত সোনা ছড়িয়ে আছে মাটির সঙ্গে।
রহমান, মাহবুব আর যারা তাদের সঙ্গে এসেছিলো সবাই মুগ্ধ অভিভূত এতো সোনা চারদিকে, চোখ ধাধিয়ে যায়।
বনহুর, মনিরা, রহমান ও সঙ্গীরা সবাই এগিয়ে চললো।
সর্বাগ্রে বনহুর স্বয়ং।
কিছুদূর অগ্রসর হয়ে বললো বনহুর–একেবারে জন প্রাণীহীন মাথুনদ্বীপ। চারদিকে একটি প্রাণীও নেই; কোনো জীবের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
সর্দার, এ কথা আমরা শুনেছিলাম কিন্তু এবার চাক্ষুষ দেখছি, মাথুন দ্বীপ জনপ্রাণীহীন।
হঠাৎ একজন ছুটে এলোসর্দার, ঐখানে একটি সিগারেটের টুকরা পেলাম! এই দেখুন সর্দার! এই দেখুন…
বনহুর সিগারেটের টুকরাটা হাতে নিয়ে ভ্রুকুঞ্চিত করে বললো–হাঁ, আমাদের পূর্বে কোনো মানুষ এখানে পদার্পণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তারা কারা?
বনহুরের গলার স্বর গম্ভীর শোনালো।
আবার এরা এগুতে লাগলো।
বেশ কিছুটা এগুনোর পর অকস্মাৎ চিৎকার করে উঠলো রহমান–সর্দার মানুষের কংকাল…ঐ দেখুন সর্দার…
সবাই একযোগে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সামনে একটা ঝোঁপের পাশে পড়ে আছে একটি মানুষের কংকাল।
