বললো বনহুর—আমাদের ডুবুজাহাজখানা মাথুন দ্বীপের কাছাকাছি এসে পড়েছে।
সর্দার।
হাঁ রহমান।
সর্দার, আমাদের তাহলে রক্ষা নেই। সেই ভয়াবহ জীবটার সঙ্গী এরা…
কচ্ছপটা ততক্ষণে আরও এগিয়ে এসেছে।
কি ভয়ংকর তার চোখ দুটো।
কচ্ছপটা ডুবুজাহাজটাকে একটা জলজীব মনে করেছে এবং সে কারণেই মন্থর গতিতে অগ্রসর হচ্ছে ডুবুজাহাজটার দিকে।
মনিরা ভীত আতঙ্কিতভাবে সরে এলো পেছন দিকে।
রহমান বললো—বৌরাণী, কোনো ভয় নেই। কচ্ছপটা আমাদের কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কামান দিয়ে ওর মাথার খুলি উড়িয়ে দেবো এক্ষুণি।
বনহুর বললো–রহমান, দরকার নেই ওর জীবন নাশ করার। বরং আমাদের জাহাজখানা সরিয়ে নেই আরও কিছুটা দূরে!
সর্দার, নতুন কোনো বিপদ আসতে পারে। আমার মনে হয় এখানে আমাদের মোটেই বিলম্ব করা উচিত নয়।
হাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো রহমান।
মনিরাও বললো—তুমি ফিরে চলো আমার কিছু ভাল লাগছে না।
বনহুর বললো—-ভয় পেও না মনিরা, আল্লাহ আমাদের সহায় আছেন। রহমান, আমি ইঞ্জিন ক্যাবিনে যাচ্ছি তুমি মনিরাকে বিশ্রাম ক্যাবিনে রেখে এসো।
মনিরা কিছু বলবার পূর্বেই বনহুর চলে গেলো সেখান থেকে ডুবুজাহাজের ইঞ্জিন ক্যাবিনের দিকে।
রহমান বললো–আসুন বৌরাণী।
মনিরা অগত্যা রহমানকে অনুসরণ করলো।
*
মিঃ বি, কে চৌধুরী মুখখানা রাগে কুৎসিত আকার ধারণ করে, দাঁতে দাঁত পিষে বলে একবার নয়, দু’বার নয়, তিনবার আমি পরাজিত হলাম। বনহুরকে প্রয়োজন আছে আমার। তাকে আটক করার জন্য আমি আমার যথাসর্ব বিনষ্ট করেছি। পারলাম না ওকে বন্দী করে রাখতে।
মিঃ চৌধুরী, আমি আগেই বলেছিলাম তাকে বন্দী করার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করে ফেলুন।
সোলিহ লোরী, তুমি একটা গাধার চেয়েও বুদ্ধিহীন। সুদীর্ঘ সময় আমার সঙ্গে কাজ করেও তুমি আজও এমন এক একটা কথা বলো যা মোটেই যুক্তি সঙ্গত নয়। বনহুরকে হত্যা করলে আমার গোপন বাসনা চরিতার্থ হবে না। আমি বনহুরের দ্বারা কোনো একটা কাজ যা কারো পক্ষে সম্ভব নয় আমি তাই করাতে চাই। তার স্ত্রীকে আটক করার মূল উদ্দেশ্য তাকে জীবন্ত আটক করা এবং তার স্ত্রীসহ তাকে সমুদ্র গহরে গুপ্ত বন্দীশালায় বন্দী করে রাখার পেছনেও ঐ একই উদ্দেশ্য। জানতাম বনহুরকে কোনো সুন্দরী মোহগ্রস্ত করতে পারবে না, তাই তার সহধর্মিণীকে আমি তার পাশে দিয়েছিলাম। সে যেন বাইরের জগতে বেরিয়ে আসার জন্য উন্মাদ না হয়।
তবুও তো…
হাঁ পারলাম না তাকে ধরে রাখতে।
সালিহ লোরী বললো—আমার মনে হয় সাগরতলে আমাদের ডুবন্ত পাহাড়ের গোপন বন্দীশালা বিনষ্ট হবার সময় তার ও তার স্ত্রীর মৃত্যু ঘটেছে।
এ কখনও আমি বিশ্বাস করি না, কারণ অত্যন্ত চতুর বনহুর। সে কেমন করে আমার এই দুর্গম বন্দীশালা বিনষ্ট, বিধ্বস্ত করলো আমি তা ভেবে পাচ্ছি না। ভাগ্যিস আমার ক্ষুদে সাবমেরিনটা সরিয়ে নিয়ে এসেছিলাম নাহলে….
বললো মিঃ চৌধুরীর অপর একজন সঙ্গী–ঐ সাবমেরিনটা সরিয়ে না আনলে আমাদের ভীষণ ক্ষতি সাধন হতো।
আর একজন বললো—এমন কি ক্ষতি হতো! আমাদের সাগরতলে বন্দী গুহা বিনষ্ট হওয়ায় সে ক্ষতি হয়েছে আর তুলনায় একটি সাবমেরিন কিছু না। আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি বনহুর আর তার স্ত্রীর অন্তর্ধান।
একপাশে বসেছিলো মিঃ চৌধুরীর এক তরুণ অনুচর। সে কথা বলতে পারতো না বোবা। কানেও শুনতো না, কিন্তু তার দেহশক্তি ছিলো অসীম। এ কারণেই মিঃ চৌধুরী বন্ধু সোলিহ লোরীর অনুরোধে তাকে তার গোপন আসরে স্থান দিয়েছে। নাম মোরিও শান্ত এবং বোকাও কিছুটা। কোনো কথা সে বলে না, বলতেও পারে না। শুধু কাজ, যে কাজে তাকে লাগানো হয় সেই কাজ সে মনোযোগ দিয়ে করে।
শেষ কথাটা শুনে চমকে উঠলো মোরিও।
কেউ তা লক্ষ করলো না, কারণ তখন তারা নিজেদের গোপন আলোচনায় বিভোর।
মিঃ বি কে, চৌধুরী পায়চারী করতে শুরু করলো।
এতো বড় ক্ষতি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলো না। সব ক্ষতি মিঃ চৌধুরী মেনে নিতে পারেন কিন্তু এমন কোনো ক্ষতি হোক যা তার জীবনকে দূর্বিষহ করে তুলবে। বনহুর তার জীবনের প্রধান শত্রু। মিঃ চৌধুরী তার প্রধান পার্টনার আহসান হাবীবকে পৃথিবী থেকে সরিয়েছে। এখন যারা তার সঙ্গী তারা তার অনুগত দাসের মত। সে একা….
কি ভাবছেন? সোলিহ লোরী বললো।
মিঃ চৌধুরী বললো—আমার অসাধ্য কিছু নেই। আহসান হাবীব হত্যা ব্যাপার নিয়ে পুলিশমহল এখন নানা ধরনের গোয়েন্দা মহলের সাহায্য গ্রহণ করা সত্ত্বেও আসল হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়নি, হবেও না কোনোদিন। পুলিশমহল মনে করছে আহসান হাবীবকে হত্যা করেছে বা এ হত্যা রহস্যের সঙ্গে জড়িত আছে মাদামবাঈ ও তার পার্টনার রীনা নাগ।
সোলিহ লোরী বললো—তাহলে পুলিশমহলের ধারণা কি সম্পূর্ণ ভুল?
তোমাকে কি এমনিই বলি তুমি গাধা। নির্বোধ, মাদামবাঈকেও আমি এনেছিলাম আহসান হাবীবের জলসায় কিন্তু সুচতুরা মাদামবাঈ কৌশলে সরে পড়েছিলেন। নইলে আমি তাকেই পুলিশের হাতে তুলে দিতাম কৌশলে। কিন্তু…
সে সুযোগ মাদামবাঈ দেয়নি আপনাকে। আমার মনে হয় মাদামবাঈ আপনার পরিকল্পনা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েই সরে পড়েছিলো। আমরা কিন্তু সর্বক্ষণ আপনার সঙ্গে থেকেও আপনার অনেক কিছুই জানি না।
তোমাদের ছাড়া আমি কিইবা করেছি। সব তত তোমাদের নিয়েই করি। একলাখ টন শিশুখাদ্য পাচার করার সঙ্গে তোমরা কি ছিলে না?
