বললো বনহুর–মনিরা, খুব আশ্চর্য লাগছে তোমার, তাই না?
হাঁ, এমন সব বিস্ময়কর দৃশ্য আমি কোনোদিন দেখিনি।
যদি সর্পরাজ তিমি খাওয়ায় ব্যস্ত না থাকতো তাহলে আমাদের জাহাজখানাকে ডুবন্ত কোনো জীব মনে করে আক্রমণ করতে।
উঃ! কি ভয়ংকর দৃশ্য! বললো মনিরা।
বনহুর বললো—–আরও ভয়ংকর দেখবার জন্য প্রস্তুত থাকো
তুমি আছো তাই সব ভয় আর ভয়ংকরকে জয় করবো।
মনিরা, তুমি বিশ্রাম ক্যাবিনে বিশ্রাম করবে যাও। ইঞ্জিন ক্যাবিনে যাবো। ডুবন্ত পর্বতের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছি। চালক ঠিকমত কাজ করতে না পারলে ডুবন্ত পর্বতমালার ধাক্কা খেয়ে সমুলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবো।
না, তোমাকে ছেড়ে যাবো না আমি। মনিরা বনহুরের একটি হাতের মুঠায় চেপে ধরে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে-পাগলামি করোনা মনিরা। চলো আমি তোমাকে বিশ্রাম ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে আসি।
অগত্যা মনিরা স্বামীর সঙ্গে পা বাড়ালো।
*
সর্দার।
বলো রহমান? বনহুর নিজে ডুবু জাহাজখানার হ্যান্ডেল চেপে ধরে জবাব দিলো।
বনহুরের পাশে দাঁড়িয়ে ডুবুজাহাজের সুদক্ষ চালক জন। মাহবুব এবং রহমানও দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে বাইনোকুলার, তারা সামনের পুরু গ্লাসের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে লক্ষ করছে।
ডুবু জাহাজখানা চালানোর দায়িত্বভার এ মুহূর্তে বনহুর স্বয়ং হাতে নিয়েছে। কারণ একটু এদিক ওদিক হলে ডুবন্ত পর্বতমালার সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটতে পারে এবং সমূলে ধ্বংস হতে পারে।
বনহুর নিজে জাহাজখানাকে চালিয়ে নিয়ে চলেছে, তার লক্ষ্য ডুবন্ত পর্বতমালার কাছাকাছি এসে তার ডুবুজাহাজ খানাকে থামিয়ে ফেলবে। রহমান বললো—সর্দার, আমাদের ডুবুজাহাজখানা প্রায় ডুবন্ত পর্বতমালার কাছাকাছি এসেছি।
রহমান, তুমি পর্বতমালার দিকে লক্ষ রাখবে আর মাহবুব লক্ষ্য রাখবে চারপাশে। কোনো ভয়ংকর জলজীব আমাদের জাহাজখানাকে আক্রমণ করে না বসে।
সর্দার, আপনার আদেশমত কাজ করছি আমরা। বললো রহমান।
জন সর্বদা সর্দারের সহায়তায় প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ডুবন্ত জাহাজখানা গ্যাস দ্বারা চালিত, তাই জ্বালানি গ্যাস ঠিকমত পাইপ দিয়ে ইঞ্জিনে প্রবেশ করছে কিনা লক্ষ রাখছিলো জন।
ভাগ্য ভাল বলতে হবে, একসময় ডুবু জাহাজখানা এসে ডুবন্ত পর্বতটার পাসে এসে থামলো।
বনহুর এবার মনিরার ক্যাবিনে প্রবেশ করে বললো–বড্ড ভয় পেয়ে গেছে, তাইনা?
মনিরা সত্যি ভীত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলো। বহু সময় বনহুর ইঞ্জিন ক্যাবিনে থেকে সে নিজে ডুবু জাহাজখানাকে চালনা করছিলো। ডুবন্ত পর্বতমালার সঙ্গে ধাক্কা খেলে জাহাজ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যেতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সেই কারণেই বনহুর স্বয়ং জাহাজখানা অতি সাবধানে পর্বতমালার ছোট ঘোট ডুবন্ত শৃঙঙ্গলো এড়িয়ে বৃহৎ আকার, পর্বতমালার পাশে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।
স্বামীর সমস্ত দেহ ঘামে চুপসে উঠেছে। মুখমন্ডল লাল হয়ে ওঠেছে। হাতের পিঠে ললাটের ঘাম মোছে বনহুর।
মনিরা বনহুরের শয্যায় বসিয়ে আঁচলে তার মুখন্ডলের ঘাম মুছে দিয়ে বলে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছো! ইঞ্জিন ক্যাবিনে যা গরম। তাছাড়া গভীর পানির তলদেশে।
বনহুর অর্ধশায়িত অবস্থায় একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো তারপর একমুখ ধোয়া ত্যাগ করে বললো–মনিরা, জানো আমরা এখন এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেখানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে।
সত্যি আমার বড্ড ভয় করছে।
হেসে বললো বনহুর—তুমি না বলছে আমি পাশে থাকলে মৃত্যুকেও ভয় পাও না।
হাঁ তা সত্যি। ভয় আমার নিজের জন্য নয়…
তবে কার জন্য?
তোমার, ওগো তোমার জন্য।
আমি তো বলেছি মনিরা, মৃত্যুকে ভয় পাই না আমি। ভয়ংকরের সঙ্গেই তো আমার মোকাবেলা।
কি জানি তোমার সবই বিস্ময়কর জীবনে যা কল্পনাও করিনি তাই দেখছি। দেখছি তুমি যেমন বিস্ময়, তেমনি বিস্ময় তোমার সবকিছু! এমনভাবে তুমি গভীর সাগরতলে বিচরণ করে ফিরছে যা কেউ কল্পনা করতেও পারে না।
বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছিলো এমন সময় মাহবুব ছুটে এলোসর্দার, একটা বিরাট আকার কচ্ছপ আমাদের ডুবুজাহাজের সামনে এসে জাহাজখানাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।
কচ্ছপ!
হাঁ সর্দার। আপনি দেখবেন আসুন।
মনিরা ভীতকণ্ঠে বললো—আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। দেখবো কত বড় কচ্ছপটা আর কেমন করে সে তোমার জাহাজটার ওপরে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করছে?
এসো তাহলে। বনহুর মনিরাসহ মকবুলকে অনুসরণ করলো।
ডুবু জাহাজের সামনে ভাগে এসে দাঁড়িয়ে তাকালো বনহুর এবং মনিরা।
রহমান বলরো–সর্দার, এতোবড় কচ্ছপ আমি কোনোদিন দেখিনি। আশ্চর্য এই জলজীবটা।
বনহুর আর মনিরা পুরুগ্নাসের মধ্য দিয়ে সামনে ডুবন্ত পর্বতমালার দিকে তাকালো। উভয়ে অবাক হলো, মনে হচ্ছে একটি ছোটখাটো পাহাড় তাদের ডুবু জাহাজের দিকে চার পায়ে ভর করে এগিয়ে আসছে। কি ভয়ংকর তার চোখ দুটো।
রহমান বললো—সর্দার, ভুবন্ত পর্বতমালার গহ্বরে নানা ধরনের ভয়াবহ জীব বাস করে…এ কচ্ছপটি তাদের একজন।
বনহুর কচ্ছপটার দিকে লক্ষ রেখে বললো–রহমান, সেই ডুবন্ত পর্বত যে পর্বতের কাছাকাছি কোনো জাহাজ আজও পৌঁছতে পারেনি, এই পর্বতের অভ্যন্তরে একটি ভয়ংকর জীব বাস করে।
হাঁ সর্দার, আমিও ঐ রকম শুনেছিলাম। তবে কি আমরা …সর্দার আমরা কি…রহমান যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
