মনিরা, আমরা কিছুদিনের মধ্যেই কান্দাই পৌঁছে যাবো। নূর তোমার সন্ধানে উম্মাদ হয়ে উঠেছে। বড় ছেলেমানুষ, কখন কোন ভুল করে বিপদে পা দেবে কে জানে।
হাঁ, আমারও তাই চিন্তা। নূর নিশ্চয়ই সন্ধান করে ফিরছে কোথায় সেই নরপশু বি, কে, চৌধুরী, আর কোথায় তারা তার মাকে বন্দী করে রেখেছে।
তুমি ভেবো না মনিরা, কিছুদিনের মধ্যেই তোমাকে কান্দাই পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবো।
সেকি, তুমি যাবে না আমার সঙ্গে? বললো মনিরা।
বনহুর বললো–হয়তো এখন যাওয়া সম্ভব হবে না।
কারণ? গম্ভীর কণ্ঠে বললো মনিরা।
বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে বললো—মনিরা, কিছু কাজ আমার এখনও বাকি আছে।
শুধু কাজ আর কাজ–কি কাজ বলো?
একটু হেসে বললো বনহুর–সঠিক করে কোনো কাজের কথা এখন আমি তোমাকে জানাতে পারছি না মনিরা।
যদি সেই বিস্ময়কর নারী তোমাকে এই মুহূর্তে মুক্ত করে না আনতো? তাহলে কোথায় থাকতো তোমার কাজ?
সে কথা অবশ্য সত্যি!…কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে বনহুর।
মনিরা বলে–বুঝতে পারছি সেই নারীটির কথা এখন তোমার স্মরণ হয়েছে! জানি সে যেই হোক তোমাকে সে ভালবাসে আর ভালবাসে বলেই তোমাকে সে বারবার ভয়ংকর বিপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছে।
বনহুর ক্যাবিনের দেয়ালে ঠেশ দিয়ে একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো, তারপর বললো–থামলে কেনো বলো?
এবার তুমি তার সন্ধানে বেরুবে এবং এটাই তোমার এখন প্রধান কাজ।
মনিরা, সে কথা অবশ্য সত্য কিন্তু তার সন্ধানের চেয়েও আর দুজনকে আমার খুঁজে বের করতে হচ্ছে। কিন্তু এখন জানতে চেও না তারা কারা।
গভীর সমুদ্রের তলদেশে তুমি সেই নারীও তার সঙ্গীটির সন্ধান ছাড়া আর কার সন্ধান করবে?
এবার বনহুর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো, তারপর বললো—কে ঐ নারী তা জানবার জন্য আমার তেমন উৎসাহ নেই তবে সে কে তা আমার জানতে হবে।
তার সঙ্গে জানতে হবে সে তোমায় ভালবাসে কিনা, তাই না?
মনিরা, তোমার এ সন্দেহ একেবারে অমূলক। ভালবাসা নিয়ে ভাববার সময় আমার কবে হয়েছে বলো? তোমার ভালবাসারই মূল্য দিতে পারলাম না আজও। যাক ওসব কথা, শোন মনিরা–তোমাকে রহমান পৌঁছে দেবে আমার সাবমেরিন নিয়ে। কোনো অসুবিধা হবে না।
বেশ তো আছি। আমি থাকলে তোমার বুঝি অসুবিধা হয়? অভিমানভরা কণ্ঠে বললো মনিরা।
বনহুর মনিরকে টেনে নিলো কাছে, মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললো—মনিরা যা তোমার মুখে আসে তাই বলো। তুমি আমার পাশে থাকলে খুব ভাল লাগে কিন্তু আমার পাশে, চারদিক ঘিরে অনেক বিপদ। আমি চাই না মনিরা তুমি আবার কোনো বিপদের সম্মুখীন হও।
তবে বলো তুমি সমুদ্রের গভীরে কাকে খুঁজছে! কারা তারা?
বলেছি তো আজ নয় বলবো পরে। মনিরা, আমি বারবার তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। কারণ আমি অপরাধী তোমার কাছে, নূরের কাছে, মায়ের কাছে। আমি পারিনি মায়ের সন্তান হিসেবে আমার কর্তব্য পালন করতে পারিনি স্বামীর কর্তব্য পালন করতে, পারিনি পিতার কর্তব্য পালনে…
চুপ করো, ওসব আমি শুনতে চাই না। তুমি তো শুধু মায়ের সন্তান হিসেবে জন্মাওনি! তুমি তো কোনো নারীর স্বামী হতে চাওনি! তোমার সন্তান শুধু নূর নয়, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ তোমার সন্তান, তোমার ভাই, তোমার বোন….
মনিরা!
হাঁ আমি জানি। আর সে কারণেই তোমাকে তোমার কাজে কোনোদিন বাধা দেইনি। তুমি যা ভাল বোঝো তাই করো।
রাগ করলে?
না।
তবে মুখ ফিরিয়ে নিলে কেনো মনিরা? এসো কাছে এসো।
ছেড়ে দাও।
না ছাড়বো না, আগে বলতে হবে তুমি আমার ওপর রাগ করোনি?
না গো না। যে মানুষ সে তোমার ওপর কোনোদিন রাগ করতে পারে? মনিরা স্বামীর বুকে মাথা রাখে।
এমন সময় ওয়্যারলেসে ভেসে আসে রহমানের গলা……একটি ডুবন্ত পর্বতমালা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।……আমাদের ডুবুজাহাজ সেই ডুবন্ত পর্বতমালা হতে প্রায় তেরোশ মাইল দূরে রয়েছে…
বনহুর মনিরাকে বাহুমুক্ত করে সোজা ওয়্যারলেস যন্ত্রের সামনে এসে দাঁড়ালো, বললো সে-রহমান, আমাদের জাহাজখানাকে ঐ ডুবন্ত পর্বতমালার দিকে নিয়ে চলো……নিশ্চয়ই ঐ ডুবন্ত পর্বতমালা রহস্যময়……
রহমানের গলা শোনা যায়……আবার কোনো নতুন বিপদের সম্মুখীন হওয়া অসম্ভব নয়…….ডুবন্ত পর্বতটা কিছুটা বিস্ময়কর…
…তোমাকে বললাম নিয়ে চলো…
বৌরাণী সঙ্গে আছেন, কোনো বিপদ এলে…
…সব বিপদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে সে রাজি তোমরা এগিয়ে চলো…কিন্তু সাবধান, কোনো প্রবল পাহাড়ে জাহাজ ধাক্কা না খায়…
..হা সর্দার, এদিকে বহু প্রবাল পর্বত পরিলক্ষিত হচ্ছে …..
বনহুর ফিরে এলো মনিরার পাশে, বললো—ফিরে যাওয়া এখন হলো না মনিরা। আমাদের ডুবুজাহাজখানা ভুলপথে অগ্রসর হয়ে কোনো ডুবন্ত পর্বতমালার কাছাকাছি এসে পড়েছে।
তাহলে উপায়?
সব তো শুনলে মনিরা। দস্যুপত্নী হয়ে ভয় পেলে চলবে না। তাছাড়া তুমি একজন খ্যাতনামা ডিটেকটিভ এর জননী……
যাও ঠাট্টা করোনা।
মোটই ঠাট্টা করছি না মনিরা। জানি না কি ভাগ্যে আছে।
কি আর থাকবে, হয়তো সেই নারীর আবার সাক্ষাৎ মিলবে। এবার কিন্তু পালাতে দেবে না।
দেখো দেখো মনিরা কি, ভয়ংকর একটি ডুবন্ত সাপ। ঐ দেখো……
সামনে পুরু কাঁচের শাশী দিয়ে দেখলো মনিরা।
একটা বিশালকায় সর্পরাজ একটি তিমি মাছকে গ্রাস করছে। অর্ধেকটা তিমি সর্পরাজের মুখ গহ্বরে আর অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে বাইরে। ছটফট করছে তিমিটা অসহায়ভাবে।
