কি ভাবছো মনিরা, তাড়াতাড়ি এসো। বললো বনহুর।
বেশ কিছুটা এগুনোর পর তারা সমুদ্রের জলরাশি দেখতে পেলো। এবার বনহুর মনিরাকে তার মুখে অক্সিজেন মুখোশ পরিয়ে দিলো এবং তাকে সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুত। হতে বললো।
বনহুরও মুখোশ পরে নিলো।
অদ্ভুত ড্রেস পরিহিতা নারীমূর্তির দেওয়া ডুবুরী ড্রেসের সঙ্গেই ছিলো অক্সিজেনভরা মুখোস।
তাড়াতাড়ি পরে নিয়ে সাগরের পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে এগুচ্ছে। বনহুর শুনতে পেলো নারীকণ্ঠের আওয়াজ, বললো—অত্যন্ত দ্রুত চলো বনহুর, নইলে আমাদের সকলের অবস্থা শোচনীয় হবে। ডিনামাইট বাষ্ট হবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সাগরতল প্রকম্পিত হবে এবং আমরা কেউ রেহাই পাবো না…..
বনহুর বুঝতে পারলো তার অক্সিজেন মুখোসের মধ্যেই রয়েছে ওয়্যারলেস যন্ত্র। সেই কারণেই শুনতে পাচ্ছে সে সমুদ্রের গভীর জলরাশির তলদেশেরও অপর ব্যক্তির কণ্ঠস্বর। ঐ নারীমূর্তির মুখোসের অন্তরালেও আছে কোনো যন্ত্র যার দ্বারা গভীর পানির তলদেশে নিজের কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে দিচ্ছে। যে কণ্ঠস্বর বনহুরের ডুবুরী ড্রেসের মধ্যেও কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে।
বনহুর আরও শুনতে পেলো নারীকণ্ঠের আওয়াজ-আমাকে অনুসরণ করো। তোমার ডুবুজাহাজ এখনও অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।…….
গভীর পানির তলদেশে তাই নারী কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে তার কানে প্রবেশ করছিলো। মুখোসের মধ্যেও দীপ্ত হয়ে উঠলো বনহুরের মুখমন্ডল, সে বেশ বুঝতে পারলো এই নারীমূর্তিই তাকে আরও একদিন গভীর সাগরতলে বি, কে, চৌধুরীর কুচক্রী অনুচরদের কবল থেকে উদ্ধার করে এনেছিলো, এত বিপদেও তার মনে জাগলো সে এই নারী।
মনিরা বনহুরের কণ্ঠদেশ শক্ত করে ধরে আছে। প্রতিটি ডুবরী ড্রেসের পিঠে ছিলো স্পীডে চলার ক্ষুদ্র মেশিন। নারীমূর্তির ইংগিতে মেশিনগুলো চালু করে দেওয়া হয়েছিলো তাই অত্যন্ত স্পীডে এগিয়ে চললো তারা সাঁতার কেটে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা অনেক দূরে চলে এলো।
গভীর পানির তলদেশে এমন একটা ডুবু পর্বত ছিলো যার মধ্যে বি, কে চৌধুরী কৌশলে তার গোপন আড্ডাখানা এবং একটি দুর্গম বন্দীশালা তৈরি করে নিয়েছিলো।
বনহুরকে আটক করাই ছিলো তার মূল উদ্দেশ্য। তার জীবনের সাধনা তাকে আটক করা। বনহুরকে কেউ কোনোদিন বন্দী করে ধরে রাখতে পারেনি, এমনকি হাঙ্গেরী কারাগারও তাকে আটক রাখতে সক্ষম হয়নি। তাই মিঃ চৌধুরী সাধুতার মুখোস পরে জনসমাজে নেতৃত্ব দিয়ে একজন নরপিশাচ ছিলো।
তার ছোট্ট একটি ডুবু সাবমেরিন ছিলো। ঐ সাবমেরিনে সে এই বিস্ময়কর আড়ডাখানায় যাওয়া-আসা করতো। গভীর সাগর তলে একটি সুড়ঙ্গপথ। সেই সুড়ঙ্গপথের সন্ধান কেউ জানতো না।
বহুদূর এগিয়ে আসার পর হঠাৎ ভয়ংকর একটা শব্দ হলো তার সঙ্গে সমুদ্রের জলরাশি ভীষণভাবে আলোড়িত হলো।
বনহুরের ডুবু জাহাজ এবার তাদের নজরে এসে গেছে।
শুনতে পেলো বনহুর নারীকণ্ঠ যাও বনহুর তোমার স্ত্রী-সহ তোমার ডুবুজাহাজে ফিরে যাও। ডিনামাইট বাষ্ট হয়ে ডুবু পর্বতমালার গুপ্ত বন্দীশালা বিনষ্ট হয়ে গেছে।
রহমান জাহাজে বসে টেলিভিশন পর্দায় দেখছিলো, চিনতে পারে ডুবুরী পোশাকে বনহুরকে। অবশ্য বনহুর তার নিজস্ব ডুবুরী পোশাকে সমুদ্রতলে ডুব দিয়েছিলো এ ড্রেস সে ড্রেস নয়। রহমান ডুবু জাহাজের তলদেশের সুড়ঙ্গমুখ খুলে দেবার জন্য নির্দেশ দিলো।
*
রহমান!
বলুন সর্দার?
একবার নয় সে কয়েকবার আমাকে ভয়ংকর বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। জানিনা কে এই বিস্ময়কর নারী?
রহমান বললো–আমরাও ভীষণ জানতে ইচ্ছা হচ্ছে কে এই নারী? যার ক্ষমতা অসীম……
হাঁ রহমান, সত্যি আমি তার বুদ্ধি কৌশল দেখে শুধু বিস্মিত হইনি। একেবারে সম্ভিত হয়ে গেছি। সে কেমন করে জানলো আমাকে মনিরা সহ-কৌশলে গভীর সাগরতলে দুর্গম একবন্দী গুহায় আটক করে রাখা হয়েছে।
আমরা সেদিনও অবাক কম হইনি যেদিন আপনাকে ডুবু জাহাজের নিকটে পৌঁছে দিয়ে সে গভীর সাগরতলে আরও গভীরে তলিয়ে গেলো।
বনহুর আর রহমানের কথা হচ্ছিলো এমন সময় মনিরা এসে দাঁড়ালো সেখানে।
রহমান কুর্ণিশ জানিয়ে সরে গেলে সেখান থেকে।
বনহুর দাঁড়িয়েছিলো, দৃষ্টি ছিলো তার কাঁচের শাশী দিয়ে সমুদ্রের তলদেশে। নানাজাতীয় সামুদ্রিক জলজীব আর অদ্ভুত অদ্ভুত গাছগাছাড়া, জলীয় উদ্ভিদগুলোর দিকে।
মনিরার দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো বনহুর—-এসো মনিরা! দেখো সমুদ্রের তলদেশেও একটি জগৎ আছে।
মনিরা স্বামীর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। তাকিয়ে দেখতে লাগলো সমুদ্রতলের বিস্ময়কর জীব আর উদ্ভিদগুলো কত প্রবাল জমে জমে পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে আছে! কত রঙের মাছ যা কোনোদিন মনিরা দেখেনি।
অবাক হয়ে দেখে মনিরা।
বনহুর বললো–কেমন লাগছে তোমার?
যেখানে তুমি আছো সেখানে আমার অনন্ত সুখ। তুমি আমার পাশে থাকলে আমি মৃত্যুকেও হাসিমুখে বরণ করে নিতে পারি।
মনিরা!
হাঁ।
সত্যি বলছো মনিরা
তবে কি মিথ্যা বলছি?
সারাটা জীবন তোমার ব্যথা বেদনায় ভরিয়ে দিয়েছি। মিঃ বি, কে, চৌধুরী আমাকে পাকড়াও করবার জন্য তোমার ওপর কত নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। তোমার সে ব্যথা, সে কষ্ট আমি কোনোদিন মুছে দিতে পারবো না। তুমি আমাকে অভিসম্পাত দাও মনিরা।
ছি! মনিরা স্বামীর মুখেহাত চাপা দেয়, তারপর বলে–তুমি তো জানো আমার জীবন তোমার জন্য, ওসব আর বলবে না।
