আমি কিন্তু এখন মোটেই ক্ষুধার্ত নই।
নরমাংস আমাকে আরও সতেজ আর শক্তিশালী করে তুলেছে। আমার দেহে এখন অসম্ভব শক্তি। মাথার চুল-দাড়ি-গোঁফ আর আংগুলের নখগুলো ভীষণ শক্ত হয়ে উঠেছে। দিন দিন নরমাংস আমাকে হিংস্র করে তুলেছে। তাকিয়ে দেখলাম ক্যাপটেন লোরী অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে। অগ্নিকুন্ডটা জ্বলে জ্বলে এখন প্রায় নিভে এসেছে। এই সুযোগ আমি হারাতে চাই না……ক্যাপটেন জোসেফ নিশ্চিন্ত আর ক্লান্ত, তার গলাটা টিপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে একটা কুক করে শব্দ হলো মাত্র। তারপর আমার রাজ্য……মাথুন দ্বীপে আমি একা সঙ্গীহীন। কদিন ধরে ক্যাপৃটেন লোরীর মাংস খেলাম। তারপর একদিন শেষ হয়ে গেলো ক্যাপটেন লোরীর দেহের অবশিষ্ট অংশটুকু……
ক্যাপটেন আরফিন দুই থামলেন এবং কন্যা মিস লুসির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন–এমন কাহিনী আমি কোনোদিন শুনবো ভাবিনি মা। তবে আর কিছুদিন আমরা এ অবস্থায় থাকলে ডঃ ডাওনা লর্গের মতই হিংস্র হয়ে উঠবোনয় মৃত্যুবরণ করবো।
চিন্তিতভাবে বললে লুসি-বাবা, তোমার শরীর বড্ড অবসন্ন। আমার ভয় তোমাকে নিয়ে।
ক্যাপটেন আরফিন হইয়ের হাতে তখনও ডায়রীখানা ধরা আছে। বললেন তিনি–মা, তুমি আমাকে নিয়ে ভেবো না। ডায়রীখানা অত্যন্ত মূল্যবান এটা তোমার কাছে যত্ন করে রেখে দাও।
বলল লুসিওর বেশি আর পড়া সম্ভব হলো না বাবা?
না মা, বড় মচমচে হয়ে গেছে পাতাগুলো। ঐটুকু পড়তে গিয়ে আমার অনেক বিলম্ব হলো। তবে অনেক কিছু জানতে পারলাম, যা কোনোদিন আমার জানা ছিলো না। ঐ দেখো রাইফেলখানা কেমন মরচে পড়ে গেছে, যতদিন ওটা ব্যবহার করেনি, তারপর ডায়রীও আর বেশীদূর এগোয়নি……ক্যাপটেন আরফিন উঠে পড়লেন। সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন– এসো তোমরা আমার সঙ্গে। ডঃ ডাওনার সেই মণি-মুক্তা এবং স্বর্ণগুহা খুঁজে বের করি….এসো জাভেদ, ফুল্লরা তোমরাও এসো।
লুসি ফুল্লরার হাত ধরে বললো–চলো বোন।
জাভেদ অনেকদূর এগিয়ে গেছে।
ডঃ ডাওনা নরখাদকের মৃতদেহটা পড়ে রইলো সেখানে।
ক্যাপটেন আরফিন দুই একবার তাকিয়ে দেখলেন ওদিকে।
*
জানো মনিরা আমরা এখন কোথায়? বললো বনহুর।
মনিরা স্বামীর বুকে মাথা রেখে বললো–অজানা কোনো বন্দীখানায়।
বন্দীখানা তো বটেই তবে গভীর সাগরতলে কোনো এক ডুবন্ত পর্বতের গুহায়।
মনিরা স্বামীর কণ্ঠ বেষ্টন করে বলে–যত বিপদ আছে মাথা পেতে নেবো ওগো, তুমি আছো আমার পাশে।
হয়তো এই দুর্গম বন্দীশালায় আমাদের মৃত্যুও হতে পারে।
একটুও দুঃখ পাবো না। যেদিন তুমি আমার পাশে এলে সেদিন আমি মুক্তি পেয়েছি। ওরা নির্বোধ জানে না, তোমাকে পেলে আমার কাছে সব কিছুই খুশীর। তোমাকে পাশে পেলে আমি সব কষ্ট ভুলে যাই।
বনহুর মনিরাকে আরও গভীর আবেগে বুকে টেনে নিয়ে বললো–মনিরা, ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে আমি আমার ডুবুজাহাজে ফিরে যাবো। রহমান অন্যান্য সঙ্গীদের নিয়ে সাগরতলে অপেক্ষা করছে।
বললো মনিরাকে তোমাকে আমার সন্ধান বলেছিলো? তুমি কেমন করে সেখানে গেলে? সত্যি তুমি যদি না গিয়ে পৌঁছতে তাহলে আমি চির অন্ধ হয়ে যেতাম। আর কোনোদিন তোমাকে দেখতে পেতাম না।…
মনিরা চুপ, একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
হাঁ।
বনহুর আর মনিরা অন্ধকারে একজনের কাছ থেকে আরেকজন বসলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা আলোর ছটা তাদের চোখেমুখে এসে পড়লো। প্রথমে চোখ ধাধিয়ে গেলো তাদের।
দেখলো দু’জন মানুষ তাদের হাতে অত্যন্ত পাওয়ার ফুল টর্চ, দেহে তাদের ডুবুরী ড্রেস। বললো একজন–এক মুহূর্ত বিলম্ব করো না, উঠে পড়া বনহুর।
বনহুর আর মনিরা অবাক হলো—এ কণ্ঠস্বর পুরুষের নয় নারীর। সমস্ত দেহ কালো ড্রেসে ঢাকা।
নারীমূর্তিটিকে বনহুর চিনতে পারলো, এই নারীমূর্তিই একদিন তাকে দুর্গম বন্দীশালা থেকে উদ্ধার করেছিলো। কিন্তু কে এই নারীমূর্তি যার পরিচয় বনহুর আজও জানে না।
নারীমূর্তি বললো—অনেক কষ্ট করে তবেই তোমাদের সন্ধান পেলাম। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করো না, এসো মনিরা…অদ্ভুত নারীমূর্তি মনিরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।
যদিও মনিরার চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে তবুও সে নারীমূর্তির হাত ধরলো।
ততক্ষণে বনহুর উঠে দাঁড়িয়েছে।
নারীমূর্তি এবং অপরজন দু’হাতে দুটি ডুবুরী ড্রেস এনেছিলো। তারা এবার সেই অদ্ভুত ড্রেস বনহুর আর মনিরাকে পরতে বললো।
জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন সে ডুবন্ত গুহাটি।
বনহুর আর মনিরা বিস্ময়কর নারীমূর্তির দেয়া পোশাক পরে নিলো, নিচে রইলো তাদের নিজস্ব পোশাক।
নারীমূর্তি সঙ্গীটিকে লক্ষ্য করে বললো—ডিনামাইট ঠিকমত বসিয়ে দিয়েছো তো?
বললো সঙ্গীটি-হাঁ, আপনার আদেশমত কাজ করেছি।
এবার নারীমূর্তি বললো–আর মোটেই এখানে বিলম্ব করা ঠিক হবে না, কারণ আমি এই ডুবন্ত বন্দীশালাটিকে সমূলে ধ্বংস করে দেবো। ডিনামাইট বসানো হয়েছে, আর বিলম্ব করা যাবে না, চলো বনহুর।
নারীমূর্তি একটি চক্রাকার হ্যান্ডেল ঘুরাতে লাগলো।
সঙ্গে সঙ্গে পাথর সরে একটি সুড়ঙ্গপথ বেরিয়ে এলো।
বনহুর মনিরার হাত ধরে বললো–এসো মনিরা।
মনিরা স্বামীর হাত মুঠায় চেপে ধরলো, যদিও নানা প্রশ্ন তার মনে উদয় হচ্ছিলো তবুও সে নীরবে এগিয়ে চললো। এমন ঘটনা তার জীবনে এই প্রথম নয়। আরও বহুবার তাকে নানা বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। নূর জন্মাবার পর তার জীবনে একবার নেমে এসেছিলো এক মহা ভয়াবহ অভিশাপ। সেই ভয়ংকর অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছিলো বনহুর। তারপর আরও কত বার কত বিপদ এসেছে তার জীবনে সব আল্লাহর মেহেরবানিতে উদ্ধার পেয়েছে তাও স্বামী বনহুরের দ্বারাই। কিন্তু কে এই নারীমূর্তি যে আজ তার স্বামীকেও উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছে……
