কয়েকজনকে আমরা পেলাম বটে কিন্তু মাথুনে পৌঁছানোর পর আরও দুজন মৃত্যুবরণ করলো। তবে সবাইকে আমরা একই জায়গায় পেলাম না। দ্বীপটির বিভিন্ন অংশে দেখা পেলাম আমাদের কয়েকজনকে। সবচেয়ে আমরা আশ্চর্য হলাম মাথুন দ্বীপে একটি প্রাণীও নজরে পড়ছে না।
আমরা কিছু সুস্থ এখন। খাবার সন্ধানে দ্বীপটার বুকে সন্ধান চালালাম। শুধু নানা জাতীয় ফলমুল ছাড়া আর কোনো কিছু নেই, থাকবার কথাও নয়। বাবার মুখেই শুনেছিলাম মাথুন দ্বীপে কোনো কিছু নেই, শুধু আছে স্বর্ণ মেশানো মাটি। বাবার কথা যে মিথ্যা নয় তা বেশ বুঝতে পারলাম।
আমরা বনজঙ্গল পেরিয়ে মাথুন দ্বীপের একপাশে পর্বতমালায় উপস্থিত হলাম। এখানে শীত কিছু কম মনে হলো। একটি গুহা আমরা বেছে নিলাম, যেখানে রাত কাটানো সম্ভব হবে।
নির্জন দ্বীপে আমরা কয়েকজন প্রাণী। শুরু হলো আমাদের স্বর্ণ সংগ্রহ। এত দুঃখ কষ্ট সব ভুলে গেলাম। পাথর ঠুকে শুকনো কাঠে আগুন ধরিয়ে আলো সৃষ্টি করতাম। সেই আলো রাতে আমাদের জীবনকে আলোকিত করতো। দিনে গাছের ফল খেয়ে জীবন রক্ষা করতাম। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো পানির। সমুদ্রের পানি নোনা কাজেই পান করা সম্ভব নয়।
ক্রমে পানির পিপাসা আমাদের মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিলো। যতই ফলমূল খাই না কেন পানির অভাবে আমাদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়লো।
ফলমূল খেয়েও আর আমাদের তৃপ্তি মিটছে না। ক্রমেই ভেতরটা যেন শুষ্ক হয়ে উঠলো। প্রতিদিন হতাশা আর ক্লান্তিবোধ করতে লাগলাম।
ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হয়ে আসছে।
আমার মাথার মধ্যে একটা বাসনা ঘুরপাক খাচ্ছে যেমন করে হোক আমাকে বাঁচতে হবে এবং একদিন আমি ফিরে যাবো নিজের দেশে। আমার সহকারীকে নিয়ে সোনা আর মুক্তা সগ্রহ করতে লাগলাম। মুক্তা গুলো সমুদ্রের ধারে বালুকারাশির মধ্যে পেতাম তবে অনেক সন্ধান করে তবেই মুক্তা পেয়েছি। সবার অগোচরে সোনা আর মুক্তাগুলো সরিয়ে রাখতাম। ওরা কেউ জানে না কোথায় এগুলো আমি সরিয়ে রাখছি। আমার গুহার ওপাশে দক্ষিণে একটি ছোট্ট গুহা আছে, যার পথ খুঁজে বের করা কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু আমি জানি সে গুহার পথ কোথায়। যদিও আমার সঙ্গীদের সঙ্গে একাত্ন হয়ে কাজ করতাম তবুও আমি পূর্ণভাবে কাউকে বিশ্বাস করতে পারতাম না।
বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। আমাদের দিনগুলো অসহনীয় হয়ে উঠছে ক্রমান্বয়ে। দাড়ি গোঁফ আর মাথার চুল বাড়াতে শুরু করেছে দারুণভাবে, জামাকাপড় ছিঁড়ে গেছে স্থানে স্থানে। ময়লা আর দুর্গন্ধ বের হচ্ছে নিজেদের শরীর থেকে।
আমি দল ছেড়ে অনেকদূর এসে পড়েছি। আমার সঙ্গে ছিলো খালাসি জবরু। দুজন হাটছিলাম। ক্ষুধা পিপাসায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে উঠেছে। আমরা মুক্তার খোঁজে বেরিয়েছি। বহু সোনা আর মুক্তা আমরা সংগ্রহ করেছি। জানি না সে সব আমাদের জীবনে কোনো কাজে আসবে কিনা তবু আকাঙ্খার শেষ নেই।
কিন্তু আজ আর সহ্য করতে পারছি না। ক্ষুধা আর পিপাসা আমকে হিংস্র করে তুললো। একটা বৃক্ষের নিচে এসে বসলাম আমরা দুজন-আমি আমার সঙ্গী জবরু। আমার মতই তারও অবস্থা, হাঁটবার শক্তিও যেন লোপ পেয়েছে তার। দু’একটি কথা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কিন্তু সে কোনো জবাব দিতে পারছে না। আমি তাকে আর প্রশ্ন না করে কাজের নির্দেশ দিলাম তবুও সে চুপ করে রইলো।
ভীষণ রাগ হলো, আমি আমার রাইফেলের বাট দিয়ে তা মাথায় আঘাত করলাম। সঙ্গে সঙ্গে কাৎ হয়ে পড়ে গেলো জবরু। এতো জোরে আঘাত করেছিলাম যে সে টু শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারলো না। আমি দেখলাম তার মাথা ফেটে দু’খানা হয়ে গেছে। মাথা থেকে মগজ বেরিয়ে এসেছে, রক্তে লালে লাল হয়ে উঠলো সেখানকার শুকনো মাটি।
বিনা কারণে হত্যা করলাম আমার সঙ্গীটিকে। একেবারে বিনা কারণে বলা যায়। কিন্তু বেশি ভাববার মত মনের অবস্থা তখন ছিলোনা আমার। ক্ষুধা পিপাসায় আমি পণ্ড বনে গেছি। কিছুতেই পারলাম না সহ্য করতে। জবরুর মাথা থেকে মগজ গড়িয়ে পড়ছিলো। আমি দুহাতে তুলে খেতে শুরু করলাম। মানুষের রক্ত এতো স্বাদ আমি পূর্বে জানতাম না!
সেদিনের পর থেকে আর এক নেশায় পেয়ে বসলো। আমি এখন মানুষের মাংসের স্বাদ পেয়েছি। কয়েকদিন পর পর আমি এক একজন সঙ্গীকে সকলের অজ্ঞাতে হত্যা করে খেতে লাগলাম।
তারপর একদিন দেখলাম আমার সঙ্গী মাত্র আর একজন রয়েছে, ক্যাপটেন লোরী।
রাতে পাশাপাশি শুয়ে আছি আমরা দু’জন। কারও চোখে ঘুম নেই। আমি নরমাংস খাবার আশায় প্রহর গুণছি। ক্যাপটেন লোরীর নিদ্রা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করবো। আর জোসেফ ভাবছে তার সঙ্গী সাথীরা সবাই কোথায় গেলো। অবশ্য লোরীর মনের অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে সে এতোদিনে ধরে ফেলতে তার সঙ্গীরা কোথায় গেলো, কি হলো তার। কয়েকদিন পর পর যখন একজন করে নিখোঁজ হতে লাগলো তখনও সে টের পায়নি। আমাকে সে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করছে, ডাওনা লর্ড, তুমি কি বলতে পারোনা আমাদের সঙ্গীসাথীরা গেলো কোথায়?
বলেছিলাম আমি, হয়তো কোনো জীব-জানোয়ারের পেটে গেছে…..
আমার কথা সে বিশ্বাস করতে পারেনি, বলেছে এ দ্বীপে কোনো জীবজন্তু আজও নজরে পড়লো না আর তুমি বলছে তারা কোনো জীবজন্তুর পেটে গেছে……ক্যাপটেন লোরী কতদিন আমার শরীরে, ছেঁড়া জামাকাপড়ে রক্তের ছাপ দেখেছে। কতদিন সে আমাদের গুহার অদূরে নরকংকাল পড়ে থাকতে দেখেছে তবু সে বোঝেনি কিছু। একে লোকটা ছিলো সরল, তারপর বিস্ময়কর দ্বীপ তাকে একেবারে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলো। তারপর ছিলো ক্ষুধার জ্বালা। আমারই মত সে ক্ষুধার্ত অথচ সে ফলমূল খেয়ে বেঁচে আছে। আজকাল ফলমূল আর বেশি নজরে পড়ে না কারণ আমার সঙ্গী সাথীরা দারুণ ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত ছিলো, তারা ফলমূলের মুকুল পর্যন্ত খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতো।
